- চিরঞ্জীব রায়
দেহাতের সঙ্গে তাঁদের নাড়ির টান। অথচ কোনও না কোনও বাধ্যতা তাঁদের ঘরছাড়া করেছে। বিহারের এই গোত্রীয় যে কোটি কোটি মানুষ, যাঁদের গালভরা পোশাকি নাম পরিযায়ী, তাঁরাই কিন্তু পারেন আগামী ৬ এবং ১১ নভেম্বর সমস্ত হিসেবনিকেশ তছনছ করে রাজ্য শাসনের রাজনীতির পাশা উলটে দিতে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী সংখ্যাটা ছিল মাত্রই ৭৫ লক্ষ। রাজ্যের জনসংখ্যার ৭.২ শতাংশ। ২০২২-’২৩ সালের বিহার জাতি গণনা ও কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রকের পরিসংখ্যান মোতাবেক সেই সংখ্যাটা বেড়ে তিন কোটি ছুঁয়েছে। রাজ্যের প্রত্যেক চারজন পূর্ণবয়স্কর মধ্যে একজন মূলত রুজির দায়ে ভিনরাজ্যের বাসিন্দা। প্রধানত সরন, সিওয়ান, গোপালগঞ্জ ও সীমাঞ্চল জেলার এই বাসিন্দাদের অনেকেই দিওয়ালি এবং ছটপুজোর সময় বাড়ি ফেরেন। এবারেও ফিরেছেন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং রাজনীতিকদের অভিজ্ঞতা দিকনির্দেশ করছে, ভোট ও উৎসব কাছাকাছি হওয়ায় ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ পরিযায়ী মহান নাগরিক কর্তব্যটি সমাধান করতে থেকে যেতে পারেন এবং তার যথেষ্টই প্রভাব পড়তে পারে রাজ্যের ২৪৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে। কারণ, অধিকাংশ কেন্দ্রেই হারজিতের ব্যবধান থাকে ১০ থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে। এবং এই ব্যবধান গড়ে দিতে পরিযায়ীদের ভোট মোটেই হেলাফেলার নয়।
যে দল বা নেতারা চান না, প্রবাসীরা এসে ভোট দিয়ে শেষ খেলাটা দেখিয়ে দিক, তাঁদের জন্যও সুখবর আছে। ছুটির মঞ্জুরি, যাতায়াতের খরচ, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) এবং যে তাগিদে নিজভূম ছাড়তে বাধ্য হওয়া, সেই কাজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, এতগুলো বাধা টপকে তাঁদের ভোটের বোতাম টিপতে আসতে হবে। ফলে অংশগ্রহণ পর্বটি নিছক ডালভাত নয়।
তবুও পরিযায়ীদের গল্পটা মোটেই ছোট করে দেখতে চায় না বিহারের রাজনীতি। তার এক নম্বর কারণ যদি হয় সংখ্যা, দু’নম্বর কারণ অবশ্যই ধর্ম-জাতপাত আকীর্ণ ভোট-ময়দান। গোটা দেশের মধ্যে সবথেকে বেশি পরিযায়ী শ্রমিক বিহারের। সেই সংখ্যাটা তিন কোটি ছুঁয়েছে, এবং ভোটের বাজারে যে সেই সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এটা তেজস্বী যাদব থেকে নীতীশ কুমারদের নখদর্পণে। ২০২০ সালে, কোভিডের জেরে মাত্র ৩০ লক্ষ পরিযায়ী ব্যালট বাক্সের টানে দেহাতমুখী হন। সেই সংখ্যাটাও বিভিন্ন কেন্দ্রে নির্বাচনি লড়াই হাড্ডাহাড্ডি করে ছেড়েছিল। রাজ্যের রাজা গড়ার পাঁচসালা খেলায় এবারও বিশেষজ্ঞরা তেমনই কাহিনীর আঁচ পাচ্ছেন।
পরিযায়ীদের দাবিদাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা খতিয়ে দেখলে পাল্লা কখনও নীতীশের কোলে ঝুঁকছে কখনও তেজস্বীর। পরিযায়ীদের অধিকাংশ ১৮ থেকে ৩৫-এর তরুণ। ঘরে ফেরার তাগিদে তাঁদের পেশার চাহিদা ঘোরতর এবং ভালোবাসার মানুষজন, পরিবেশ-প্রতিবেশ ছেড়ে দূরদেশে পাড়ি দিতে হয়েছে বলে বিহারে কর্মহীনতা নিয়ে, বলা বাহুল্য, তাঁরা হতাশ। আর, রাজ্যে এই কাজের অভাবটাই গদির স্বপ্ন বুনতে থাকা বিরোধী নেতা তেজস্বীর অস্ত্র। অন্যদিকে নীতীশের ভরসা, পরিযায়ী মহিলা ও পরিবার, যারা এনডিএ-র জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির পক্ষে রায় দিতে পারে।
চলতি বছরের অগাস্টে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ সংস্থা ‘সি-ভোটার’-এর করা জনমত সমীক্ষা আভাস দিয়েছে, এনডিএ পাবে ৪২ থেকে ৪৮ শতাংশ ভোট। ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের ঝুলিতে আসবে ৩৭ থেকে ৪১ শতাংশ এবং প্রশান্ত কিশোরের ‘জন সূরয’ পাবে ১১ থেকে ১২ শতাংশ ভোট। পরিযায়ীরা ২০ থেকে ৩০টি আসনের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে, বিশেষ করে মাধেপুরা ও পূর্ণিয়ার মতো পরিযায়ী অধ্যুষিত জেলায়।
পরিযায়ী ভোটের প্রভাব রাতকে দিন করতে পারে, দিনকে রাত। স্বভাবিকভাবেই এই তথ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যম বা বিশেষজ্ঞদের অনেক আগে থেকে মাথা ঘামাচ্ছেন তাঁরাই, ঘরে যাঁদের আগুন লাগতে পারে। দীর্ঘ পাঁচ বছর গদি কেবল স্বপ্ন হয়েই থেকে যেতে পারে। বিহার বিধানসভা নির্বাচনে শরিক প্রত্যেকটি প্রথম সারির দল অতএব পরিযায়ীদের বুকে টানতে নিবিড় পরিকল্পনা নিয়ে ঝাঁপিয়েছে। যার সংগঠন যত গোছানো তাদের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সেটা সফল করার প্রচারাভিযানও ততটাই সুচারু। এবং এই পরিকল্পনা করতে গিয়ে যে আশঙ্কার কথা বিভিন্ন দল প্রাথমিকভাবে মাথায় রেখেছে, সেটা হল, পরিযায়ী-ব্যালটের ক্ষমতা আছে বিহারের চিরাচরিত জাতপাতনির্ভর ভোটের হিসেবনিকেশ তছনছ করে দেওয়ার।
সেই জুলাই মাসেই এনডিএ অর্থাৎ, বিজেপি-জেডি(ইউ) জোট ‘মাইগ্রান্ট ভোটার আউটরিচ’ প্ল্যান বা পরিযায়ী ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর বন্দোবস্ত করে ফেলে। দলের জাতীয় পর্যায়ের নেতা তরুণ চুঘ এবং দুষ্মন্ত গৌতমকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ১৫০ সদস্যের টাস্ক ফোর্স-এর মাধ্যমে তিন কোটি ভোটারকে দলে টানতে। সে প্রয়োজনে সমাজমাধ্যমের ও ফোনের অত্যন্ত সক্রিয় ব্যবহার শুরু হয়। শুরু হয় জনহিতকর কাজকর্ম এবং চাকরি থেকে শুরু করে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বিলি। শুরু হয় বিভিন্ন রাজ্য থেকে পরিযায়ীদের নিয়ে আসার প্রস্তুতি, এমনকি ছুটির বন্দোবস্ত করা।
আরজেডি-কংগ্রেসের জোটের পাল্লা ভারী করতে পরিযায়ীদের যন্ত্রণা, বঞ্চনা নিয়ে এবং তাঁদের জন্য পোস্টাল ব্যালট-বিধি সংস্কারের দাবিতে অগাস্টেই রাহুল গান্ধি ‘যাত্রা’ করেছিলেন। ক্ষমতায় এলে কর্মসংস্থানের বন্যা বইয়ে দেওয়ার দাবির পাশাপাশি তেজস্বী যাদব ২৬ লক্ষ পরিযায়ী ভোটারকে এসআইআর-এর রাস্তায় বাতিল করার অভিযোগে সওয়ার হয়েছেন। শপথ নিয়েছেন তাঁদের ভোটাধিকার ফেরানোর। অন্যদিকে প্রশান্ত কিশোর এনডিএ এবং ইন্ডিয়া-য় বীতশ্রদ্ধ শিক্ষিত পরিযায়ীদের তাঁর দলের লক্ষ্যবস্তু করেছেন। তাঁর অস্ত্র বিহারের দুর্নীতিমুক্তি এবং কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বিভিন্ন পক্ষের এত আদর, এত প্রতিশ্রুতিতেও চিঁড়ে ভেজা অতটা সহজ নাও হতে পারে। ভোটার লিস্টে পরিযায়ীদের নাম সুনিশ্চিত করা থেকে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁদের নিয়ে এসে বুথের লাইনে দাঁড় করানো, কাজটা প্রায় পাহাড়প্রমাণ। গোদের ওপর এসএইআর নামক বিষফোড়ার জ্বালা।
প্রণয় রায়ের মতো পোড়খাওয়া মস্তিষ্কও বলছেন, জাতপাতনির্ভর (যাদব-মুসলিম জোটের) ভোট বা মহিলাদের মতিগতির মতো পরিযায়ী তত্ত্বও এক অজানা তাস। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, পরিযায়ীদের ভোটের ৬০-৭০ শতাংশ জমা পড়লে মহিলা ও উচ্চবর্ণের ভোট যোগ করে এবং জন সূরয-এর কাছে যুব ভোট হারিয়ে এনডিএ-র আসন বেড়ে দাঁড়াবে ১১৯-১৩০। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১২২। উলটো দিকে, পরিযায়ীরা বুথমুখী না হলে বা এসআইআর-এর কোপ পড়লে লাভ হতে পারে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের। সেক্ষেত্রে এনডিএ কোনওমতে জিতবে। মোটের ওপর, পরিস্থিতির বিচারে বিহারে পরিযায়ী ভোট কেবল এক বড় নির্ণায়ক নয়, রাজ্যের অর্থনীতির সঙ্গে ভোটের অঙ্ক মেশানো অতি গুরুত্বপূর্ণ এক সমীকরণ। যে সমীকরণের গতিবিধি ১৪ নভেম্বরের আগে বোঝা বেশ জটিল।
(লেখক প্রাবন্ধিক)
