মেয়েটা নেই, স্মৃতিটাও যেন উধাও

মেয়েটা নেই, স্মৃতিটাও যেন উধাও

শিক্ষা
Spread the love


মাটির তলায় চাপা রয়েছে দেহ। বিস্মৃতির তলায় চাপা রয়েছে দুঃখ। সবকিছু স্বাভাবিক। বছর ঘোরার পর এলাকায় পুজো পুজো ভাবটাও দিব্যি আছে। খালি ধর্ষণের পর জ্বালিয়ে দেওয়া সেই কিশোরীর প্রাণটুকুই যা নেই।

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, জয়গাঁ: পুজোয় অঞ্জলি দেওয়ার কথা ছিল না ঠিকই। তবে কথা ছিল, এবছরও মায়ের দেওয়া সস্তার জামাটা পরে এবছরও ঠাকুর দেখতে বেরোবে মেয়েটা। খিলখিলিয়ে হাসবে। ১০ টাকায় কেনা ফুচকার তেঁতুলজলে নাক, চোখ, ভ্রূ কোঁচকাবে। ক’টা দিন পড়াশোনা করবে না। হঠাৎ যেন হারিয়ে গেল বছর আটের মেয়েটা। তোর্ষাপাড়ে যেখানে আধপোড়া দেহটা কবর দেওয়া হয়েছিল, সেটা আর চট করে চেনাও যাচ্ছে না।

ভুটান পাহাড়ের বুক বরাবর কুণ্ডলী পাকানো মেঘের দল বলছে শরৎ এসেছে। পাদদেশে বইছে তোর্ষা নদী। আর নদীর বুক থেকে শুরু হয়েছে ঘিঞ্জি বস্তিটা। সীমান্ত শহর জয়গাঁয় একেবারে ভুটান ঘেঁষে ক্রমবর্ধিষ্ণু বস্তিটার নাম গুয়াবাড়ি। ১১ মাস আগে সেই বস্তিতেই জনরোষের আগুন জ্বলেছিল। সবে লক্ষ্মীপুজো পেরিয়েছে। বিবেকানন্দ ক্লাবের কালীপুজো ঘিরে গুয়াবাড়িতে তখন সাজোসাজো রব। তখনই পাওয়া গিয়েছিল আট বছরের মেয়েটার আধপোড়া দেহটা। ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল শিশুটিকে। অথচ বছর ঘুরতে না ঘুরতেই গুয়াবাড়ি আবার পুরোনো স্রোতে। যেন কিছুই ঘটেনি।

শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে বস্তির দিকে সরু গলি ধরে ধীরগতিতে এগোচ্ছিল ছোট গাড়িটা। পথে একের পর এক নির্মীয়মাণ পুজোমণ্ডপ। পুজোর আমেজ জয়গাঁজুড়ে। গুয়াবাড়িতে দুর্গাপুজো হয় না। তবে বিবেকানন্দ ক্লাব কালীপুজো করে। কিন্তু দুর্গাপুজোয় গা ভাসান গুয়াবাড়িবাসীও। বিশেষ করে কমবয়সিরা। শহরটা আলোয় সেজে ওঠে তো! বছর পেরিয়ে ফের দুর্গাপুজোর আমেজ গুয়াবাড়িতে। ফের প্রস্তুতি। দর্জির দোকানে মহিলাদের ভিড়। দোকানে দোকানে কিশোরী-তরুণীদের চুড়িদার, লেহেঙ্গার খোঁজ। রোয়াকে ছোকরাদের আড্ডা। লটারি কাউন্টারে ‘সৌভাগ্য’ খুঁজতে ভিড়। সব আগের মতোই। লালসার বলি সেই মেয়েটির মা’ও আগের মতোই এখন আবার সাতসকালে বেরোন কাজের খোঁজে। পেট কথা শোনে না যে!

মূল গলির বাঁদিকে একটা শাখা গলি। তারপর ডানদিকে আরেকটা প্রশাখা গলি। গলিতে ছেঁড়া ময়লা কাপড় পরা উশকোখুশকো চুলওয়ালা খুদেদের হুটোপাটি। অচেনা মুখ দেখে ওদের চোখে কৌতূহল! যত এগোনো যাচ্ছে, গলিটা তত সরু হচ্ছে। আরও একটা গলি। বড়জোর ফুট তিনেক চওড়া। গলিটার মাথায় ওই বাড়িটা। ১০ ফুট বাই ১২ ফুট একটা শোয়ার ঘর। রান্নাঘরটা মেরেকেটে ৮ ফুট বাই ৮ ফুট। ফুটিফাটা টিনের চালা থেকে গড়িয়ে পড়া জল আটকাতে টাঙানো পলিথিন শিট। জরাজীর্ণ দেওয়ালের আড়াই ফুট দূরে একই আকারের দুটি ঘর। সেই দুটো ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে এক দম্পতিকে। উঁকি দিতেই ১০ ফুট বাই ১২ ফুটের অন্ধকার বেডরুম থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী মূক প্রৌঢ়। ভেতরে ঢুকতেই হাতে ইশারায় বসতে বললেন। ‘আপনি কি ওর বাবা?’ মাথা নেড়ে প্রৌঢ় বোঝালেন, ‘হ্যাঁ!’ আঙুল দিয়ে গুনে দেখালেন, তিন ছেলেমেয়ে ছিল। বড়টাকে ওরা মেরে ফেলেছে। বাকি দুজন আছে।

ওদের মা তখন বাড়ি নেই। ভাত জোটাতে কাজে গিয়েছেন। বাড়ি থেকে বেরোতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল চেনা ভিড়। কোলাহল। দোকানে দর কষাকষি। হাসাহাসি। পুজো নিয়ে প্ল্যান। স্থানীয় এক মহিলা দোকানদারকে ঘটনাটা নিয়ে প্রশ্ন করতেই পালটা প্রশ্ন, ‘আপনি কে?’ পরিচয় দিতেই গলা নামিয়ে বললেন, ‘ভেতরে ভেতরে কী হচ্ছে জানি না। তবে মেয়েটির পরিবারও আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। এছাড়া ওরা ভীষণ গরিব। মেয়েটার বাবা অসুস্থ ওর মা-ই সংসার চালান। প্রতিদিন সকালবেলা কাজের খোঁজে বের হতে হয় ওর মাকে।’ সেই ঘটনা নিয়ে কথা হচ্ছিল কবিরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি কবিতা লেখেন। বাম আমলে গুয়াবাড়ির তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য ছিলেন। এখন তাঁর ভ্রাতৃবধূ ওই পার্টের পঞ্চায়েত সদস্যা। কবিরুলের কথায়, ‘মহল্লার বেশিরভাগই মুসলিম। তবে পুজোর সময় আনন্দ করতে ছুঁতমার্গ নেই। মেয়েটা বেঁচে থাকলে আরেকটু বড় হত। এবছরও পুজোয় ঠাকুর দেখতে যেত নিশ্চয়ই।’ একটু থেমে কবিরুলের অকপট মন্তব্য, ‘মানুষ হয়তো ভুলতে শিখেছে। সেবার তো আন্দোলনও হয়েছিল। লাভ কী হল।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *