একসময় বামপন্থীদের গতে বাঁধা স্লোগান ছিল- মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবীণ ও প্রৌঢ়দের মনে উসকে দিল সেই স্মৃতি। প্রমাণ হল, আমেরিকা আছে আমেরিকাতেই। কোনও সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে উৎখাত করে পুতুল সরকারকে বসানোর সেই ট্র্যাডিশন আজও চালু রেখেছে আমেরিকা।
ইংরেজি নববর্ষের শুরুতেই ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার খবরদারি ফের দেখলেন বিশ্ববাসী। কারাকাসের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজর পড়েছে গ্রিনল্যান্ড, ইরান, কিউবায়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাঁদের প্রাসাদ থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স। অপহরণের পর প্রথমে জাহাজে এবং পরে বিমানে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় নিউ ইয়র্কে।
মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসের অভিযোগ বহুদিন ধরেই করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছিল, অপহৃত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীর বিচার হবে মার্কিন আদালতে। সেইমতো বিচার শুরু হয়ে গিয়েছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমেরিকার এই পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে বিশ্বজুড়ে। চিন, রাশিয়া, কলম্বিয়া, পানামা, ইরান সহ বিভিন্ন রাষ্ট্র, রাষ্ট্রসংঘ আমেরিকার খবরদারির নিন্দা করেছে।
তবে এই প্রথম নয়, এমন অভ্যাস মার্কিন শাসকদের বহু আগে থেকে আছে। ১৯০০ সাল থেকে এযাবৎ মোটামুটি ৩৬ দেশে সরকার উলটে দিয়েছে আমেরিকা। তার মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য- ইরান (১৯৫৩), গুয়াতেমালা (১৯৫৪), কঙ্গো (১৯৬০), দক্ষিণ ভিয়েতনাম (১৯৬৪), ব্রাজিল (১৯৬৪), চিলি (১৯৭৩), পানামা (১৯৮৯), আফগানিস্তান (২০০১) ও ইরাক (২০০৩)। গুয়াতেমালায় আবার এক বছরেই তিন-তিনবার সরকার বদল করেছিল আমেরিকা।
আবার ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালিবান শাসন উৎখাত করে এই আমেরিকাই ক্ষমতায় বসিয়েছিল হামিদ কারজাইকে। কিন্তু অদৃষ্টের কী পরিহাস! আজ কাবুল আবার সেই তালিবানের হাতে। ২০০৩ সালে ইরাকে একই কায়দায় আমেরিকার ফন্দিতে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল সাদ্দাম হোসেনকে। প্রসঙ্গান্তরে চলে আসে লাদেনের প্রসঙ্গও। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে রাতের অন্ধকারে আল-কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে তার গোপন আস্তানায় ঢুকে খতম করেছিল আমেরিকার এই এলিট ডেল্টা ফোর্সই।
আসলে মাদক-সন্ত্রাস ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাহানামাত্র। খনিজসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার সর্বত্র তেলের ভাণ্ডার। চিন যেমন ইরাকি তেল ভাণ্ডারগুলো থেকে তেল সরাচ্ছে, আমেরিকার তেমন নজর ভেনেজুয়েলার তেলে। একসময় ভারত প্রচুর তেল কিনত ভেনেজুয়েলা থেকে। মার্কিন আপত্তিতেই ভারত তেল কেনা বন্ধ করে। আজ আমেরিকার নিজেরই নজর ভেনেজুয়েলার তেলে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণাই করে দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমেরিকার হাতে। তার সঙ্গে দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংকে মজুত ভেনেজুয়েলা সরকারের তাল তাল সোনাও নজরে আছে ট্রাম্পের। তেল ও সোনার লোভে সার্বভৌম দেশে বেনজির হানাদারি দেখল পৃথিবী।
এই সেদিনও যিনি নিজেকে ‘পিস প্রেসিডেন্ট’ বলে দাবি করছিলেন, ভারত-পাকিস্তানের সংঘর্ষ বিরতির কৃতিত্ব হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দাবি করছিলেন, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক অপহরণ করে নিজের দেশে উড়িেয় নিয়ে গিয়ে আটক করলেন। ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ আপাতত প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে।
রদ্রিগেজ শুরুতে মার্কিন দাদাগিরি নিয়ে রক্ত গরম করা কথাবার্তা বললেও পরে যেন সুর নরম মনে হচ্ছে। আপাতত আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করার পক্ষপাতী তিনি। বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলেও ভারত কিন্তু ভেনেজুয়েলা নিয়ে বিবৃতিতে আমেরিকার নামোচ্চারণ করেনি, ঘটনার নিন্দাও করেনি, শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যাতে রেগে না যান, ট্রাম্পের রোষের মুখে যাতে পড়তে না হয়, তার জন্যই বোধহয় নয়াদিল্লির এমন সাবধানতা। তাতেও ট্রাম্পের হুংকার থেকে রেহাই পেল না ভারত। আবারও মস্কো থেকে তেল কিনলে বাণিজ্য শুল্ক বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
