- গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়
দশটা কুড়ি। আজ আবার দেরি না হয়ে যায়। সপ্তর্ষী দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে কোনওরকমে বাকি গ্রাসগুলো মুখে পুরল।
বেল বাজল।
কে আবার এখন এল? মা দেখ তো।
দেখছি। তুই একটু ধীরেসুস্থে খা।
আজ একটু তাড়া আছে, তুমি দেখ কে এল।
কুরিয়র।
দরজা খুলে সুদেষ্ণা খামটা হাতে নেয়। সই করে। দরজা বন্ধ করে।
কী এল? আমি তো কোনওকিছু অর্ডার করিনি!
একটা চিঠি মনে হচ্ছে। বলতে বলতে সুদেষ্ণা ডাইনিং টেবিলের ওপর বাদামি এনভেলপটা রাখে।
তুই দেখে নিস। আমাকে আবার একটু বেরোতে হবে।
তুমি আবার কোথায় বেরোবে?
বেরোব, একটা সেমিনার আছে। ওদের গাড়ি এসে পড়ল বোধহয়। হ্যাঁ ওই তো এসে গেছে মনে হচ্ছে। রিটায়ারমেন্টের পরেও অবসর নেই।
বিষয় কী?
উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট।
তোমার মনের মতো বিষয়।
হুঁ, সে তো বটেই। নিখরচায় যত জ্ঞান দিতে পার দিয়ে যাও।
তাহলে যাচ্ছ কেন?
জায়গাটা বেশ সুন্দর বলে মনে হল। বারাসতের দিকে একটা বাগানবাড়ি। তার মধ্যেই একটা ছোট অডিটোরিয়াম আছে। সেখানে দিনভর কেত্তন।
বেল বাজে আবার। সুদেষ্ণা বেরিয়ে যান। সপ্তর্ষী মৃদু হেসে বাঁ হাত দিয়ে বাদামি এনভেলপটা টেনে নেয়। ওপরের লেখাটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে, এখন তো সময় নেই। পরে দেখা যাবে। বেসিনে হাত ধুয়ে নিজের ঘরে যায় সপ্তর্ষী। অফিস বেরোবার আগে একবার মেলটা চেক করতে হবে। এখনও খানিক সময় আছে।
ল্যাপটপ অন করে। হাতে খামটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে নজর পড়ে প্রেরকের নামের দিকে। টাইপ করে লেখা, অনিন্দিতা- লেকটাউন। বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে সপ্তর্ষির। চিঠি কেন? ওদের তো দেখা হওয়ার কথা এই শনিবার। আগের দিনই সপ্তর্ষি বলেছে, আর দেরি করবে না, এবার অনিন্দিতার লেকটাউন ছেড়ে একেবারে দক্ষিণে তাদের ফ্ল্যাটে চলে আসার কথা। আর দু’মাস পরেই তো সপ্তর্ষি বদলি হচ্ছে চেন্নাই। তার আগে রেজিস্ট্রি সারতে হবে। মাঝে দুজনে মিলে একবার চেন্নাই গিয়ে একটা বাড়িও ঠিক করে আসার কথা। এই সব ভাবনার মাঝেই সপ্তর্ষি খামটা ছিঁড়ে ফেলেছে। সাদা কাগজের ওপর কালো হরফগুলো ভেসে ওঠে।
অ্যায় শোনো,
তোমাকে যে কী বলে সম্বোধন করব তা জানি না। যা দিয়েই সম্বোধন করতে যাই মনে হয় কেমন যেন বোকা বোকা শোনাচ্ছে। অতএব, আদ্যিকালের ‘অ্যায় শোনো’। তোমার নিশ্চয় মনে হচ্ছে কেন হঠাৎ সেই মান্ধাতার আমলের চিঠি পাঠাচ্ছি তোমায়। পাঠাচ্ছি, তার মূলত দুটো কারণ আছে। প্রথমত, এই কথাগুলো মেলে লেখার মতো নয় বা এমন ছোট নয় যে মেসেজ করে দেব। দ্বিতীয় কারণ হল, এই চিঠিটায় রক্ত-মাংসের গন্ধ মাখানো আছে, যেটা মেসেজ বা ই-মেলে থাকলে ছুঁতে পারতে না। একটু বড় চিঠি, তোমার পড়তে সময় লাগবে। আমি এখনও গত বুধবারের সন্ধের ঘোর থেকে বেরোতে পারিনি। এদিনই আবিষ্কার করলাম তুমিই হচ্ছো আমার কাঙ্ক্ষিত তৃতীয় পুরুষ।
