মানবিক মুখের উৎস সন্ধানে

মানবিক মুখের উৎস সন্ধানে

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


রূপায়ণ ভট্টাচার্য

শুধুই অসংখ্য খবরের মাঝে সারাদিন কাটিয়ে দেওয়ার যন্ত্রণা এখন প্রচুর। অধিকাংশ খবরে লেগে থাকে অত্যাচার, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, খুন বা রক্তের গন্ধ। বুলেট হয়ে এক একদিক থেকে ছুটে আসছে যেন এক একটা খবর। ওই বুলেটধারার মাঝে একটা প্রশ্ন এসে হাত টেনে ধরে। মানুষ এত নিষ্ঠুর হয়ে উঠল কেন?

সোশ্যাল মিডিয়ায় ওইসব খবর নিয়ে মন্তব্যগুলোর মাঝেও মানুষের কোমল দিকগুলো আলো ছড়ায় খুব কম। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারাতে ইচ্ছে করে না, তবু হারিয়ে যেতে থাকে সব। সবাইকে, নিজেকে পর্যন্ত সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার সালেমনের মা-এর মতো মনে হয় তখন। ‘এক আকালের মেয়ে তোমার/আরেক আকালের মুখে দাঁড়িয়ে/তোমাকেই সে খুঁজছে।’

এসবের ভিতরে আচমকা এক একটা খবর হৃদয় দ্রবীভূত করে যায় আচমকা। যেন রুক্ষ মরুভূমির মাঝে দিকচক্রবালে হঠাৎই জেগে উঠেছে একটি সবুজ পাহাড়। যা দেখে একটা কথা বলার ইচ্ছে করে না। শুধু অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার ইচ্ছে জাগে।

সেই রকম খবর মনে করায়, আছে, আছে, আছে। মানুষের ভিতরে এখনও মানুষ লুকিয়ে আছে। স্বার্থহীন, সত্যপথের পথিকরা আজও ঘুরে বেড়ায় সর্বত্র। সেখানে ওই রবীন্দ্রগানই গেয়ে ওঠা যায় নির্ভয়ে। ‘হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে যাহা-কিছু সব আছে আছে আছে/ নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই, নিশিদিন কাঁদি তাই।’

নির্মল আনন্দে নিশিদিন কাঁদিয়ে তোলার খবরও আছে অনেক। যা আমরা খেয়াল করি না।

বছর চারেক আগে এক ফরাসি ভদ্রলোক তাঁর ছোটবেলার ন্যানিকে খুঁজতে গিয়েছিলেন আইভরি কোস্টে। ভদ্রলোকের বাবা কাজ করতেন ও দেশে। তাঁর শিশুসন্তানকে দেখতেন স্থানীয় এক তরুণী। কোলেপিঠে মানুষ করা বলতে যা বোঝায়, সেটাই করতেন। ফ্রান্সে বড় হওয়ার সময় সেই বালকের মনে বারবার হানা দিত ন্যানির মুখ। আইভরি কোস্ট দেশটায় চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। তার মধ্যেই ফরাসি ভদ্রলোক অনেক চেষ্টা করে খুঁজে পেয়েছেন তাঁর বৃদ্ধা ন্যানিকে। অতি দারিদ্র্যে খুব করুণ দশা। ভদ্রলোককে চিনতে পেরে তাঁকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেছেন।
দেশে ফেরার আগে প্রচুর অর্থ সেই বৃদ্ধাকে দিয়ে এলেন ফরাসি ভদ্রলোক। আরও এমন ব্যবস্থা করে এলেন, যাতে মহিলার আজীবন কোনওরকম সমস্যা না হয়।

আইভরি কোস্টের সাম্প্রতিক দুর্দশার প্রেক্ষাপটে পুরোনো ঘটনাটি আবার নতুন করে ভাইরাল।

শুধু তো এরকমই নয়। মানুষের কোমল হৃদয়ের ছবি তুলে ধরে অনেক দেশ-বিদেশের প্রচুর খবর এবং ছবি। ইন্টারনেট যা পৌঁছে দেয় একেবারে করতলে। তখন আর মনে থাকে না, বহু যুগ আগের চরিত্র ঔরঙ্গজেবের সমাধিকে কেন্দ্র করে দাঙ্গায় মেতেছে নাগপুরের দুই সম্প্রদায়। বাংলাদেশে বর্বররা কারণ ছাড়াই খুন করছে অসহায় মানুষকে।

সেই একই তো মানুষ! কত রকম দিক তার, কতরকম শেড তার চরিত্রে।

একটি হাতি পড়ে গিয়েছে বিশাল গর্তের মধ্যে বা কাদায়। একটি বাচ্চা কুকুর ভেসে যাচ্ছে নদীর প্রবল স্রোতে। একটি হরিণ একেবারে আটকে গিয়েছে লোহার তারে। একটি সিল সমুদ্রসৈকতে এসে চোরাশিকারির ফাঁদে, পুরো শরীর জড়িয়ে গিয়েছে জালে। একটি ভালুক বরফের লেকে এমনভাবে আটকে, ফিরতে পারছে না। একটি শিশু হাতি পড়ে গিয়েছে পরিত্যক্ত কুয়োয়।

