অমিত শা’র বাংলা সফরে যেন শাপমুক্তি ঘটল দিলীপ ঘোষের। কিন্তু বঙ্গ বিজেপি’র শাপমুক্তি কি ঘটবে? সময়ই উত্তর দেবে সেই প্রশ্নের। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপির ১৮টি আসন জয়ের প্রধান কারিগর হিসেবে দাবি করা হয় তৎকালীন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটেও তাঁর নেতৃত্বে পদ্ম শিবিরের জয় হয় ৭৭টি কেন্দ্রে।
বলতে গেলে তারপর থেকে দিলীপ দলে কোণঠাসা। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে তাঁর নিজের পুরোনো কেন্দ্র খড়্গপুরে মনোনয়ন না দিয়ে দিলীপকে পাঠানো হয়েছিল বর্ধমান পশ্চিম কেন্দ্রে লড়তে। সেখানে প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার কীর্তি আজাদের কাছে বিপুল ভোটে হার আজও মেনে নিতে পারেন না দিলীপ। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, পুরোনো কেন্দ্রে তাঁকে লড়তে দেওয়া হলে তিনি কখনোই হারতেন না।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির আসনসংখ্যা ১৮ থেকে কমে দাঁড়ায় ১২-তে। অথচ সেবার পশ্চিমবঙ্গে আরও ভালো ফল করার জন্য ঝাঁপিয়েছিল বিজেপি। অথচ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ছ’টি আসন কমে গিয়েছিল। অনেকে ভেবেছিলেন, এতে দলে দিলীপের গুরুত্ব বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উলটো। কেননা, যত দিন গড়িয়েছে, দিলীপ দলে তত ব্রাত্য হয়েছেন।
বিয়ে করা নিয়েও দলের একাংশের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েন দিলীপ। বিয়েতে তাঁকে নিরস্ত করারও চেষ্টা হয়। সেসব অবশ্য তিনি মানেননি। তবে তাঁকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হয় মুখ্যমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সস্ত্রীক দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির হওয়ায়। মুখ্যমন্ত্রীর আতিথেয়তা গ্রহণ করে দলের একাংশের তীব্র নিন্দার মুখে পড়েন।
তারপর থেকে দিলীপ আর ডাক পান না দলীয় কর্মসূচিতে। রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যত সমাবেশ হয়েছে উত্তরবঙ্গে বা দক্ষিণবঙ্গে, কোনওটিতেই না। শমীক ভট্টাচার্য রাজ্য সভাপতি হওয়ার পরও অবস্থার পরিবর্তন আশা করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। দিলীপ অবশ্য নিজের মতো কিছু কর্মসূচি পালন করতেন। অবশেষে বিজেপির ‘চাণক্য’ অমিত শা’র দৌলতে সেই ‘বনবাস’ শেষ হল দিলীপের।
একান্তে আলোচনা হয়ে দুজনের। শা তাঁকে বলেছেন, দল তাঁকে দায়িত্ব দেবে। দিলীপের সঙ্গে কথা হয়েছে বিজেপির রাজ্য সভাপতিরও। শমীক বলেছেন, দিলীপদা সারা মাঠজুড়ে খেলবেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, দিলীপ চাইলেও তাঁকে কি দলের সকলে মেনে নেবেন? ইতিমধ্যে দিলীপের বিরুদ্ধে দলে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন কেউ কেউ। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে যেহেতু এতকাল দিলীপের সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল, প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি এখন নাম না করে তাঁকে নিশানা করে চলছেন।
আসলে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শা-রা যতই চেষ্টা করুন না কেন, রাজ্য বিজেপিতে গণ্ডগোল সহজে মেটার নয়। আদি-নব্যের ঝগড়া, শুভেন্দু-সুকান্ত ঝামেলা, সর্বোপরি শুভেন্দু-দিলীপের সংঘাত বরং নিয়মিত চলছে। বিধানসভা নির্বাচনে দলের জয়ের চেয়ে গোষ্ঠী রাজনীতিতে বেশি উৎসাহী রাজ্য নেতৃত্বের একাংশ। দিলীপ ঘোষের হাতে এমন কোনও জাদুদণ্ডও নেই যে, তিনি চাইলেই ঘাসফুলের ভরাডুবি হবে নির্বাচনে।
তাছাড়া প্রশ্ন ওঠে, দিলীপের দক্ষতাকে যদি কাজে লাগাতেই হয়, তাহলে তাঁকে এতদিন কেন ব্রাত্য করে রাখা হল? আরও আগেই তাঁকে আসরে নামানো হল না কেন? গত ক’বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যারিশমা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জনপ্রিয়তা, তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তির কাছে বারবার হেরে গিয়েছেন শুভেন্দু-সুকান্তরা। দিলীপ ঘোষকে যদি তাঁদেরই উপদেশ মেনে কাজ করতে হয়, তাহলে কাজ আর কী হবে! সেটাও বড় কথা নয়। আসলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্য বিজেপির সমস্ত নেতা কোমর বেঁধে আসরে না নামলে ঘাসফুলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা কঠিন হবে পদ্ম শিবিরের পক্ষে।
The submit শাপমুক্তি কতটা! appeared first on Uttarbanga Sambad.
