আশিস ঘোষ
দাদা, রাষ্ট্রপতির শাসন হবে নাকি? কী মনে হচ্ছে? গত কয়েকদিন যেখানেই যাচ্ছি- একটাই প্রশ্ন। অনেকের ধারণা, সাংবাদিকরা সব জানেন। তাঁরা ভিতরের সবকিছু বলতে পারেন। বলতে গেলে আপাতত এটাই পথেঘাটে আলোচনার খোরাক।
এত কথার মূলে এসআইআর (SIR)। দিনে দিনে তা এতটা পেঁচিয়ে গিয়েছে যে, বিধানসভার নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে ভোটার লিস্টের কাজ শেষ হবে কি না, ঘোর সন্দেহ। যে সংখ্যায় ভোটারের নাম হয় বাদ গিয়েছে নয়তো লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির গ্যাঁড়াকলে ঝুলছে- ততজনের কাগজপত্র দেখা কবে শেষ হবে, হলফ করে কেউ বলতে পারছেন না। তাই মনে সন্দেহ জমছে।
এনিয়ে পয়লা ঘণ্টাটা বাজিয়েছিলেন রাজ্যের বিরোধী নেতা। তাঁর গলায় ছিল হুমকির সুর- এবার ভোট হবে প্রেসিডেন্টস রুলে। বলার অর্থ, এবার আর তৃণমূল ট্যাঁ-ফোঁ করতে পারবে না। ড্যাং ড্যাং করে দিকে দিকে পদ্মফুল ফুটবে এবং তাঁরা নবান্নে গিয়ে বসবেন। অঙ্ক ছিল তেমনটাই। তখন অবশ্য এসআইআর নিয়ে এত কাণ্ড হয়নি। তখন বাংলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ ছিল। সুষ্ঠু ভোট হওয়া নিয়ে সংশয় ছিল।
জগদীপ ধনকরের আমলে ঘন ঘন রাজভবনে গিয়ে ৩৫৬ না হোক, নিদেনপক্ষে ৩৫৫ ধারায় মমতার সরকারকে সরিয়ে বা নড়িয়ে দেওয়ার জন্য দরবার করা ছিল। কিছু একটা ঘটলেই দিল্লি থেকে নানা নামের কমিশন, কমিটি বাংলায় আসা প্রায় দস্তুর হয়ে উঠেছিল। কমিশন বা কমিটি ফিরে গিয়ে রিপোর্টে লিখত, বাংলায় রাষ্ট্রপতির শাসন চাই। এবার রাষ্ট্রপতির অপমান নিয়ে বাজার গরম করতে নেমে পড়েছে পদ্ম শিবির।
ভোটের মুখে আবার সুপ্রিম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের ঘাড়ে সবটা চাপিয়ে মজা দেখছে বিজেপি (BJP)। তবে দিল্লির গেরুয়া নেতারা অঙ্ক কষছেন, রাষ্ট্রপতি শাসন হলে হিতে বিপরীত হবে না তো? উলটে সহানুভূতির হাওয়া মমতার দিকে বইবে না তো? তৃণমূলকে শহিদ করে লাভ হবে কি?
একেই এসআইআর নিয়ে বিজেপির ছক পুরো উলটে দিয়েছেন মমতা। নীরবে গোপনে বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়া যাবে ভেবেছিলেন যাঁরা, তাঁরা বরং এখন মানুষের রোষে। এসআইআর আতঙ্কে বেশকিছু মৃত্যুর অভিযোগ আছে। সাতপুরুষের ভিটে থেকে উৎখাত হওয়ার দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম উড়েছে লাখ লাখ বৈধ ভোটারের। হাজার ঢাক পিটিয়েও লিস্টে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হালে পানি পাচ্ছে না নির্বাচন কমিশনও।
বাকি রইল রাষ্ট্রপতির শাসন। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম রাষ্ট্রপতি শাসন হয়েছিল ৬২ বছর আগে। বিধানচন্দ্র রায় মারা যাওয়ার পর। মাত্র সাতদিনের জন্য। তারপর মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্লচন্দ্র সেন। এরপর আবার রাষ্ট্রপতি শাসন হয়েছিল ১৯৬৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। তখনকার মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন রাজ্যপাল ধরম বীরার কাছে। মাত্র তিন মাসের জন্য টিঁকেছিল সেই সরকার। ৩৫৬ ধারা জারির আদেশে সই করেছিলেন রাষ্ট্রপতি জাকির হুসেন।
এক বছর পর অজয় মুখোপাধ্যায়ের যুক্তফ্রন্ট সরকার শপথ নেওয়া পর্যন্ত ছিল সেবারের রাষ্ট্রপতি শাসন। বাংলা কংগ্রেস আর সিপিএমের নিজেদের গোলমালে এক বছর উনিশ দিনের মাথায় প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার পড়ে যায়। ফের রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। একইভাবে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার পড়ে গেলে তৃতীয়বারের জন্য জারি হয়েছিল রাষ্ট্রপতির শাসন। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে মুখ্যমন্ত্রী হন অজয়বাবু। তিন মাসেরও কম সময়ে পড়ে যায় সেই সরকার। তারপর টানা ২৬৫ দিন চলে রাষ্ট্রপতির শাসন।
এরপর ১৯৭২ সালে সিদ্ধার্থশংকর রায়ের কংগ্রেস সরকার। চলে ৫ বছর ৪১ দিন। ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে বিধানসভার মেয়াদ ফুরোলে ৫১ দিনের জন্য জারি হয়েছিল রাষ্ট্রপতির শাসন। তারপর থেকে টানা ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসন। তারও পরে ১৫ বছর তৃণমূলের। বহুবার দাবি উঠলেও গত প্রায় পঞ্চাশ বছরে আর কখনও রাষ্ট্রপতির শাসনের মতো অবস্থা হয়নি।
এখনকার প্রজন্ম জানেই না বস্তুটা কী! শুধু বিজেপির নেতাদের কথায় আন্দাজ করছে, রাষ্ট্রপতি শাসন মানে রাজ্যপালের বকলমে সরকার চালাবে দিল্লি। হঠাৎ রাজ্যপাল বদলে এই জল্পনায় আরও জোর হাওয়া লেগেছে। তার জেরে লড়ে যাচ্ছেন বঙ্গের পদ্ম নেতারা। বাকি দেশে এমন দৃষ্টান্ত নেহাত কম নেই। নরেন্দ্র মোদির আমলেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি থেকে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণ দেখিয়ে ৩৫৬ ধারা জারি হয়েছে। আবার রাজ্য পুনর্গঠনের কথা বলে জম্মু-কাশ্মীরকে আনা হয়েছে রাষ্ট্রপতি শাসনের আওতায়।
রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে অরুণাচল, উত্তরাখণ্ড, দিল্লি, মণিপুর, মহারাষ্ট্র, পুদুচেরিতে। তবে এসআর বোম্মাই কেসে সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court docket) কড়া নির্দেশের পর এখন আর আগের মতো কথায় কথায় ৩৬৫ ধারা জারি করা যায় না। কী হইতে কী হইবে জানা যাবে আর ক’দিনেই। ততদিন আমাদের নজর থাকবে ধর্মতলার ধর্না মঞ্চে, দিল্লির নির্বাচন সদনের দিকে। এত বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারকে বাদ দিয়ে কি ভোট হতে পারে? ভোটপর্ব সেরে মে মাসের ৭ তারিখের মধ্যে কি আদৌ নতুন সরকার গড়ে ফেলা যাবে? প্রশ্নটা ক্রমশ বড় হচ্ছে।