এদের যে কীভাবে, নিজের সব কাজ ফেলে জীবনের ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে বাঁচায় মানুষ! মানুষই তো! তখন মনুষ্যজাতির জন্য আকাশপ্রমাণ গর্ব হয়। ভুলে যাই আমাদের চারপাশে কত বিষময় খবর! বিদেশেও তো জনশূন্য রাস্তার মাঝে পোষা কুকুর বা বিড়ালকে হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে রেখে যায় মানুষ! সঙ্গে পশুগুলোর সদ্যোজাত কিছু সন্তান। অতজনকে পোষা কঠিন, তাই তারা নির্মমভাবে পরিত্যক্ত। অনেক বৃদ্ধ অসুস্থ সারমেয়র ভাগ্যেও যা জোটে শেষজীবনে।

মন খারাপ দৃশ্য যেমন রয়েছে, তেমন তো মন ভালো করা ছবিও দেখায় পৃথিবী।

সেদিন দেখলাম, এক দম্পতি জনশূন্য পথ দিয়ে যেতে যেতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়লেন এক অসহায় কুকুরের আর্তনাদ দেখে। তাঁরা দাঁড়াতেই সে কুকুর ইঙ্গিতপূর্ণ দৌড়োতে শুরু করে। বোঝাতে চায়, আমার পিছন পিছন এসো। হাঁটা শুরু হয়। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে বিধ্বস্ত কুকুরটি পিছনে তাকিয়ে দেখে, তারা তাকে অনুসরণ করছে তো? ছেড়ে দেয়নি তো আগের মতো?

মাইল দুয়েক জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পর এক জায়গায় সদ্য মা হওয়া কুকুরটি দাঁড়ায়। সে সেখানে সযত্নে আড়াল করে রেখেছে তার পাঁচ সদ্যোজাত সন্তানকে। এবার দম্পতিকে এনেছে তাদের বাঁচাতে। খাবার নেই। সে এত দুর্বল, সন্তানদের দুধ খাওয়াতে পারছে না।

স্বামী-স্ত্রী তখন সব কাজ ফেলে অতি দুর্বল সারমেয় মা ও সন্তানদের নিয়ে গেলেন হাসপাতালে। সেখান থেকে নিজেদের বাড়িতে।

পশুরাও তো এই মধুর বিশ্বে বিভিন্ন প্রান্তে ‘মানবিক’ হয়ে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ক্রুগের ন্যাশনাল পার্কে এক সিংহ শিশু হরিণ শিকারের পরে আবিষ্কার করল, সে অত্যন্ত ছোট। সদ্য জন্মেছে। দূরে অসহায় দাঁড়িয়ে হরিণ শাবকের মা। সিংহ প্রথমে নিজের থাবার মধ্যে রেখে খেলা শুরু করল হরিণের সঙ্গে। শিশু হরিণটি জানে না, সে যার সঙ্গে খেলছে, সে আসলে তার মৃত্যুদূত। অন্য সিংহরা এসে প্রথম সিংহের কাছে হরিণের ভাগ চায়। চায় তাকে মেরে ফেলতে। এই সিংহ তাতে রাজি নয়। তাদেরকে হটিয়ে দিয়ে কাছে রাখে শিশু হরিণকে। অনেক পরে পৌঁছে দেয় মা হরিণের কাছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এমনও যে দেখেছি, মা-হারা সারমেয় শিশুদের নিজের দুধ খাওয়াচ্ছে এক গোরু। বড় হচ্ছে তারা। একটা সময় মালিক গোরুটিকে অন্যত্র পাঠিয়ে দিল। কুকুররা এক কোণে পড়ে রইল অবসাদে। তারা তো জানে, ওই গোমাতাই তাদের মা। আবার যখন তাদের নিয়ে যাওয়া হল সেই গোরুটির কাছে, অবোলা মুখগুলোর কী উল্লাস-নাচানাচি। পৃথিবীই তাদের হাতের মুঠোয়, এমন অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে। সেটাই হয়ে ওঠে অন্য ভাষা। যা আসলে মানবিক ভাষা।

একটি হরিণ চিড়িয়াখানার বড় পুকুরে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, তাকে বাঁচাতে শুঁড় বাড়িয়ে দিচ্ছে হাতি। বহু চেষ্টাতেও কাজ হচ্ছে না দেখে হাতি শুরু করল বৃংহণ। সেই ডাক শুনে ছুটে আসে মানুষ। দুজনে মিলে হরিণকে বাঁচায়। হাতি শুঁড় তুলে মানুষকে অভিবাদন জানাতে জানাতে ফিরে যায়।