কী হল? ভুরু কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেল মনে হল। আমি কিন্তু লিখতে লিখতে দেখতে পাচ্ছি। হ্যাঁ, শোনো, তুমি সত্যিই আমার জীবনে তৃতীয় পুরুষ। আমার জীবনের অন্য দুজন পুরুষের কথা তোমাকে আজ পর্যন্ত আমি বলিনি। আমার জীবনের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত হয়ে আছে। তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় বছর গড়াতে চলল। তুমি এসেছিলে আমার বন্ধু হয়ে। তারপর কোন সময় যে এতটা কাছে চলে এলে তা আমি নিজেই বুঝতে পারিনি। বুঝলাম সেদিন, যেদিন দেখলাম, অফিসে তুমি না এলে কেমন ফাঁকা ফাঁকা বোধ হচ্ছে। খাঁখাঁ করছে চারপাশটা। তুমি হচ্ছো বড় অফিসার আর আমি তো সবে প্রবেশনে। কীভাবে যে তোমার সঙ্গে আমার এই অসম বন্ধুত্ব হয়ে গেল তার রসায়নও আমি জানি না। তুমি দূরে এক ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আসছিলে। কপালে উড়ে এসে পড়ছিল কয়েকটা এলোমেলো চুল। অফিসের দরজা দিয়ে ঢোকার সময় আমার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই এমন দরাজ একটা হাসি ছুড়ে দিলে আমার দিকে, আমি ফিদা হয়ে গেলাম। আমার জীবনে প্রথম পুরুষ কিন্তু তোমার মতো এমন নাটকীয়ভাবে এভাবে আসেনি।
প্রথম পুরুষের গল্প : তখন আমার বয়স সবে নয়। ক্লাস থ্রি। মা স্কুলের ড্রেস পরাতো আর বাবা স্কুলে পৌঁছে দিত। বাড়ি ফিরতাম বন্ধুদের গাড়িতে। ওদের বাড়িটা ছিল ঠিক গলির মোড়ে আর আমাদের ফ্ল্যাট ছিল গলির শেষ প্রান্তে। ওইটুকু পথ হেঁটে আসতে আসতে নিজের মনেই বলতাম, আজ আর বাড়িতে কেউ অশান্তি করবে না। কিন্তু আমার কথা কেউ শুনত না। সন্ধের সময় প্রায় প্রতিদিন মা আর বাবার মধ্যে র্যাপিড ফায়ার সেশন শুরু হয়ে যেত। আর আমি তখন কী করতাম বলত? আমি পাশের ঘরটায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে বালিশে মুখ ঘুঁজে পড়ে থাকতাম। চোখ মুছে একাই হোমওয়ার্ক করার কী প্রাণান্তকর চেষ্টা। তবে এই ধুন্দুমার পরিস্থিতিটা থেমে গেল হঠাৎ। স্কুল থেকে বেরিয়েছি। দেখি আমাকে নিতে মা দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বোঝার আগেই মা আমার হাত ধরে একটা সাদা বড় গাড়ির দরজা খুলে আমাকে পিছনের সিটে বসিয়ে দিল। মা সামনের সিটে বসল। গাড়ির স্টিয়ারিং যাঁর হাতে তাকে আগে কোনওদিন দেখিনি। চোখে চশমা, তামাটে গায়ের রং। মিষ্টি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে কথা বললেন যেন মনে হল, কতদিনের চেনা।
