Risks of Social Media Well being Suggestions | মোবাইল স্ক্রিনে ডিজিটাল আরোগ্যের মরণফাঁদ

Risks of Social Media Well being Suggestions | মোবাইল স্ক্রিনে ডিজিটাল আরোগ্যের মরণফাঁদ

শিক্ষা
Spread the love


বিশেষজ্ঞ না হয়েও একদল মানুষ নিয়মিত বিলিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘায়ু হওয়ার মহৌষধ। আপাতদৃষ্টিতে এই ফ্রি পরামর্শের ডালিকে জনকল্যাণকর মনে হলেও, চিকিৎসকরা বলছেন, না বুঝে পা ফেলা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা। 

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: কুয়াশার চাদর সরিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই আমাদের চোখ যায় বালিশের পাশে রাখা মোবাইলের উজ্জ্বল পর্দায়। ফেসবুকের অলিগলি, ইনস্টাগ্রামের রঙিন জেল্লা কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজের ভিড়ে ভেসে আসে শত সহস্র উপদেশ। ডিজিটাল অরণ্যে প্রতিটি স্ক্রল যেন এক একটি প্রেসক্রিপশন। কারও পরামর্শ এক চিমটি লবণে হার্ট ভালো থাকবে, কেউ বা বিশেষ পানীয়তে ক্যানসার জয়ের আশ্বাস দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞ না হয়েও একদল মানুষ নিয়মিত বিলিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘায়ু হওয়ার মহৌষধ। আপাতদৃষ্টিতে এই ‘ফ্রি’ পরামর্শের ডালিকে জনকল্যাণকর মনে হলেও, চিকিৎসকরা বলছেন, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক মরণফাঁদ (Risks of Social Media Well being Suggestions), যেখানে না বুঝে পা ফেলা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা।

সামাজিক মাধ্যমের (Social Media) সেই ফ্রি পরামর্শ মেনে মহাবিপদে পড়েছেন কোচবিহারের গান্ধি কলোনির বছর তিরিশের মৌসুমি সাহা (নাম পরিবর্তিত)। কিছুতেই ওজন নিয়ন্ত্রণ (Weight Loss Scams) করতে পারছিলেন না তিনি। বাড়তে বাড়তে তাঁর ওজন হয়েছে ৯১ কিলো। মৌসুমির ফেসবুক আইডিতে কয়েকদিন থেকেই বিশেষ পানীয় খেয়ে দ্রুত ওজন কমানোর ভিডিও আসছিল। তা দেখে দিন পনেরো থেকে নিয়মিত খালি পেটে ওই পানীয় খাচ্ছিলেন তিনি। তারপরই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, কোচবিহার থেকে তড়িঘড়ি নিয়ে এসে তাঁকে ভর্তি করা হয় শিলিগুড়ির একটি নার্সিংহোমে। চিকিৎসক বলেছেন, ওই পানীয় খেয়ে মৌসুমির লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। শুধু মৌসুমি নয়, চিকিৎসকরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমের পরামর্শ মেনে মৌসুমির মতো অনেকেই শরীরকে এক বিপজ্জনক গবেষণাগারে পরিণত করছেন। সুস্থ করতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই শরীরকে ঠেলে দিচ্ছেন বিপদের মুখে।

উদ্বেগের কথা শুনিয়েছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক উজ্জ্বল আচার্য। তাঁর মত, ‘সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞরা নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সেগুলো সবই সচেতনতার উদ্দেশ্যে। তার বাইরে সামাজিক মাধ্যম এখন স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞে ভরে গিয়েছে। তার মধ্য থেকে কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা তা যাচাই করা খুব কঠিন। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ দেখে এক পা-ও ফেলা উচিত নয়। যাই হোক না কেন, কোনও অবস্থাতেই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা না বলে পদক্ষেপ করা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা।’

নিরক্ষর বা অল্পশিক্ষিতরাই শুধু নন, বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার দীর্ঘ পথ না পেরিয়ে চটকদার ভিডিওর মোহে পড়ে নিরাময় খুঁজতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন উচ্চশিক্ষিতদের একাংশও। যেমনটা হয়েছে সন্দীপ চৌধুরীর ক্ষেত্রে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সন্দীপ শিবমন্দিরে ভাড়া থাকেন। কয়েকদিন থেকে তাঁর মুখে ব্রণ উঠছিল। হোয়াটসঅ্যাপে এক বন্ধু তাঁকে ব্রণ দূর করার উপায় বাতলে একটি ভিডিও পাঠান। তা দেখেই দোকান থেকে ক্রিম এনে লাগান সন্দীপ। তারপরই গোটা মুখে ক্ষত হয়ে যায় তাঁর। আপাতত ত্বক বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন। সন্দীপের কথা, ‘পনেরো দিনে প্রায় তিন হাজার টাকার ওষুধ খেয়েছি। রক্তের কয়েকটা পরীক্ষা করাতে হয়েছে। খুব বড় বোকামি করে ফেলেছি। আর কোনও দিন ওই ফাঁদে পা দেব না।’

নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ত্বকের বিশিষ্ট চিকিৎসক পিনাকী তরফদার। তিনি জানিয়েছেন, প্রতিদিনই এরকম অনেক রোগীই তাঁর কাছে আসছেন, যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ার চমকে ভুলে পণ্য ব্যবহার করে ত্বকের ক্ষতি করেছেন। পিনাকীবাবুর কথা, ‘সোশ্যাল মিডিয়া দেখা ভালো। কিন্তু বিশ্বাস করা ভালো নয়। কেউ যদি ভেবে থাকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বুদ্ধি নিয়ে তা শরীরের উপর প্রয়োগ করব, তা ভুল। প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছ থেকে পরামর্শ নিন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নয়।’

সামাজিক মাধ্যমের গোলকধাঁধায় তথ্য থাকলেও তা যাচাইয়ের উপায় নেই। সেখানে লাইক আর ভিউ-এর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় পরামর্শের গুণাগুণ। অথচ মানবদেহের জটিল রসায়ন প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন। একজনের জন্য যা অমৃত, উপযুক্ত রোগ নির্ণয় ছাড়া অন্যজনের জন্য তা বিষ হয়ে উঠতে পারে। হুজুগে গা ভাসানো মানুষগুলো ভুলে যান, কয়েক সেকেন্ডের রিল বা ভিডিও কোনওভাবেই কয়েক দশকের গবেষণালব্ধ চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না। না বুঝে এই অবৈজ্ঞানিক পথে হাঁটার বিপদ অতি ভয়ানক হতে পারে। যা অনেক সময় মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাঁরা বলছেন, ভিডিও দেখে ‘অলৌকিক’ নিরাময়ের আশায় ভেষজ পথ্য ব্যবহারের ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কম-বেশি হয়ে যে কেউ কোমায় চলে যেতে পারে কিংবা অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হতে পারে।

পিঠের ব্যথা কমানোর ভিডিও দেখে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়াই ব্যায়াম শুরু করেছিলেন অসমের হালাকুরার বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক অমৃতলাল সাহা। ওই ব্যায়ামের ফলে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় যা তাঁকে চিরস্থায়ী পক্ষাঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শিলিগুড়িতে আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে কিছুদিন চিকিৎসা করানোর পর সম্প্রতি চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ ভারতে গিয়েছেন তিনি।

মনোরোগের চিকিৎসক উত্তম মজুমদারের বক্তব্য, ‘বিশ্বাস এবং বিজ্ঞানের মধ্যে আমাদের দেশে এখনও বিশ্বাস মেনে চলার লোক বেশি। তাই ফেসবুকের চমকদারি ভিডিওকে বিশ্বাস করে ভয়ানক বিপদ ডেকে আনছি আমরা। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, তথ্য এবং জ্ঞানের মধ্যে এক বিশাল সমুদ্রের ব্যবধান রয়েছে। সুস্থ থাকা কেবল কিছু রেসিপি বা কসরত নয়, এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত শৃঙ্খলা। মায়াবী পর্দার রঙিন হাতছানিতে বিভ্রান্ত হয়ে নিজের জীবনকে বাজি ধরা কোনও বীরত্ব নয়, বরং তা এক চরম নির্বুদ্ধিতা।’ স্বাস্থ্য রক্ষায় সামাজিক মাধ্যমের উপর ভরসা করা উচিত নয় বলেই জানিয়েছেন আরেক চিকিৎসক বিশ্বপ্রিয় সিনহা। তাঁর বক্তব্য, ‘অনেক সময়ই দেখা যায়, সামাজিক মাধ্যমে কোনও ডায়েটের ভিডিও দেখে কেউ সেরকমভাবেই ডায়েট করা শুরু করে দিয়েছে। শেষে তা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং আমাদের কাছে ছুটে আসছে। কিন্তু যখন আসছে তখন অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে।’

দিনভর স্ক্রিন আমাদের অনেক কিছু দেখায়, কিন্তু সেগুলোর সব সত্য নয়। তাই নিজেকে প্রশ্ন করা, সন্দেহ করা এবং বিশেষজ্ঞের দরজায় কড়া না নাড়লে অবধারিতভাবেই পড়তে হবে বিপদের মুখে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *