গণতন্ত্রের অন্যতম মূল শর্ত হল সামগ্রিক জীবনধারার মানোন্নয়ন, আইনের শাসনের প্রবর্তন এবং সমাজের সমস্ত শ্রেণির মধ্যে শান্তি এবং সুস্থিতি কায়েম। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার পর রাজ্যবাসীর আশা জেগেছিল, এবার হয়তো গণতন্ত্রের মূল শর্তগুলি পালনে তৎপর হবে সরকার। বর্তমান শাসকদলের প্রতিশ্রুতির মধ্যে সেই বার্তা ছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবের দূরত্ব ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যেভাবে সমাজজীবনে অসহায়তার ছবিটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং সেই সঙ্গে মৃত্যুমিছিল প্রলম্বিত হচ্ছে, তা প্রশাসনের পক্ষে মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে একাদিক্রমে কয়েকটি মৃত্যু রাজ্য সরকারের সদিচ্ছাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু শুধু একটি মর্মান্তিক ঘটনা হিসাবে লিপিবদ্ধ হওয়ার কথা নয়। কেন না, এই মৃত্যু রাজ্যের কৌলীন্যকে মলিন করেছে।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলন্ত মরদেহের পাশে যে সুইসাইড নোট পাওয়া গিয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে সেটি তাঁর লেখা বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সেই চিরকুটের সারমর্মটি বড় কঠিন এবং নিষ্ঠুর। চিরকুটে ইঙ্গিত মিলেছে, তাঁকে কালিমালিপ্ত করার যে অভিপ্রায় চলছিল, তা তিনি আর মেনে নিতে পারছিলেন না এবং সেজন্য আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। পুলিশ স্বীকার করেছে, আশিসের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনও দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েনি।
যদি সেই বয়ান সত্য হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, কোনও দুষ্টচক্র প্রতিহিংসাবশত আশিসের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং সেই চাপ সহ্য করতে না পারার দরুন তাঁর জীবনের এই করুণ পরিণতি ঘটেছে। মৃতের পরিবার একই অভিযোগ এনেছে। মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনায় তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু যেভাবে প্রতিদিন সমাজে অসূয়া এবং ঘৃণার কুনাট্য রচিত হচ্ছে, তা কি থামানো সম্ভব হচ্ছে?
বাঁকুড়ায় ককরোচ জনতা পার্টির স্বেচ্ছাসেবক আবদুল হাফিজের বাবা শেখ মহম্মদ মাফিক, নদিয়ায় কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান এবং তাঁর ছেলের মৃত্যু এই প্রশ্নটি আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছে। ভরসার পরিবর্তে ভয়ের আবহের এই পরিসর যাতে বাড়তে না পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে রাজ্য সরকারকে। সরকারের রক্তচক্ষু এবং পুলিশের লাঠির সাহায্যে সুশাসনের প্রতিষ্ঠা হয় না।
প্রকৃত সুশাসনের জন্য প্রয়োজন সরকারের দূরদৃষ্টি এবং সমাজের প্রতি সহমর্মিতা। সরকারের দূরদৃষ্টির তেমন কোনও চিহ্ন এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি। পূর্বতন সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতি এবং দুষ্প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে অভিযান চালালে শাসকদলের কর্মী এবং সমর্থকরা উল্লসিত হয়ে থাকেন- সেটা সত্য। কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। যেসব সমস্যায় রাজ্যবাসী পর্যুদস্ত হয়ে আছেন, সেগুলির সমাধান না হলে সরকার বিরোধী তরঙ্গ ধীরে ধীরে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে যেতে থাকে।
দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের জন্য চাই সরকারের দূরদৃষ্টি। বাঁকুড়ায় যেভাবে শেখ মহম্মদ মাফিকের মৃত্যু হয়েছে, তা বিশেষভাবে ইঙ্গিতবাহী। তাঁর ছেলে আবদুল হাফিজ দিল্লির যন্তরমন্তরে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, সেখান থেকে ফিরে আসার পর তিনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে সেখানকার হালহকিকত জানতে চান।
তাঁর অভিযোগ, ওই ঘটনার পরই তাঁর বাড়িতে হামলা চালায় কয়েকজন দুষ্কৃতী। দুষ্কৃতীদের হামলায় তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা যেমন জরুরি, তেমন প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার আমূল উন্নতি। ককরোচ জনতা পার্টির উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এখন শুরু হয়েছে জেন আলফা বিক্ষোভ। উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ সহ বিভিন্ন রাজ্যে স্কুল পড়ুয়ারা শিক্ষার বেহাল অবস্থার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে শুরু করেছে।
এই রাজ্যে একই হাল শিক্ষাব্যবস্থার। সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলিতে ন্যূনতম পরিকাঠামো নেই। শুধু পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে দোষারোপ করে অনুন্নয়ন ঢাকা দেওয়া যাবে না। সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের দায়িত্ব মাথায় তুলে নিতে হবে সরকারকে। তবেই ভরসার রাজত্ব কায়েম হবে।