মায়ের সঙ্গে বাবার ডিভোর্স হয়ে গেল। তারপর বাবার কী হল? কিছুই জানি না। ছোটবেলার বাবাটা হারিয়ে গেল। মা বলল, বাবা নাকি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়েছে। তা হবেও বা। আমরা গিয়ে উঠলাম, সুদর্শনকাকুর বাড়িতে। মা আর সুদর্শনকাকুর বিয়ে হয়ে গেল। সুদর্শনকাকুর ফ্ল্যাটে একটা অনুষ্ঠান হল। আলো ঝলমল করল, গান হল, পার্টি হল। সেই রাতে সকলে চলে যাবার পর মা বলে দিল, সুদর্শনকাকুকে এবার থেকে পাপাই বলে ডাকতে হবে। আমি একটু ভুরু কুঁচকে ছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সুদর্শনকাকু আমাকে কোলে তুলে নিয়ে এমন আদর করল যে আমি আর সুদর্শনকাকু না বলে পাপাই বলে ডাকতে শুরু করলাম। পাপাই মোটেও আমার বাবার মতো ছিল না। মায়ের সঙ্গে কোনওদিন জোরে কথা বলতে শুনিনি। আর আমাকে যে কী ভালোবাসত। মা রান্না করত, পাপাই অফিস থেকে প্রতিদিন আমার জন্য হয় চকোলেট, না হয় কোনও কমিকস নিয়ে আসত। পাপাই বাড়িতে আসার আগে আমার বুক দুরদুর করত, ভাবতাম, আবার কী কিনে আনবে কে জানে। সন্ধের সময় আমাকে পড়াতে বসত। মা তখন তো রান্নাঘরে। পড়া শেষ করে পাপাই আমার সঙ্গে আই স্পাই ইউ খেলত। তুমি কি জান আই স্পাই ইউ কেমন করে খেলে? দরজা বন্ধ করে ঘর অন্ধকার করে পাপাই লুকিয়ে থাকত, আমাকে খুঁজে বার করতে হত, কখনও উলটোটা। আমি লুকিয়ে থাকতাম, পাপাই আমাকে খুঁজে বার করত। রান্না শেষ হলে পাপাই মায়ের সঙ্গে গল্প করতে বসত। না, ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ হয়ে গেল সে বাড়িতে। কিন্তু একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেল।
আমরা পরের বছর বেড়াতে গেলাম পাহাড়ে। সিকিম থেকে কালিম্পং। কী সুন্দর জায়গা! আমি তখন দশ। আমরা সারাদিন ধরে ঘুরেছি। বিকেলে হোটেলে ফিরেছি। মা ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কিন্তু আমার যেন আর আনন্দের শেষ নেই। পাপাইকে বললাম, আবার একটু বেড়াতে বেরোব। পাপাইতো সঙ্গে সঙ্গে রেডি। আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম একেবারে টিলার ওপরে। তখন পশ্চিমের সূর্য অস্ত যাচ্ছে, সামনে দেখতে পাচ্ছি সমস্ত আকাশটা কেমন যেন সিঁদুর গোলা রং হয়ে গেল। আমি একেবারে টিলার শেষ প্রান্তে চলে গিয়েছি। আর সেই সময়েই ডান পা থেকে জুতোটা খুলে নিমেষে একেবারে খাদের নীচে। আমি চিৎকার করে ডাকলাম, ‘পাপাই’। পাপাই ছুটে এসে টিলার ধারে দাঁড়াতেই আমার চোখের সামনে অতলান্ত খাদের তলায় দুরন্ত গতিতে পড়তে লাগল পাপাইয়ের শরীরটা। আমি চিৎকার করে উঠে মাটিতে বসে পড়লাম। আর আমার বিশেষ কিছু মনে নেই। পাপাইয়ের শরীরটা তুলতে পারেনি রেসকিউ টিম।
মায়ের কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। একদম চুপ করে গেল আমার মা। আর আমার জীবনের প্রথম পুরুষ এইভাবে হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে।
দ্বিতীয় পুরুষের গল্প : ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর তিন বছর কেটে গিয়েছে। তখন আমি তেরো। পাপাইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে আর থাকতে পারছিল না মা। চেষ্টাচরিত্র করে আগের চাকরিটা পালটে একটা ইংলিশ মিডিয়ম স্কুলে চাকরি নিল। লেকটাউনে। আমরাও পাপাইয়ের ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে চলে গেলাম রাজারহাটের এক প্রান্তে, অন্য একটা অ্যাপার্টমেন্টে। চারপাশে অনেক অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি হচ্ছে তখন সেখানে। কোনওটার মাথার ওপরে লোহার খাঁচা, কোনওটার চারপাশে বিরাট বড় বাঁশের সিঁড়ি, ওই উঁচুতে উঠে কাজ করছে রাজমিস্ত্রি। কী সাহস! আমাদের পাশেই সঙ্গীতা অ্যাপার্টমেন্টের তিনতলায় থাকত আমার ক্লাসের অমৃতা। আর ওদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকত সন্দীপদা। যেমন হ্যান্ডসাম তেমন স্মার্ট। তেমন সুন্দর দেখতে সন্দীপদার বৌ। রোমান্টিক কাপল বলতে যা বোঝায়, ওরা ছিল সেরকম। প্রথম যেদিন অমৃতাদের ফ্ল্যাটে গিয়েছি সেদিনটা ছিল রবিবার। ভুল করে সন্দীপদার ফ্ল্যাটে বেল টিপে দিয়েছি। দরজা খুলেছিল প্রীতি বৌদি। সন্দীপদা ঘরে ঢুকেই একগাল হেসে আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করল যেন কতদিনের চেনা। সন্দীপদা তখন সবে একটা কলেজে অঙ্কের অধ্যাপক হয়ে ঢুকেছে। এত ভালো লাগত ওদের ফ্ল্যাটে যেতে, কী বলব। হঠাৎ সন্দীপদা নিজেই একদিন বলল, আমাকে অঙ্ক দেখিয়ে দেবে। আমি তো ভীষণ খুশি হয়ে গেলাম। অঙ্ক আমার একেবারেই মাথায় ঢুকত না। সন্দীপদাকে আমার মাও বেশ পছন্দ করতে শুরু করেছে ততদিনে। সন্দীপদা আমাকে অঙ্ক করাবে বলে আমাদের ফ্ল্যাটেই চলে এল একদিন। তারপর আর আমাকে যেতে হয়নি। মা যেত স্কুলে, সন্দীপদা কলেজে ক্লাস করে আমাদের ফ্ল্যাটে চলে আসত। আমাকে অঙ্ক করাতে হবে যে। ওদিকটায় তখনও যাকে বলে নাগরিক পরিষেবা ঠিকমতো পাওয়া যেত না। সন্ধের ঝোঁকে মাঝে মাঝেই পাওয়ার ফেলিওর হয়ে যেত। এইরকম হঠাৎ করে লোডশেডিং হয়ে গেলে আমার খুব ভয় করত, এখনও করে। সন্দীপদা আমাকে বলত, ভয়ের কিছু নেই। এক্ষুনি আলো চলে আসবে। আমি ভয়ে কাঠ হয়ে বসে থাকতাম। একদিন বিকেলেই চলে এল সন্দীপদা। আমার জন্য কত কী গিফট হাতে করে এনেছিল। সেদিন আমিই বলেছিলাম, পাশের যে বিরাট এগারোতলা ফ্ল্যাটটা তৈরি হচ্ছে তার ছাদে যাব। ওপর থেকে শহরটাকে দেখতে কেমন লাগে, খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল। সন্দীপদা আমার হাত ধরে সতর্কভাবে সেই এগারোতলায় উঠেছিল। কী বলব সপ্তর্ষী, ওপর থেকে নীচের মানুষগুলোকে একেবারে পুতুলের চেয়েও ছোট মনে হচ্ছিল। আমি একেবারে ছোট্ট বালিকার মতো চারপাশটা ছুটে ছুটে দেখছিলাম। বারবার আমাকে সাবধান করছিল সন্দীপদা। আমি শুনলে তো! সেদিন আমাকে ভূতে পেয়েছিল। আর এবারে ছুটতে ছুটতে কখন যে একেবারে ছাদের কিনারায় চলে গিয়েছি নিজেই জানি না। সন্দীপদা একছুটে এসে আমাকে ধরেছে। আমার সম্বিত ফিরতে দেখি, সন্দীপদার ওই সুন্দর শরীরটা ওই এগারোতলা থেকে দুরন্তগতিতে নীচে পড়ছে। ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে সন্দীপদার শরীরটা। একটা ধাতব শব্দ কানে এল। আর কিছু মনে নেই আমার।
তৃতীয় পুরুষ : এরপর আমার জীবনে আর কোনও পুরুষের প্রবেশ ঘটতে দিইনি। কিন্তু পারলাম কই? তুমি যে কখন ঢুকে পড়েছ আমার মনের গহিন অরণ্যে, কখন যে শাখা বিস্তার করে আমাকে জড়িয়ে ধরেছ, আমি নিজেও জানি না। আমাদের সম্পর্কের এক বছর পেরোল গত বুধবার। তুমি, সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব করলে। সেটাই তো স্বাভাবিক। আমিও তো এটাই চাইছিলাম। কিন্তু ওই যে হঠাৎ আলো চলে গেল। আর তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট রাখলে, তখনই আমার মনে একটা আগুন জ্বলে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, এরপর তো ক্রমানুসারে সব হবে। পুরুষ আর নারীর মধ্যে যা হয়ে থাকে। অন্ধকারে পুরুষরা যে নারীদের শরীর কী করে তা তো আমি জেনেছি আগেই। সুদর্শন আর সন্দীপ, অন্ধকার ঘরে আমার ছোট্ট শরীরটা নিয়ে দিনের পর দিন তো এই খেলাই খেলেছে। সুদর্শনকে যখন ঠেলে ফেলেছিলাম তখন মনের মধ্যে অদ্ভুত শিহরন হয়েছিল, জানো? সেই এক শিরশির করা আনন্দ আবার টের পেয়েছিলাম সন্দীপকে এগারোতলা থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার পর। কিন্তু তোমাকে তো আমি হারাতে পারব না, কিছুতেই না। অথচ বুধবার অন্ধকার ঘরে আমাকে স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকে কীরকম একটা হিল্লোল বয়ে গেল। আতঙ্কের সঙ্গে টের পেলাম শিরদাঁড়া বেয়ে একটা সরীসৃপ হিসহিস করে ওপরে উঠে আসছে। আমি অনেক কষ্টে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে নিলাম নিজেকে। তুমি এতই ভালো যে, আমাকে কোনও প্রশ্ন করলে না। ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে। আমি কিন্তু তখনই বুঝে গেলাম, তোমাকে আমি কিছুতেই হারাতে পারব না। বুঝলাম, নিজেকে সরিয়ে ফেলতে হবে তোমার কাছ থেকে। সরিয়ে ফেলতে হবে এই পৃথিবী থেকেই।
এই চিঠি যখন পাবে, তখন আমাকে আর পাবে না। খুব ভালো থেকো। আমার জীবনের সমস্ত রক্তকণিকা দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে গেলাম।
সন্ধে নামবে একটু পরেই। ব্যালকনির পাথরের মেঝেতে ছায়া ছায়া নরম রোদ্দুর। বসে পড়ে সপ্তর্ষী। ভুরু কুঁচকে দেখতে থাকে, নীচের মানুষগুলোকে কত ছোট দেখায়।
