সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে অবশেষে স্বস্তি দেশের জেন জেড-এর। স্বস্তি কেন্দ্রীয় সরকারেরও। যন্তরমন্তরে আন্দোলনরত তরুণদের বিরুদ্ধে দায়ের মামলাগুলি বিশেষ ক্ষমতাবলে বাতিল করে দিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। দিল্লি, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, অসম ইত্যাদি রাজ্যে দায়ের মোট ১১৬টি এফআইআর বাতিলের আর্জি এবং চার রাজ্য সরকারের সুনির্দিষ্ট আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই মামলাগুলি রদ করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ আন্দোলনরত পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে সমস্ত এফআইআর বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছে। এই বিচার প্রক্রিয়া ভারতীয় গণতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থায় অনন্য নজির। বিতর্কের মূল উৎস ছিল নিট-এর প্রশ্ন ফাঁসের মারাত্মক অভিযোগ। নিজেদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা ও শিক্ষার মান সুরক্ষার তাগিদে রাজপথে নেমেছিলেন হাজার হাজার পড়ুয়া।
শেষপর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করলেও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণে বিলম্বের অভিযোগে পরিস্থিতি পুনরায় উত্তপ্ত হতে থাকে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, লিখিত আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও পুলিশি পদক্ষেপ ও এফআইআর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি। এই ক্ষোভ থেকে ককরোচ জনতা পার্টি ৫ সেপ্টেম্বর বিশাল প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দিয়েছিল নয়াদিল্লিতে। তবে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি চলাকালীন সেই বরফ গলতে শুরু করে।
সংগঠনটির নেতা সৌরভ দাস শেষমেশ জানান, সরকারের ইতিবাচক আশ্বাস এবং সর্বোচ্চ আদালতের সাংবিধানিক পবিত্রতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে ৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবাদ মিছিল প্রত্যাহার করা হয়েছে। আন্দোলনে দাগি অপরাধীদের ঢুকে পড়া নিয়ে তাঁরা সরব হন। ককরোচ জনতা পার্টি মেনে নেয়, সত্যিই কোনও দাগি আন্দোলনস্থলে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকলে তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।
যদিও তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, দুর্ধর্ষ অপরাধীরা কী করে এতদিন সমাজে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছিল? কেন্দ্র পালটা দাবি করে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে তারা সরেনি। কোনও পড়ুয়ার বিরুদ্ধে পুরোনো এফআইআর যেমন থাকবে না, তেমন নতুন করে এফআইআর রুজুও হবে না। নিট বিপর্যয়ে মানসিক অবসাদে আত্মঘাতী পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলেও কেন্দ্র আশ্বাস দিয়েছে।
দিল্লি পুলিশ অবশ্য আদালতে আবেদন করে, আন্দোলন চলাকালীন ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তিতে চিহ্নিত ২,৮৭৩ জন নির্দিষ্ট অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি পদক্ষেপ করার স্বাধীনতা দেওয়া হোক। কারণ, এরা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে শারীরিক নির্যাতন ও সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের মতো গুরুতর অপরাধ করেছে।
কেন্দ্র আদালতকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, এই ব্যবস্থা ঢালাও নিপীড়ন নয়, বরং সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক কাজের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ। আদালতের মতে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা করা রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার দায়িত্ব। শিক্ষার্থীরা নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সৎ উদ্দেশে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। তাই দেশের কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চালানো যাবে না।
আত্মঘাতী পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে আগামী তিন মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এবং একটি জাতীয় ক্ষতিপূরণ কাঠামো তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়। তবে আইনি শৃঙ্খলার কথা মাথায় রেখে সর্বোচ্চ আদালত দিল্লি পুলিশের আবেদনটিতে আংশিক মঞ্জুর দেয় একটি ব্যতিক্রমী শর্ত যুক্ত করে। আদালত স্পষ্ট করে, সেই ২,৮৭৩ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ থাকলেই পুলিশ নতুন এফআইআর করতে পারবে।
অবশ্যই সেই অভিযুক্তরাও নিজেদের নির্দোষ প্রমাণে আইনি সহায়তা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার পাবেন। সুপ্রিম কোর্টের এই হস্তক্ষেপ এক ঐতিহাসিক সমতা বিধান করল। একদিকে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে পুলিশি হয়রানি ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতা থেকে রক্ষা করা হল, অন্যদিকে হিংসাত্মক ঘটনায় আইনের শাসন বজায় রাখার পথ সুগম রইল। এতে প্রমাণ হল, বিচার ব্যবস্থা সার্বিক সুশাসনের রক্ষাকবচ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
The submit বেনজির পদক্ষেপে স্বস্তি appeared first on Uttarbanga Sambad.
