অরবিন্দ ঘোষ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সত্যজিৎ রায়, বাঙালি তথা ভারতীয় সংস্কৃতির দুই উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। সাহিত্য, শিল্প ও সংগীতে দুজনেই ছিলেন অনবদ্য। সত্যজিৎ যখন জন্মালেন রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৬০। ১৮৮০ সালে উপেন্দ্রকিশোর ময়মনসিংহ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র ঘটে ঠাকুরবাড়িতেই। দেবেন্দ্র-পুত্র রবি ছিলেন উপেন্দ্রকিশোরের প্রায় সমবয়সি। একই সূত্র ধরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ উপেন্দ্র-পুত্র সুকুমারের। সুকুমার একবার শিশুপুত্র সত্যজিৎকে (মানিক) নিয়ে শান্তিনিকেতনে কবির সঙ্গে দেখা করতে যান। সুকুমার বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, আমার ছেলেকে আপনার আশ্রমে রাখবেন?’ কবিগুরুর উত্তর, ‘তোমার স্ত্রী যদি সম্মত হন।’ পরবর্তীতে কবি-সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ লিখছেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে আমি প্রথম কখন দেখেছিলাম তা আমার মনে নেই। তবে মনে আছে মা-এর সঙ্গে একবার পৌষমেলায় শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম। সঙ্গে নতুন অটোগ্রাফের খাতা।’
সেদিন রবীন্দ্রনাথ ছোট্ট মানিকের অটোগ্রাফের খাতায় লিখে দিয়েছিলেন ছোট্ট একটি কবিতা- ‘বহু দিন ধরে… একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশির বিন্দু।’ তার অনেক পর, সত্যজিৎ রায় ১৯৪০ সালের জুলাই-এ শান্তিনিকেতনে আসেন চারুকলা পড়তে, সত্যজিৎ যখন কলা ভবনের ছাত্র, রবীন্দ্রনাথ তখন বৃদ্ধ।
শান্তিনিকেতনে সত্যজিৎ প্রায় আড়াই বছর কাটান। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর পর সত্যজিৎ শান্তিনিকেতন ছাড়েন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২০।
রবীন্দ্র গল্পকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এমন পরিচালকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ১৯২৯ সালে শিশিরকুমার ভাদুড়ির ‘বিচারক’ দিয়ে শুরু হয় রবীন্দ্রসাহিত্যকেন্দ্রিক সিনেমা। তারপর মৃণাল সেন, তপন সিংহ- অনেকেই। কিন্তু সর্বাগ্রণী তথা সার্থক একমাত্র সত্যজিৎই। সাহিত্য ও চলচ্চিত্র দুটিতেই ভিন্ন স্বাদের শৈল্পিকতা সমভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু চলচ্চিত্রে চরিত্রকেন্দ্রিক অনন্য শিল্প সৃষ্টি দেখা যায় শুধুমাত্র সত্যজিতের ক্ষেত্রে।
রবীন্দ্র গল্পকে কেন্দ্র করে সত্যজিৎ মোট পাঁচটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৬১ সালে তিনটি ছোটগল্প ‘পোস্টমাস্টার’, ‘মণিহারা’ ও ‘সমাপ্তি’ নিয়ে নির্মাণ করেন ‘তিন কন্যা’। এই ছবিটিতে ভিন্ন পটভূমি এবং সামাজিক পরিবেশের তিন তরুণীর আবেগঘন অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে। এরপর ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে রবীন্দ্রজীবন ও কর্মের উপর নির্মাণ করেন ৫৪ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র ‘Rabindranath Tagore’ | এরপর ১৯৬৪-তে উপন্যাস ‘নষ্টনীড়’ অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘চারুলতা’, সবশেষে, ১৯৮৪ সালে ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসকে কেন্দ্র করে বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমিতে নির্মাণ করেন ‘ঘরে বাইরে’। সত্যজিৎ কয়েকটি ছবিতে রবীন্দ্রসংগীতও ব্যবহার করেন।
সত্যজিৎ রায় একজন অসামান্য চলচ্চিত্র পরিচালক। রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে কেউ যদি স্বশিল্পের মাধ্যমে নারীর অবস্থা ও অগ্রগতিকে প্রস্ফুটিত করে সকলকে অনুপ্রাণিত করে থাকেন তাহলে অবশ্যই তিনি সত্যজিৎ রায়।
তাঁর নির্মিত নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রগুলি যে নারীদের আগামীর আশা দেয় তা অস্বীকার করা যায় না। রবীন্দ্র গল্পকেন্দ্রিক যে চলচ্চিত্রগুলি তৈরি করেছেন, সেখানে তিনি তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটিয়েছেন। চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন নারীদের সঠিক সত্যের রূপ। এককথায় সমাজবদ্ধ, সংসারাবদ্ধ, পুরুষশাসিত এবং সর্বোপরি পরাধীন ভারতের স্বাধীনচেতা নারীচরিত্রগুলিকে বাস্তবচিত্র দিয়েছেন রবীন্দ্রপ্রেমী সত্যজিৎই।
(লেখক পেশায় শিক্ষক। মালদার বাসিন্দা)
