ভারতের ফুসফুস আরাবল্লিতে রক্তচক্ষু

ভারতের ফুসফুস আরাবল্লিতে রক্তচক্ষু

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


 

  • অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

‘অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ,

কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না।’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার এই পংক্তিগুলি আজ আর কাব্যিক কল্পনা বলে মনে হয় না। বাস্তবেই যেন পাহাড় বিক্রি হতে বসেছে। ভারতের প্রাচীনতম পর্বতমালাগুলির একটি, পশ্চিম ভারতের আরাবল্লি পাহাড়শ্রেণি আজ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। প্রতিরোধ গড়ে উঠছে ঠিকই, কিন্তু সেই প্রতিরোধ কতটা শক্তিশালী এবং তা আদৌ প্রভাবশালী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

হিমালয়ের চেয়েও বহু প্রাচীন এই আরাবল্লি পাহাড়শ্রেণি ভূতাত্ত্বিকভাবে প্রায় ২০০–২৫০ কোটি বছরের ইতিহাস বহন করে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন। দিল্লি, হরিয়ানা ও রাজস্থানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে কাজ করেছে এই পাহাড়শ্রেণি। আরাবল্লি না থাকলে থর মরুভূমির বিস্তার বহু আগেই আরও পূর্ব দিকে এগিয়ে আসত বলে পরিবেশবিদদের একাংশ মতপ্রকাশ করে আসছেন। উত্তর-পশ্চিম ভারতের জলবায়ু ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এই পাহাড়শ্রেণি যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে, তা দীর্ঘদিনের গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বিতর্কের খতিয়ান

পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ, মাটি ক্ষয় রোধ এবং ধুলো–বালির ঝড় প্রতিহত করার ক্ষেত্রে আরাবল্লির ভূমিকা অপরিসীম বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা থেকে শুরু করে বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এই পাহাড়শ্রেণির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লি কার্যত ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে এসেছে।

এই কারণেই এতদিন পর্যন্ত ২০ ফুট উচ্চতার টিলা থেকে শুরু করে প্রায় এক হাজার ফুট উচ্চতার পাহাড় পর্যন্ত আরাবল্লি পাহাড়শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হত। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ খননের লোভনীয় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। পাথর, মার্বেল, কোয়ার্টসের মতো খনিজ উত্তোলনের নামে বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কাটা হয়েছে। পরিবেশবিদদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বাধায় সেই আন্দোলন অনেক সময় থমকে গিয়েছে।

এই প্রেক্ষিতেই আরাবল্লি রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ শুনানির পর ২০২৪ সালের মে মাস নাগাদ শীর্ষ আদালত পাহাড়শ্রেণির একটি ‘অভিন্ন সংজ্ঞা’ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। কারণ, খনির অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আরাবল্লি সংলগ্ন রাজ্যগুলি পরস্পরবিরোধী মানদণ্ড অনুসরণ করছে— এমন অভিযোগ উঠেছিল। রাজস্থান, হরিয়ানা, গুজরাট ও দিল্লির প্রতিনিধিদের নিয়ে এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রকের সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়।

এই কমিটির দায়িত্ব ছিল, রাজস্থানে দীর্ঘদিন ধরে যে সংজ্ঞা কার্যকর রয়েছে, তা বিবেচনা করে অন্য রাজ্যগুলির সামনে একটি সমন্বিত প্রস্তাব তুলে ধরা। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, অন্য রাজ্যগুলি রাজস্থানের সংজ্ঞা গ্রহণে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু বিতর্ক শুরু হয়, যখন কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রক থেকে একটি নতুন সংজ্ঞার কথা সামনে আসে। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নয়, বরং আশপাশের এলাকার তুলনায় ১০০ মিটার বা তার বেশি উচ্চতার ভূখণ্ডকেই আরাবল্লি পাহাড় বলে গণ্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে শীর্ষ আদালত সেই সংজ্ঞার উপর ভিত্তি করে খনন সংক্রান্ত একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেয় কেন্দ্রকে।

 সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে

এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এতদিন যেগুলি আরাবল্লির অংশ বলে চিহ্নিত ছিল, তার একটি বড় অংশ আর পাহাড় হিসেবে গণ্য হবে না বলে পরিবেশবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, আরাবল্লিতে প্রায় ১২ হাজার ছোট-বড় পাহাড় রয়েছে, যার একটি বড় অংশই ১০০ মিটারের নীচে। এই পাহাড়গুলিতে থাকা ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চলই এতদিন ধরে পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করে এসেছে। নতুন সংজ্ঞা কার্যকর হলে এই অঞ্চলগুলি কার্যত খনির জন্য উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এর প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দিল্লি, হরিয়ানা ও উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জলবায়ুতেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। প্রচলিত ভূগোল অনুযায়ী পাহাড়ের সংজ্ঞা শুধু উচ্চতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি পর্বতমালার বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভূমিকা বিচার করেই তাকে মূল্যায়ন করা উচিত বলে পরিবেশবিদদের মত। প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে গিয়ে যদি সংকীর্ণ সংজ্ঞা আরোপ করা হয়, তাহলে তার মাশুল দিতে হবে প্রকৃতিকেই।

দীর্ঘদিনের কুনজর

আরাবল্লির উপর প্রভাবশালী মহলের নজর নতুন নয়। ১৯৭০ ও ’৮০–র দশক থেকেই এই অঞ্চলে খননের কাজ শুরু হয়। এর ফলস্বরূপ বন উজাড় হয়, জলস্তর নেমে যায় এবং বায়ুদূষণ বাড়ে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, ২০০২ ও ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট খনন সংক্রান্ত কড়া নির্দেশ জারি করতে বাধ্য হয়। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবিউনালও একাধিকবার রাজ্য সরকারগুলিকে সতর্ক করেছে। তবুও বাস্তবে আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে গাফিলতি দেখা গেছে। খননের পাশাপাশি অবৈধ নির্মাণও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আরাবল্লি না থাকলে কী হবে— এই প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞদের মত প্রায় এক। উত্তর ভারতের বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন বদলে যেতে পারে, ভূগর্ভস্থ জলের স্তর আরও নীচে নেমে যেতে পারে এবং থর মরুভূমির বিস্তার ত্বরান্বিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। দিল্লি–এনসিআরের বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরাবল্লি যে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে এসেছে, তা অস্বীকার করা যায় না।

কেন্দ্রের আশ্বাস

কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব সম্প্রতি দাবি করেছেন, আরাবল্লির ক্ষেত্রে কোনও পরিবেশগত ছাড় দেওয়া হয়নি এবং খনন নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আরাবল্লির মোট এলাকার খুব সামান্য অংশই খননের জন্য চিহ্নিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। কিন্তু পরিবেশবিদদের আশঙ্কা একটাই— রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা প্রভাবশালী মহল যতদিন সক্রিয় থাকবে, ততদিন ভারতের অন্যতম প্রাকৃতিক লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে পরিচিত এই আরাবল্লি পাহাড়শ্রেণি বিপন্নই থেকে যাবে।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *