বুলডোজারের নীচে চাপা পড়ে আনন্দ

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


শহর পরিচ্ছন্ন রাখার তাগিদে জীবিকা হারানো মানুষের অধিকার ও পুনর্বাসনের বিষয়টি জরুরি।

অনুষ্কা বর্মন

উচ্ছেদ, বুলডোজার, পুনর্বাসন— এই শব্দগুলি ক’মাস আগেও জীবনের প্রতিশব্দ হয়নি তাঁদের। কিন্তু কয়েক মাসে বদলেছে জীবনের ছন্দের ছবি। অপরাধ, স্টেশনে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান চালানো। স্টেশনের বাইরের রাস্তাটায় পরোটা-ঘুঘনি, ব্যাগের সম্ভার সাজিয়ে ছোট্ট খুপরির মধ্যে এক অন্য দুনিয়া গড়ে তোলা। সেখানে পথচলতি মানুষ থেকে নিত্যযাত্রীদের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এক অনামী আত্মীয়তা। আর কারও কারও ক্ষেত্রে অপরাধ, পূর্বে নোটিশ দেওয়ার পরও সেখান থেকে না ওঠা। উঠবে কীভাবে? কোথায় যাবে? বিকল্প ব্যবস্থা কই? সে উত্তর জানা নেই কারও।

বুলডোজারের চাকার কি নিজস্ব কোনও শব্দ আছে? হয়তো আছে। যা ঢাকের আওয়াজের চেয়ে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ। কারণ, ঢাকের বাদ্যিতে শুধু আনন্দ ভাসে, কখনও ভিড় করে এক নাম না-জানা মন খারাপ। কিন্তু বুলডোজারের ঘর্ঘর শব্দে গুঁড়িয়ে যায় কিছু মানুষের বেঁচে থাকার শেষ মেরুদণ্ডটুকু।

রাস্তা মেরামত ও ফুটপাথ পরিষ্কারের কাজ নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য জরুরি। তবে পরিচ্ছন্নতার আড়ালে চা বা ফল বিক্রেতা হঠাৎ জীবিকা হারালে উন্নয়নের হিসাব অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁদের দোকান হয়তো কয়েকটি ইট, ত্রিপল আর একটি উনুনের সমষ্টি। কিন্তু সেই সামান্য পরিসরই একটি পরিবারের রোজগার, সন্তানের খাবার ও টিকে থাকার ভরসা। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ধারদেনা, ক্রেতার আস্থা ও বহু বছরের অভ্যাস।

ফুটপাথ নিশ্চয়ই শুধু দোকানের জন্য নয়। পথচারীর চলাচল, জরুরি পরিষেবা ও যানজট নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে। বেআইনি দখল থাকলে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারও আছে। কিন্তু ব্যবস্থা কীভাবে নেওয়া হচ্ছে? একদিনে জায়গা খালি করা সহজ; কিন্তু বহু বছর সেখানে নির্ভরশীল মানুষটির পরের দিনের রোজগার কোথা থেকে আসবে, তার উত্তর দেওয়া কঠিন। শহরের সৌন্দর্যায়নে এই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। ফুটপাথ পুরোপুরি ফাঁকা রাখা একমাত্র সমাধান হতে পারে না।

এখানেই পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার প্রসঙ্গ আসে। ২০১৪ সালের স্ট্রিট ভেন্ডার্স আইন রাস্তার বিক্রেতাদের জীবিকা রক্ষা ও ব্যবসাকে নিয়মের মধ্যে আনার উদ্দেশ্যে তৈরি। আইনে ভেন্ডিং কমিটির মাধ্যমে সমীক্ষা, জোন নির্ধারণ ও সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা রয়েছে। সমীক্ষা ও সার্টিফিকেট দেওয়ার আগে বিক্রেতাদের উচ্ছেদ বা স্থানান্তর না করার বিধানও রয়েছে। জনস্বার্থে কোনও অঞ্চলকে ভেন্ডিং নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় স্থানান্তরের বিধানও আছে। তাই আইনকে শুধু প্রশাসনের ছাড়পত্র হিসেবে দেখলে চলবে না; এর উদ্দেশ্য নিয়ম ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

তবে এই সুরক্ষা সমীক্ষা ও নির্দিষ্ট বিধির সঙ্গে যুক্ত, সবসময় একইভাবে প্রযোজ্য নয়। বাস্তবে সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রত্যেক বিক্রেতার পরিস্থিতি এক নয়। কারও কাছে ভেন্ডিং সার্টিফিকেট আছে, কারও কাগজপত্র অসম্পূর্ণ, কারও দোকান পুর এলাকায়, কারও রেলের অধীনে। ফলে সব ক্ষেত্রেই একই নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে না।

প্রশাসনিক জটিলতা মানুষের জীবিকার প্রশ্নকে অদৃশ্য করতে পারে না। সমীক্ষা, স্বচ্ছ নোটিশ এবং উপযুক্ত বিকল্প জায়গা নিয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা থাকলে উচ্ছেদের ধাক্কা কমানো সম্ভব। এতে পথচারীর অধিকার রক্ষা পায়, বিক্রেতার জীবনও অনিশ্চয়তায় ঠেলে যায় না। সঠিক পরিকল্পনায় সংঘাত কমে।

উৎসবের আনন্দ সবার কাছে পৌঁছানোর কথা। আলোকসজ্জা যেমন শহরের পরিচয়, ফুটপাথের ছোট পসরা এবং পরিশ্রমী মানুষের জীবনও তারই অংশ। পুজোর বাজারে তাঁদের আয় বাড়ার কথা, অথচ জায়গা হারালে সেই সুযোগ হারায়। পরিবারের কাছে এই দোকান শুধু আয় নয়; এটি সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রতিদিনের নিশ্চয়তার ছোট্ট অবলম্বন।

তাই পরিচ্ছন্ন ও মানবিক শহরকে পরস্পরের বিরোধী করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা ও সংবেদনশীলতা। উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারও সমান গুরুত্ব পায়।

উচ্ছেদের এই নিরাসক্ত রাজনীতি আজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, গোটা রাজ্যের ইমারতে রঙের প্রলেপ পড়লেও, খসেছে মানবিকতার পলেস্তারা। আনন্দময়ীর আগমনে বৈষম্য নেই, উৎসবও আলো ছড়াচ্ছে তার চিরাচরিত নিয়মে। একদিকে উৎসব সবার, কিন্তু বেঁচে থাকার অধিকারটুকু কি কেবল ক্ষমতাবানদের?

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *