অঞ্জন চক্রবর্তী
রাজ্যে নতুন ও প্রথম বিজেপি সরকারের কাজে সর্বস্তরের মানুষের বিপুল প্রত্যাশা। কারণ বাংলার মানুষ শুধু বিজেপিকে ভোট দেয়নি, ভোট দিয়েছে বিগত সরকারের বিরুদ্ধে জমা বিপুল জনরোষ থেকে। উত্তরবঙ্গ অবশ্য বিগত কয়েক বছর ধরেই বিজেপিমুখী হয়ে আছে। এবার তো ঝোলা উজাড় করে দিয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য মন্ত্রীসভায় উত্তরবঙ্গে এবারের প্রতিনিধিত্ব সর্বকালীন রেকর্ড (Funds Evaluation)।
ফলে স্বপন দাশগুপ্তের অন্তর্বর্তী বাজেট (আগামী ৯ মাসের) নতুন সরকারের কাছে ছিল কঠিন পরীক্ষা। বিপুল প্রত্যাশা এবং বিজেপির সংকল্পপত্রের বাস্তবায়ন, বাংলাকে নতুন দিশা দেখানো এবং ডাবল ইঞ্জিন সরকারের কার্যকারিতা প্রমাণ করার তাগিদও ছিল। অর্থমন্ত্রীর হাতে মেরেকেটে ১৫ দিন ছিল এই প্রত্যাশা মেটানোর জাদুকাঠি ঘোরানোর।
অন্তর্বর্তী বাজেটকে নতুন উন্নয়নের দিকে নিদের্শিকার আলোকে দেখাটাই সংগত। অর্থমন্ত্রী সে পথে খুব কম সময়ে হেঁটেছেন, যা প্রশংসনীয়। প্রথমে মৌলিক পরিবর্তন এবং সংকল্পপত্রের নিরিখে দেখে নেওয়া যাক এই বাজেট। প্রথম বড় পরিবর্তন এতদিনের শতাধিক শ্রী যুক্ত বাজেটের। এছাড়া কেন্দ্র ও রাজ্যের সংঘাতের অবসান। এযাবৎকাল বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলো হয় চালু করা হয়নি বা চালু হলেও তার Compliance হয়নি। ফলে থমকে বা আটকে ছিল।
তৃণমূল স্তর অবধি দুর্নীতির যে প্রাতিষ্ঠানিককরণ এবং বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছিল, তাতে লাগাম টানার সার্বিক চেষ্টা আছে এই বাজেটে। কাটমানি ও সিন্ডিকেটরাজমুক্ত পশ্চিমবঙ্গের দিশা নির্দেশ রয়েছে যাতে ব্যয়ের পরিমাণ কমবে বিশেষত প্রকল্পভিত্তিক সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কাজে। এখন অন্নপূর্ণা যোজনা, আয়ুষ্মান ভারত, প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি কার্যকরী হবে। যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথভাবে খরচ করে প্রকল্পগুলি উপভোক্তাদের কাছেই পৌঁছে দেবে।
এই ঘটনা রাজস্ব সাশ্রয়ে সাহায্য করবে এবং ডাবল ইঞ্জিনের সুবিধা ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গ পাবে ধরে নেওয়া যায়। মূলত কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা পরিকাঠামো, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও বিভিন্ন জেলা বা অঞ্চলের মধ্যে আর্থিক বিকাশের তারতম্যকে বাস্তবসম্মতভাবে সমাধান করার প্রচেষ্টা আছে বাজেটে।
সরকারি কর্মীরা অনেকটা বেশি (৩৮%) ডিএ পাবেন। তাঁদের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জমি, বাড়ি, ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বাড়বে স্বাভাবিকভাবে। ঋণের হার যদি ব্যাংক কমায়, তার সুফল অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়বে। কৃষিক্ষেত্রে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের অনেকটা স্বস্তি দেওয়া হয়েছে এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা যাতে না কমে তার দিকে নজর দেওয়া আছে। বাংলায় প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষির হার প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং গড় কৃষিজমির পরিমাণ ০.৬৪ হেক্টর।
চাষের জলের উৎস ও সরবরাহ নিয়ে ভাবনাচিন্তা, সহায়কমূল্য সম্পর্কে নিশ্চিন্ত করা, নদী ও জলাশয়কে যুক্ত করা ও তিস্তা জলপ্রকল্পকে নিয়ে ভাবনা পশ্চিমবঙ্গের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির অনুপন্থী হবে বলে ধারণা করা যায়। যদিও ভবিষ্যতে এনিয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার প্রয়োজনীয়তা থেকে যাচ্ছে।
নতুন শিক্ষকপদ (৫০,০০০), নতুন কিছু বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তরবঙ্গে আইআইটি, মেধাবী ছাত্রদের বাড়তি সাহায্য ইত্যাদি শিক্ষাক্ষেত্রে সদর্থক তো বটেই। তবে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি এবং কুশলতা নির্ভর শিক্ষা, যা পশ্চিমবঙ্গে আদতেই হয়নি, তার অঞ্চলভিত্তিক প্রয়োগ নিয়ে প্রচুর ভাবনচিন্তার অবকাশ থাকছে। উত্তরবঙ্গে এইমস, সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল, নতুন মেডিকেল কলেজ ইত্যাদিও বাজেটের সদর্থক ভাবনা। কিন্তু প্রাথমিক থেকে সমস্ত স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নতুন দিশার প্রয়োজন। শুধু পাবলিক-প্রাইভেট যোগস্থাপন পর্যাপ্ত নয়।
পর্যটন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিয়ে কিছু ঘোষণা থাকলেও উত্তরবঙ্গ সহ গোটা বাংলার জন্য একটি পর্যটন পরিকল্পনা ভীষণ জরুরি একটি ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ হতে পারে। ছোট ও জেলাভিত্তিক বিমানবন্দর তৈরি এবং তার কার্যকারিতা অবশ্যই ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনকে উৎসাহ দেবে বলে ধরা যায়। প্রত্যেক জেলার নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক উৎপাদন, স্টার্ট-আপ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ জেলা ও গ্রামভিক্তিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এনিয়ে আরও বিস্তারিত ভাবনার অবকাশ থাকছে।
সর্বস্তরের মহিলাদের ফ্রি-তে পরিবহণের বিষয়টি বাজেটে থাকলেও নতুনভাবে ভাবা দরকার। কারণ, এতে সরকারি পরিবহণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উত্তরবঙ্গের চা বাগানকেন্দ্রিক অর্থনীতি, ক্ষুদ্র চা চাষিদের নিয়ে কোনও পরিকল্পনার উল্লেখ নেই বাজেটে। অথচ যা উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, তরাই, ডুয়ার্সের জন্য আশু প্রয়োজন।
যদিও ২০ দিনে এত কিছু আশা করা যুক্তিসম্মত নয়। তবে নিশ্চয়ই নগরোন্নয়ন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক সার উৎপাদন, ডাম্পিং গ্রাউন্ডমুক্ত ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট, রাস্তাঘাটের সঙ্গে গাছের পুনর্বাসন ইত্যাদি ভবিষ্যতে ভাবা হবে। মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা দুটোর মেলবন্ধন নতুন সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
(লেখক অর্থনীতির অধ্যাপক, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়)

