যুদ্ধবিরতি যেন প্রহসন

যুদ্ধবিরতি যেন প্রহসন

ব্লগ/BLOG
Spread the love


মিশরের শার্ম আল শেখে গাজা শান্তি শীর্ষ সম্মেলনের পর দু’সপ্তাহও কাটেনি। এর মধ্যেই সেই শান্তির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইজরায়েল এবং প্যালেস্তাইনের জঙ্গি সংগঠন হামাস অনুপস্থিত থাকলেও তিনদিনের ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্বের তিরিশটি দেশের প্রতিনিধিরা। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে যৌথ পৌরোহিত্যে সম্মেলন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প‌ জানিয়েছিলেন, আলোচনায় গৃহীত বিশ দফা শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিয়েছে ইজরায়েল ও হামাস।

বাস্তবে শীর্ষ সম্মেলনের আগেই যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইজরায়েল ও হামাসের ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ইজরায়েলি মন্ত্রীসভায় তা অনুমোদিতও হয়। বিশ্বের ইতিহাসে বহু শান্তি চুক্তি অল্প সময়ের মধ্যে ভেস্তে গিয়েছে। কিন্তু ইজরায়েল-হামাসের মতো এত কম সময়ে শান্তি সমঝোতা বানচাল হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন।

যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরেও গাজায় ইজরায়েলের বোমাবর্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র হানা, গোলাগুলি অব্যাহত। রোজই নিহত হচ্ছেন বহু মানুষ। রাষ্ট্রসংঘের নির্দেশ সত্ত্বেও ত্রাণ পৌঁছোচ্ছে না লক্ষ লক্ষ আশ্রয়হীন, বুভুক্ষু মানুষের কাছে। যুদ্ধবিরতির কারণে রাফা সীমান্ত বন্ধ থাকায় গাজায় আটকে থাকা প্রায় বিশ হাজার মানুষকে চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে অন্যত্র সরানোর নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কেননা, ক্ষেপণাস্ত্র হানা, বোমাবর্ষণে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে গাজার অধিকাংশ হাসপাতাল।‌ যে দু-একটি হাসপাতাল কোনওরকমে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলিতে চিকিৎসার পরিকাঠামোই নেই।

বহু শিশুর শরীরে গুলি ঢুকে আছে। হাসপাতালে অপারেশনের পরিকাঠামো নেই বলে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হয়েছে তাদের। তারই মধ্যে চলছে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর হামাস-বিরোধী হুংকার। নেতানিয়াহুর সুরে সুর মেলাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প‌ও। গাজায় চলতি অশান্তি নিয়ে হামাস এবং ইজরায়েল পরস্পরের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছে।‌

হামাসের অভিযোগ, ইজরায়েলি সেনা নিরস্ত্র গাজাবাসীকে হত্যা করে চলেছে। অন্যদিকে তেল আভিভ কখনও বলছে, হামাস জঙ্গিরা আক্রমণে উদ্যত হচ্ছে বলেই ইজরায়েলি সেনা গুলি চালাতে বাধ্য হচ্ছে। আবার কখনও বলছে, হামাস নিজেই গণহত্যা চালিয়ে তেল আভিভের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কে প্রথম ভেঙেছে, জানার উপায় নেই। এনিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। দুর্ভাগ্যজনক যে, কিছু দেশের ঐকান্তিক চেষ্টা সত্ত্বেও গাজায় শান্তি ফেরানো গেল না।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস জঙ্গিদের ওপর ইজরায়েলের আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, দু’বছর পরেও তার আগুন নেভেনি। হামাসের হামলায় ওইদিন ১১৩৯ জন ইজরায়েলি নিহত হন। অন্যদিকে গাজার স্বাস্থ্যমন্ত্রকের দাবি, ইজরায়েলি হানায় গত দু’বছরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৮১০০। প্যালেস্তাইনে হিংসার বলির এই পরিসংখ্যান মেনে নিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ।

ট্রাম্প মার্কিন মসনদে দ্বিতীয়বার বসার পর ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেন। আট-নয় মাস বাদে সেই যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে চুক্তি হল ঠিকই, কিন্তু বাস্তবায়ন হল না। কী এর কারণ? প্রথমত, বারবার আলোচনা হলেও ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন বিরোধের মূল বিষয়গুলি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বন্দি বিনিময় ছিল যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায়। কিন্তু গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, নিরস্ত্রীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।

দ্বিতীয়ত, সার্বিক রাজনৈতিক সমাধানের কোনও দিশা নেই শান্তি চুক্তিতে। হামাস ছাড়াও প্যালেস্তাইনে সক্রিয় আরও কিছু গোষ্ঠী। অথচ ইজরায়েল বরাবর কথা বলেছে শুধু হামাস নেতৃত্বের সঙ্গে। অন্যান্য গোষ্ঠীকে কখনও আলোচনায় ডাকেনি ইজরায়েল সরকার। তাই যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানার দায় নেই তাদের। আসলে স্থায়ী সমাধানের কোনও দিশাই নেই চুক্তিতে। আপাতত কাজ চালানোর মতো জোড়াতালি ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। যার ফলে আকাশে ওড়া দূরের কথা, রানওয়েতেই যেন মুখ থুবড়ে পড়ল বিমান।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *