সবুজ উপনিবেশের বাবুয়ানায় ‘ইতি’

সবুজ উপনিবেশের বাবুয়ানায় ‘ইতি’

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


 

  • শুভঙ্কর চক্রবর্তী

ডুয়ার্স আসলে নৈসর্গের উপত্যকা। যেখানে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ শুধু ফসলের নাম নয়, একটি আস্ত ঔপনিবেশিক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। আজ থেকে দেড়শো বছর আগে ব্রিটিশ পুঁজি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর হাত ধরে উত্তরবঙ্গের এই প্রান্তে যখন চা শিল্পের গোড়াপত্তন হয়, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক দিগন্তই উন্মোচন করেনি, বরং একটি সূক্ষ্ম অথচ দৃঢ় শ্রেণি-কাঠামোও তৈরি করেছিল। এই কাঠামোর কেন্দ্রে ছিল ব্রিটিশ মালিক, আর ভিত্তিমূলে শোষিত শ্রমজীবী আদিবাসী ও নেপালি সমাজ। আর এদের মাঝের স্তরটিতেই জন্ম নিয়েছিল এক বিশেষ সামাজিক শ্রেণি- ‘বাগানিয়া বাবু’।

এই বাবুরা সরাসরি মালিক ছিলেন না। ছিলেন কেরানি, হিসাবরক্ষক বা ছোটখাটো ম্যানেজমেন্টের পদাধিকারী-অর্থাৎ, ব্রিটিশ সাহেবের প্রশাসনিক হাত। অবিভক্ত বাংলা থেকে আগত এই শিক্ষিত বাঙালি করণিক শ্রেণি অল্পবিস্তর ইংরেজি জ্ঞান ও বাংলামাধ্যমের শিক্ষার জোরে নিজেদের শ্রমজীবী সমাজ থেকে আলাদা করে নিয়েছিলেন।

প্রবীণদের স্মৃতিচারণে সেই রোমাঞ্চকর দিনের গল্প শোনা যায়, সেসময় সাহেবরা নাকি স্টেশনে স্টেশনে দালালের মতো অপেক্ষা করতেন এবং ট্রেন থেকে নামা অল্প শিক্ষিত বাঙালি তরুণদের ধরে এনে কেরানির পদে বসাতেন। ‘বাবু ধরার ইতিহাস’ সত্যিই যেন এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যান! কলবাবু, ফিটারবাবু, ওজনবাবু, ডাক্তারবাবু, মাস্টারবাবু, এমনকি বাগানের ছেলেমেয়েদের গান শেখানোর জন্য ‘গানবাবু’-পদাধিকারের এমন বৈচিত্র্যই ছিল এদের সামাজিক কর্তৃত্বের মূল চাবিকাঠি।

এই বাবুরাই ছিলেন ডুয়ার্সের ‘সবুজ উপনিবেশের’ সংস্কৃতির অঘোষিত মালিক। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ঘোচাতে এবং নিজেদের মধ্যবিত্তসুলভ মানসিকতাকে প্রতিষ্ঠা করতে তাঁরা অবসর বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন নাট্যচর্চা ও ক্লাব সংস্কৃতিকে।

১৯১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ওদলাবাড়িতে ‘মেবার পতন’ নাটকের মহড়া দিয়ে যে নাট্যচর্চার শতবর্ষের যাত্রা শুরু, বানারহাট, মালবাজার, গয়েরকাটার মতো জায়গায় তা একসময় কাঠের তৈরি আধুনিক মঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহের জন্ম দিয়েছিল। এই মঞ্চগুলি ছিল বাবু সমাজের স্থিতাবস্থার প্রতীক- যেখানে স্বদেশিয়ানা-আশ্রিত নাটক মঞ্চস্থ হত পূর্ববঙ্গীয় শিক্ষিত বাঙালি ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতায়। গয়েরকাটার কাঠের দোতলা গৃহে একদিকে ছিল বই ভরা আলমারি, অন্যদিকে শরীরচর্চা ও গানবাজনার সরঞ্জাম।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে  জলপাইগুড়ি শহরে নবজাগরণের যে ঢেউ লেগেছিল তা চা বাগানেও প্রসারিত হয়। বিভিন্ন বাগানের শিক্ষিত ম্যানেজার, বাবুদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে নানা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। রানিচেরা বাগানে তৈরি হয় ডামডিম ফ্রেন্ডস ক্লাব। বই পড়া, খবরের কাগজ পড়া, নাটক, থিয়েটারের আয়োজন করা প্রভৃতি ছিল এই ক্লাবের উদ্দেশ্য। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাগানের অন্যান্য কর্মচারীরা ক্লাবে আসতেন ও রাতে ক্লাবেই খাওয়াদাওয়া করতেন।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে কাঁঠালগুড়ি বাগানের কর্মচারীরা দুর্গেশনন্দিনী নাটক মঞ্চস্থ করে উচ্চ প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। এই বাগানের গুদামবাবু ভূপেন বক্সী থিয়েটারের মান উন্নত করার জন্য কলকাতার কলাকুশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। নিমতিঝোরা বাগানে এই উদ্দেশ্যে নির্মিত হয় রাজেন্দ্র স্মৃতি ভবন। ১৯৬১ সালে নিমতিঝোরা বাগানে কবিগুরুর জন্মশতবার্ষিকীতে মালিকপক্ষ রবি ঠাকুরের মূর্তির আবরণ উন্মোচন করে। সেই অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্র উপস্থিত ছিলেন। সেদিন বাগানের মেয়েরা মঞ্চস্থ করেছিলেন চিত্রাঙ্গদা নাটকটি। বাগানের সিনেমা হলটির উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাজ্যপাল হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। শিলিগুড়ি শহরের মিত্র সম্মিলনীতে তরাইয়ের পাশাপাশি ডুয়ার্সের নাট্যমোদী বাবুরা নিয়মিত ভিড় জমাতেন। এই সংস্কৃতি ছিল তাঁদের কাছে দেশের বাড়িতে ফেলে আসা সম্মানটুকু ফিরে পাওয়ার এক গৌরবের ক্ষেত্র।

তবে বাবু সংস্কৃতি ছিল মূলত একটি ঘেরাটোপ, যা শ্রমজীবী সমাজের বঞ্চনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক উচ্চতা প্রমাণ করত। বাবুদের ক্লাবগুলি ছিল সামাজিক আড্ডার অন্যতম কেন্দ্র। সেখানে রাজনৈতিক আঁচও থাকত। তাস, ব্যাডমিন্টন বা ভলিবল খেলা চলত। ফুটবল প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে বাগানে অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা হত। চ্যাম্পিয়ন দলকে নিয়ে চলত কয়েকদিনের উৎসব। সাহেবদের ক্রিসমাস উদযাপনেও বাঙালি বাবুরা কেক কেটে, ক্রিসমাস ট্রি সাজিয়ে সাহেবিয়ানা দেখাতেন।

আবার বিন্নাগুড়ির ‘ওয়ার্কার্স থিয়েটার’ বা কালচিনির ‘মজদুর মৈত্রী সংঘ’ প্রমাণ করেছিল, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রটি কেবল অবসর বিনোদন নয়, শ্রেণি সংগ্রামের একটি মঞ্চও হতে পারে। বিন্নাগুড়ির ‘সুরঙ্গ মে আগ’ নাটকটি সেই সময় হয়ে উঠেছিল শ্রমিক শ্রেণির বহুভাষিক ঐক্য ও বঞ্চনার প্রতিবাদ।

তবে বিংশ শতাব্দীর শেষে, বিশেষত ২০০০ সালের পর ডুয়ার্সের চা শিল্পের অর্থনৈতিক পতন এই সাংস্কৃতিক কাঠামোকে সরাসরি আঘাত করে। একাধিক কর্পোরেট মালিকদের সীমাহীন দায়হীনতা এবং মুনাফা লুটের ফলে একের পর এক চা বাগান বন্ধ, রুগ্ন বা হস্তান্তর হতে থাকে। এই অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল বাবু সমাজের সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে। কাঠের মঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহগুলি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বাবু সংস্কৃতিতে আপাতত ইতি টানাই যায়। এই বিলুপ্তি শুধু সাংস্কৃতিক অবক্ষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক পতনের এক করুণ দৃশ্যমান প্রতীক।

আজ ডুয়ার্সের সেই সবুজ উপনিবেশে বাবুদের বহু কোয়ার্টারে তালা ঝুলছে। অনেকে শহুরে ফ্ল্যাটে পাড়ি জমিয়েছেন। তাঁদের চাকরি জীবন কাটছে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে। অন্যদিকে, শ্রমিকদের চরম দুর্দশা পৌঁছেছে মৌলিক মানবিক অস্তিত্ব হারানোর পর্যায়ে। শ্রমিক মহল্লায় এখন আর মাদলের বোল ওঠে না। বাগানিয়া বাবুদের সাংস্কৃতিক শূন্যতার দখল নিয়েছে আধুনিক ‘ডিজে’ সংস্কৃতি।

পুঁজিবাদী ঔপনিবেশিক কাঠামোর অধীনে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাংস্কৃতিক স্থিতাবস্থা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে ডুয়ার্সের চা বাগানের বাবু সংস্কৃতি চোখে আঙুল দিয়ে তা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। চা শিল্প এবং বাগান সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারে প্রযুক্তি, গবেষণা এবং সর্বাগ্রে শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে, শ্রমিক বা বাবুকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়াও জরুরি। একমাত্র সেই সংস্কৃতিই পারে ডুয়ার্সের বিচ্ছিন্নতা, বেদনা এবং নিঃসঙ্গতার সুরের বিপরীতে সংহতি ও চেতনার ভাষা ফিরিয়ে আনতে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *