রূপায়ণ ভট্টাচার্য
শূন্য প্লাস শূন্য করলে কী হয়? কী হয় আবার? শূন্যই হয়!
শূন্য মাইনাস শূন্য করলে কী হয়? এবার এই প্রশ্নটা করলে আপনি রেগেই যাবেন– ইয়ার্কি হচ্ছে আমার সঙ্গে? কী হয় আবার? শূন্যই তো হয়!
সরি সরি, কোনওরকম ইয়ার্কির জন্য প্রশ্ন দুটো করা হচ্ছে না। করা হচ্ছে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় জেলার এক রাজনৈতিক সমীকরণ বোঝাতে।
মৌসম নুর কংগ্রেসে ফেরায় কংগ্রেসের কী লাভ হল? উত্তর ওই শূন্যর মতোই। তেমন কিছুই নয়। বড়জোর হয়তো সুজাপুর।
মৌসম নুর তৃণমূল থেকে সরে যাওয়ায় তৃণমূলের কী ক্ষতি হল? উত্তর ওই শূন্যের মতোই। তেমন কিছুই ক্ষতি হল না। বড়জোর হয়তো সুজাপুর।
মৌসম বাংলার রাজনীতির এক অন্যতম সেরা উদাহরণ, যেখানে অফুরন্ত সুযোগ পেয়েও কেউ কাজে লাগাতে পারলেন না। স্রেফ উদ্যোগের অভাবে, নিজস্ব আলসেমির দোষে, ভালো পরামর্শের দোষে। তাঁর জেলা মালদাই এখন কংগ্রেসের শেষ দুর্গ। সেখানে তিনি একবার রাজ্য যুব কংগ্রেসের সভাপতি হয়েও একফোঁটা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি পনেরো বছরে। বাংলাতে তো নয়ই, মালদাতেও নয়। যে পদে একদা ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ভুলে যাবেন না, মৌসম কংগ্রেসের অন্দরে সেবার ভোটে জিতেছিলেন রাহুল গান্ধির প্রার্থী হিসেবে। হারিয়েছিলেন দীপা দাশমুন্সির মনোনীত প্রার্থী অরিন্দম ভট্টাচার্যকে। এখন কংগ্রেসের জাতীয় রাজনীতিতে কোথায় দীপা, কোথায় মৌসম!
ভুলি কী করে, মৌসম প্রথম বিধায়ক হন ২০০৮ সালে, মা রুবি নুরের মৃত্যুতে। গনি খানের ভাগ্নি ১৮ বছরেও রাজ্য রাজনীতিতে সামান্য তরঙ্গ তুলতে পারেনি। এখনও ঘুরেফিরে তাঁর চোখ সেই সুজাপুরে। মা ও মামার পুরোনো কেন্দ্রে। নজর এত ছোট কেন, মৌসম?
মৌসম নিয়ে হিন্দি সিনেমায় কত ভালো ভালো গান রয়েছে ভাবুন। ধরতি কহে পুকার কে, বীজ বিছা লে প্যায়ার কে, মৌসম বিতা যায় (দো বিঘা জমিন), আজ মৌসম বড়া বেইমান হ্যায় (লোফার), সুহানা সফর অউর মৌসম হাসিন (মধুমতী), ইয়ে মৌসম কা জাদু হ্যায় (হাম আপ কে হ্যায় কৌন), মৌসম ও মৌসম সুহানে আ গয়ে (জুদাই), ইয়ে রাতে ইয়ে মৌসম নদী কা কিনারা ইয়ে চঞ্চল হাওয়া (দিল্লি কা ঠগ)।
রাজনীতির মৌসমকে নিয়ে লিখতে গিয়ে সবার আগে মনে পড়ছে এই হাফ ডজন গান। সত্যিই, মৌসমের দিন চলে যাচ্ছে। মরশুম চলে যাচ্ছে। নিজের জেলাতেই, পিছনে গনি খানের বিশাল ‘হ্যালো’ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি মৌসম। অনেকটাই তাঁর উদ্যোগের অভাবে। তৃণমূল কর্মীরা মহম্মদ রফির গান গাইতে পারেন, মৌসম বড়া বেইমান।
মৌসমের ব্যর্থতার পিছনে কোথাও হয়তো বড় হয়ে গিয়েছে তাঁর ভদ্রতা বোধ, বিতর্কিত কথা বলতে না পারার ‘ব্যর্থতা’! এবং তাঁকে ঘিরে থাকা অসৎ সঙ্গীরা। মালদার তৃণমূলের দিকে তাকান! যে নেতারা ছড়ি ঘোরাচ্ছেন, সবাই দল বদলিয়া। এবং তাঁদের দাপট ওই নির্দিষ্ট একটা ছোট্ট অঞ্চল জুড়ে। আরএসপির রহিম বক্সী, ফরওয়ার্ড ব্লকের তজমুল হোসেন, কংগ্রেসের সাবিনা। প্রত্যেকেরই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি না করে দিন চলে না। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। জেলাজুড়ে দাপট দেখানোর ক্ষেত্রেও একশোয় শূন্য। মৌসম পারতেন হয়তো। তাঁর শিক্ষা ছিল। কিন্তু আভিজাত্যের আলসেমির মোড়কেই তাঁর সর্বনাশ হয়ে গেল। কোথায় কী সুবিধা পাওয়া যাবে তা নিয়ে তিনি যেন বেশি ব্যস্ত ছিলেন। তৃণমূল তাঁকে বিধায়ক, রাজ্যসভার সাংসদ, মহিলা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব দেওয়া পর্যন্ত ঠিক ছিল। যেই তাঁর দায়িত্বজ্ঞানের অভাব দেখে তৃণমূল আগ্রহ হারাল, আগ্রহ গেল মৌসমের।
দক্ষিণ মালদার সাংসদ ইশা খান চৌধুরী একই সঙ্গে মৌসমের মামাতো দাদা এবং জামাইবাবু। ইশা ভদ্র, সৎ, মানুষের পাশে থাকেন। তবে সেই এক রোগ তাঁরও, মালদার নির্দিষ্ট ছোট্ট অঞ্চলেই কাজকর্ম সীমাবদ্ধ। সারা বাংলার হতে পারেন না, হওয়ার ইচ্ছেও নেই। বোন কাম শ্যালিকাকেও তিনি একই পথে নিয়ে গেলেন। আমাদের হাতে একটা করে কেন্দ্র থাক, তা হলেই চলবে। আমার রইল দক্ষিণ মালদা, তোর সুজাপুর। আমার সাংসদ পদ, তোর বিধায়ক পদ। জেলার পার্টি শক্তিশালী না হলেও চলবে। কোতুয়ালি পরিবারে শান্তি!
তবে শান্তি, শান্তি কোথায় আছে! দুর্জনেরা বলে থাকেন, ভাইবোনের রাতারাতি এক হয়ে ওঠার পিছনে গনি পরিবারের জমিজমা বাঁচানোর অনেক অঙ্ক কাজ করে। এমনিতে মালদায় মুসলিম ভোটব্যাংকে তৃণমূলের থাবা অনেকটা আলগা হয়েছে মমতা সরকারের ওয়াকফ ইস্যুতে মনোভাব নিয়ে। গনি পরিবারেও রয়েছে সেই সম্পত্তি হারানোর ভয়।
মালদার শাহজালালপুরের কোতুয়ালিতে গনি খানের পুরোনো বাড়িতে এখন চারটে পরিবার। একদিকে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আবু হাসেম, মানে ডালু থাকেন সাংসদ-পুত্র ইশাকে নিয়ে। ডালুর ভাই আবু নাসের, মানে নেবু ওই বাড়িতেই থাকেন, আলাদা প্রাচীর দিয়ে। আলাদা গেট তাঁর, অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন।
গনি খানের দুই ভাই-ই বেশ অসুস্থ। মৌসম থাকেন ডালুর দিকে। তাঁর বাড়ির পিছনে আবার থাকেন শেহনাজ কাদরি। মৌসমের নিজের মাসতুতো বোন। তিনি সরকারিভাবে এখনও তৃণমূলে। তবে মৌসমের মতোই, এতটুকু সিরিয়াস নন। পিছনে অনুগামী নেই। যারা ছিল, বসে গিয়েছে। রাজনীতিটা এই বোনও গা লাগিয়ে করেন না, পরিবার ভাঙিয়ে করেন। এসব দেখেশুনে রাজনীতি থেকে দারুণ মজা নিতে ভালোবাসেন যাঁরা, তাঁরা আবার কিশোর-আশার ওই বিখ্যাত ‘মৌসম গান’ গাইতে পারেন মহানন্দার তীরে বসে। ইয়ে রাতে ইয়ে মৌসম নদী কা কিনারা ইয়ে চঞ্চল হাওয়া।
মালদার মহানন্দার কিনারায় সত্যিই রাজনীতি আজ এক চঞ্চল হাওয়া। সুবিধেবাদের হাওয়া, দলবদলের হাওয়া, গোষ্ঠীবদলের হাওয়া, টাকা লুটের হাওয়া। মৌসম, কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী, খগেন মুর্মু, শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী, তজমুল হোসেন, রহিম বক্সী, সাবিনা ইয়াসমিন সবাই এই গানই গাইতে পারেন। চঞ্চল হাওয়া এক সাংঘাতিক জিনিস।
