উত্তরবঙ্গে লক্ষ্মীপুজোর মেলাকে কেন্দ্র করে অন্যতম পরিচিতি পেয়েছে দুরামারি। এবারের মেলা চলবে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত।
শ্রেয়সী পোদ্দার
জলপাইগুড়ির ডুয়ার্স অঞ্চলের দুরামারি গ্রামকে ঘিরে কোজাগরি পূর্ণিমার সময় যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়, তার কেন্দ্রে আছে সর্বজনীন লক্ষ্মীপুজো। চারদিকে চাষের জমি, কাছেই খুট্টিমারি জঙ্গল। ফসলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গ্রামের জীবনে লক্ষ্মী শুধু ধনসম্পদের দেবী নন, অন্ন ও সমৃদ্ধির প্রতীকও। তাই দুর্গাপুজোর জাঁকজমক পেরিয়ে লক্ষ্মীপুজোর দিনগুলির জন্য অপেক্ষা করেন বহু বাসিন্দা। পাড়ায় পাড়ায় পুজো, প্রতিমা দেখার আয়োজন, আলোর সাজ আর মেলা মিলে এই ছোট জনপদে উৎসবের আলাদা ছন্দ তৈরি করে।
দুরামারির লক্ষ্মীপুজোর ইতিহাসও গ্রামবাসীর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে পূর্ববঙ্গ থেকে এসে অনেকে এই অঞ্চলে বসতি গড়েন। কথিত আছে, তার পরের বছর ১৯৭২ সালে, কয়েকজন বাসিন্দার উদ্যোগে তিনটি বারোয়ারি লক্ষ্মীপুজোর সূচনা হয়। সময়ের সঙ্গে সেই আয়োজন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন পাড়ায়। প্রথম দিকের কয়েকটি পুজো ক্রমে বহু পাড়ার সম্মিলিত উৎসবে পরিণত হয়েছে। পুজোর আয়োজন ধরে রাখতে পাড়ার মানুষ নিজেরাই পরিকল্পনা, শ্রম ও সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসেন। এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, উৎসবের বিস্তার শুধু ধর্মীয় আবেগে নয়, নতুন বসতি গড়ে তোলা মানুষের সামাজিক বন্ধনেও শিকড় খুঁজে পেয়েছে।
এখানে লক্ষ্মী আরাধনা ঘরোয়া পুজোয় থেমে থাকে না। বিভিন্ন পাড়ার কমিটি বা ক্লাবের উদ্যোগে সর্বজনীন পুজো হয়। প্রতিমার সাজ, আলোকসজ্জা ও মণ্ডপ ঘিরে প্রতিযোগিতার আবহ থাকে। চন্দ্রকান্ত হাইস্কুলের মাঠে প্রতিমা প্রদর্শনীর আয়োজনও এই উৎসবের পরিচিত আকর্ষণ। একসঙ্গে নানা প্রতিমা দেখার সুযোগ পেয়ে দূরদূরান্তের দর্শনার্থীরাও ভিড় করেন। কোনও প্রতিমায় লক্ষ্মীর সঙ্গে থাকেন জয়া ও বিজয়া, কোথাও ঋদ্ধি ও সিদ্ধি, কোথাও লক্ষ্মী ও নারায়ণ। কোথাও প্যাঁচা, কোথাও গরুড়ও দেখা যায়। প্রদর্শনীতে বিভিন্ন পাড়ার প্রতিমা একসঙ্গে দেখার সুযোগ মেলে। এই আয়োজনেই দুরামারির লক্ষ্মীপুজো পায় এক নিজস্ব পরিচয়। পুজোর মূল দিন পেরিয়ে প্রদর্শনী ও মেলাকে ঘিরে কয়েক দিন ধরে থাকে মানুষের যাতায়াত। মেলায় বসে নানা দোকান, শিশুদের জন্য থাকে নাগরদোলার আকর্ষণ, পাশাপাশি থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এবারের মেলা ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।
উৎসবের সময় দূরে কাজ করতে যাওয়া বহু মানুষ বাড়ি ফেরেন। আত্মীয়স্বজনের আসা-যাওয়ায় ঘরবাড়ি ভরে ওঠে। গ্রামজীবনের নিয়মিত ব্যস্ততার মধ্যে এই কয়েকটি দিন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, নতুন পোশাক পরা, পুজো দেখা এবং মেলায় যাওয়ার উপলক্ষ্য তৈরি করে। শিশুদের কাছে মেলা অন্যরকম টান, বড়দের কাছে আত্মীয়তার বন্ধন নতুন করে জোড়ার সময়। বাড়ির কাজ সামলে মহিলারাও মণ্ডপে বসে গল্প করেন, প্রার্থনা করেন, উৎসবের সময়টুকু নিজেদের মতো করে কাটান। রাতের মেলা শুধু দর্শন নয়, স্থানীয়দের জন্য পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করারও একটি উপলক্ষ্য। প্রতিমা, আলো, দোকানপাট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বাইরে এই ফেরার ছবিটিও উৎসবকে অর্থবহ করে। কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে লক্ষ্মীর আরাধনা শস্য ও সচ্ছলতার কামনার সঙ্গে জড়িত; সেই বিশ্বাসের সামাজিক প্রকাশ দেখা যায় গ্রামের সম্মিলিত আয়োজনে।
কোজাগরি শব্দটির উৎস ‘কো জাগর্তি’, অর্থাৎ ‘কে জেগে আছে?’ প্রচলিত বিশ্বাসে পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী জেগে থাকা ভক্তের ঘরে আসেন, আশীর্বাদ করেন। বাংলার নানা অঞ্চলে এই বিশ্বাস ঘরে ঘরে পুজো, আলপনা, নৈবেদ্য ও জাগরণের রীতিতে প্রকাশ পায়। কোনও বাড়িতে আলপনা, কোথাও লক্ষ্মীর চরণচিহ্ন, আবার কোনও বাড়িতে পাঁচালি পাঠ, ঘরোয়া বিশ্বাস ও সামাজিক উৎসব এখানে পাশাপাশি চলে। উত্তরবঙ্গেও লক্ষ্মীপুজোর মেলা ও সর্বজনীন আয়োজন নানা গ্রামে স্বতন্ত্র রূপ নিয়েছে। জলপাইগুড়ির গড়ালবাড়ির শোভারহাট এলাকার সেরুপাড়াতেও শতাব্দীপ্রাচীন কোজাগরি লক্ষ্মীপুজো ও মেলা চলে। দুরামারির উৎসব শুধুমাত্র আলোর আয়োজন বা প্রতিমার সংখ্যায় আলাদা নয়। পাড়ায় পাড়ায় পুজো এবং প্রতিমা প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে এই গ্রাম দেখায়, লোকউৎসব কীভাবে কৃষিজীবন, গ্রামীণ স্মৃতি আর মানুষের পারস্পরিক যোগকে একই সুতোয় বেঁধে রাখে।
(লেখক উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা।)