চিনের কোথাও এক বৃদ্ধা একা থাকেন পোষ্য কুকুর নিয়ে। যখনই বৃদ্ধা জঙ্গলের কাঠ নিয়ে ফেরেন বা খেতে চাষ করেন, কুকুরটি ছুটে গিয়ে তার সমস্ত বোঝা কার্যত কেড়ে নেয় হাত থেকে। অত বোঝা সে বৃদ্ধাকে বইতে দেবে না। নিজে বইবে। আর একটি কুকুর কীভাবে শুধু সঙ্গ দিয়ে, ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত এক বালককে ফিরিয়ে আনছে স্বাভাবিক জগতে।
সব মানবিক ভাষা।

লিখতে লিখতেই ভাবি, পশুদের জগৎ কতরকম শিক্ষা দিয়ে যায় মানুষকে। সে জগতে এখনও ঢোকেনি অমানবিক দিক। পশুরা মানবিক ভাষা দেখায়, মানুষের অস্ত্র হয়ে ওঠে পাশবিক আচরণ।

তবে অজস্র মানুষও আজও মানবিক আছেন বলেই সমাজ এখনও দাঁড়িয়ে। পৃথিবী চলছে নিজের গতিতে।
ভারতের বাইরে যেতে হবে না, এখানেই রয়েছেন এমন জন, যাঁদের জীবনের প্রতি পল এক শিক্ষা। টুকরো টুকরো ঘটনাই বিশাল শিক্ষা সেখানে।

ওডিশার গ্রামে উপেন্দ্র মহানন্দ এমনই একজন। গ্রামীণ মানুষ পেনশন, র‌্যাশন কার্ডের মতো ব্যাপারে আমলাতান্ত্রিক লাল ফাঁসে আটকে যান বারবার। উপেন্দ্র টুইটারে তাঁদের সমস্যা লিখে ট্যাগ করে দেন সরকারি কর্তাদের। সমস্যার সমাধান হয়ে যায় দ্রুত।

উপেন্দ্রর নামই হয়ে গিয়েছে ‘টুইটার ম্যান’। ওদিকে, মহারাষ্ট্রের বিড গ্রামে তত্ত্বশীল কাম্বলে ও অশোক টাংড়ে আবার সমাজ বদলাচ্ছেন হোয়াটসঅ্যাপকে অস্ত্র বানিয়ে। বন্ধ করে দিচ্ছেন নাবালিকাদের বিয়ে, মেয়ে পাচার। সব মেয়েদের ফোন নম্বর নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বানাচ্ছেন। বাবা-মা জোর করে বিয়ে দিতে চাইলে, কোনও লোক বিক্রি করার পথে এগোলে মেয়েটিই জানিয়ে দিচ্ছে গ্রুপে। নিজেরাই হয়ে উঠছে হুইসলব্লোয়ার।

নয়াদিল্লির ময়ূরবিহারের দিকে একজনকে পাবেন–রাকেশ খাত্রি নাম। তিনি ২০০৮ সাল থেকে চড়ুই পাখিদের বাসা বানিয়ে আসছেন পাট আর দড়ি দিয়ে। বানিয়ে ফেলেছেন ৭ লক্ষ ৩০ হাজার বাসা। ফলে যে চড়ুইরা হারিয়ে যাচ্ছিল রাজধানী থেকে, তারা ফিরে আসছে আবার। লোকে প্রথমে তাঁকে বিদ্রুপ করত, এখন করছে সমীহ।

এমনিতে পৃথিবী এখন, মানুষ এখন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা। ‘‘তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ‘চাচা/ আপন বাঁচা’র ধ্রুপদি চলচ্চিত্র,/যদিও নিজেকে সে তুলতে চায় সে মাচায়/ভুলে যায়, যারা গতকাল ছিল মিত্র/এখনো পচছে খাঁচায়।’’

আর এখনকার সময়? বীরেন্দ্ররই অন্য একটি কবিতা তা স্পষ্ট বোঝায়। ‘এমন এক অন্ধকার সময় আসে/যখন সৎ থাকার অর্থ রাস্তায় দাঁড়ানো/যখন বিশ্বাস মানেই পায়ের নীচে মাটি নেই।’

আজকের এই হিংস্রতা, দুর্নীতি, উগ্রপন্থা, ধান্দাবাজি, ট্রোলিং, দ্বিচারিতা, ধর্মীয় আফিম, জুয়া, নেশা–দশ দিগন্তের পৃথিবীর মাঝে ব্যতিক্রমী সাধারণ লোকই খুঁজে বেড়াই সকাল থেকে। সাধারণ হয়ে যাঁরা অসাধারণ হয়ে হৃদকমলে বাসা বাঁধেন এই দুঃসময়ে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *