বিরোধী অনৈক্য, উৎসবের মরশুমের অপেক্ষা পদ্মে

শিক্ষা
Spread the love


রূপায়ণ ভট্টাচার্য

রাজধানীর রাজপথে গত তিনদিন ধরে যে সাইক্লোন বয়ে যাচ্ছে, জনসমুদ্রে জেগেছে জোয়ার, তার অভিঘাত আটকে নেই শুধু দিল্লির সীমানায়। প্রতিবাদের সাইক্লোন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে।

একসময় যে কথাটা ফিশফিশ করে বলত লোকে, এখন সেটাই শোনা যাচ্ছে প্রকাশ্য রাস্তায়। দ্বিধাহীন, দ্বন্দ্বহীন। হকারদের মুখে, অটো ড্রাইভারদের মুখে, পথচারীর মুখে, ব্যবসায়ীর মুখে। বিজেপি ভোট জিতছে নির্বাচন কমিশনের সাহায্যে চুরি করে। ‘ভোট চোর’ শব্দটা অনেক দেওয়ালে সাদা চুনকাম করে মোছার চেষ্টায় দিল্লির পুলিশ। লাভ হচ্ছে কই ভাই?

ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের ভয়। সেই ভয়টাই যদি ভেঙে যায়, তা হলে সরকারের হাতে আর কতটা শক্তি অবশিষ্ট রইল? রাজধানীর তিনদিনের ঘটনাবলি সেই প্রশ্নটাই সামনে এনে দিয়েছে। রাজপথে যাতে বিক্ষোভকারীরা শুয়ে পড়তে না পারে, সেইজন্য কর্পোরেশনের কর্মীরা ময়লা গাড়িতে এনে ঝকঝকে রাজপথে ফেলে দিচ্ছে। ভাবা যায়? কার মস্তিষ্কপ্রসূত এটা! যন্তরমন্তরও বন্ধ।

পশ্চিমবঙ্গই আপাতত একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে আছে গোটা দেশে। তরঙ্গহীন, প্রতিবাদহীন। বাকি সব রাজ্যে ‘ভোট চোর’ শব্দটা মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে গেঁথে গিয়েছে। মোদি সরকার যে নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে ভোট চুরি করতে অভ্যস্ত, সেই অভিযোগ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। রাজধানীর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেই সবাই সমস্বরে বলছেন তা। সেখানে রাস্তাঘাটে যেভাবে সবাই প্রকাশ্যে ভোট চুরির কথা বলছেন, তাতে বোঝা যায়, আগের মতো ভয় উধাও চারদিক থেকে।

ভিপি সিং যখন রাজীব গান্ধি সম্পর্কে আওয়াজ তুলেছিলেন, ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধি চোর হ্যায়’, তখনও হয়তো এতটা সাড়া ফেলতে পারেননি তিনি। ইতিহাস বলে, পরবর্তীতে ভিপি নিজে সোনিয়ার কাছে গিয়ে বলে এসেছিলেন, ভুল বলেছিলাম। তবে এবার জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে সেই রকম বলার কোনও কারণ দেখছেন না প্রতিবাদীরা। ভবিষ্যতে তাঁর ভাবমূর্তি পালটানোর সম্ভাবনা নেই কোনও।

বিমানের মধ্যে পুলিশ ঢুকিয়ে প্রতিবাদ হওয়ার আগেই প্রতিবাদীদের গ্রেপ্তার করে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। গণতন্ত্রের পক্ষে এমন লজ্জার ছবি জরুরি অবস্থাও দেখেনি। ওই সময় প্লেনের ভিতর চলে গিয়েছিল সরকারি ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের ক্যামেরাও। কী অবিশ্বাস্য! কী লজ্জার! নেতাদের পাশাপাশি রাস্তা থেকে সাংবাদিকদের পর্যন্ত গ্রেপ্তার করে নেওয়া হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, সরকার খুব কড়া মনোভাব নিয়েছে এখানে। বাস্তব বলছে, দেশজুড়ে বিক্ষোভের মাঝে মোদি এবং তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একেবারে চুপ। তাঁদের জোটের অন্য নেতারাও চুপ। বরং চিরাগ পাসোয়ানের মুখে অন্য কথা। এই নীরবতা কি কৌশল, না অস্বস্তি? প্রশ্নটা ক্রমশ বড় হচ্ছে।

যে দুটোকে ইস্যু করে বিজেপি পরের পর দেশে নির্বাচন জিতেছে, সেই দুটো ইস্যুই বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজ করছে না। সম্পূর্ণ আড়ালে চলে গিয়েছে। এক, হিন্দু-মুসলমান বিভেদ তৈরি করে ঘৃণার বাতাবরণ সৃষ্টি। দুই, মন্দির ইস্যু। রাম মন্দিরে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগের পর এবার নতুন মন্দির বানানো নিয়ে প্রশ্ন তোলাও বিপজ্জনক। সেখানেও চোর চোর স্লোগান উঠতে পারে। ধর্মের আবেগ দিয়ে, পাকিস্তানকে গালাগাল দিয়ে মানুষের দৈনন্দিন ক্ষোভ কতদিন চাপা রাখা সম্ভব, সেই পরীক্ষার মুখেই এখন শাসকদল।

সন্দেহ নেই, বিজেপি এখন শুধু ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচের খেলায় নিমগ্ন। তারা গভীরভাবে লক্ষ করবে, বিরোধীদের ইন্ডিয়া মঞ্চ কতদিন টেকে। রাহুল গান্ধি যতই মিছিলের একদিকে নেহা, অন্যদিকে প্রিয়াংকাকে নিয়ে হাঁটুন না কেন, ইন্ডিয়া মঞ্চ সব সময়ই নড়বড়ে। জনস্রোতে ভাসতে ভাসতে যাচ্ছিল তাদের বাস। যেভাবে বিশ্বকাপ জেতার পর স্পেন বা আর্জেন্টিনার টিমবাস যায়। অবাক লাগবে, নীচ থেকে লাল পতাকা তুলে অখিলেশ যেভাবে বাসের ওপরে তা নকশাল নেত্রী নেহার হাতে তুলে দিলেন। এই ঐক্যের হাওয়াতেও অনেক কাঁটা ছড়ানো!

জোটসঙ্গী হিসেবে মমতা কখনও ভরসা করার মতো নন। এখন চরম বিপদে, তাই রাহুল-সোনিয়ার পাশে। একটু অক্সিজেন পেলেই আবার কী করবেন, দেবতারাও জানেন না।

অখিলেশও তাই। উত্তরপ্রদেশে যোগীরাজ টলমল, তবু কংগ্রেস-সমাজবাদী জোট জমাট করতে পারেনি। সবচেয়ে বাগড়া দেবেন স্থানীয় নেতারা, নিজস্ব স্বার্থে। একই রকম পরিস্থিতিতে সিপিএমের বাংলার নেতারাও। এ বছরেও তাঁরা একটার বেশি আসন পাননি, তবু মুখে অনেক বড় বড় কথা। জাতীয় রাজনীতির তত্ত্বকথা বাংলায় খাটতে দিতে নারাজ। সিপিএমের অন্য রাজ্যের নেতারা যখন দিল্লির রাজপথে বিক্ষোভে অনড়, তাতে বাংলার খুব কম মুখই ছিল। তাঁরা এখনও মমতাকে আটকানোর কথা নিয়ে পড়ে আছেন, মোদিকে নিয়ে ভাবেন না। মমতা-বধেই তাঁদের যত আনন্দ। এই পরিস্থিতিগুলোই বিজেপিকে ফায়দা তুলতে দেবে।
বাংলায় বেশ কিছু সাহিত্যিক এখন প্রকাশ্যেই বিজেপির হয়ে প্রচার শুরু করেছেন। তাঁদের লক্ষ্য, আগের জমানায় সুবোধ সরকার, জয় গোস্বামীরা যেমন বিভিন্ন সরকারি পদে থাকতেন, সেই পদগুলোতে বসা। বইমেলায় যেমন আরএসএসের ঘনিষ্ঠ লোকেরা কমিটির মাথায় সটান বসে গিয়েছেন ইতিমধ্যেই। এঁদের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিজেপি এখন দেশে এই তুমুল ঝড়ের পিছনে এলন মাস্কের জুজু দেখাতে চাইছে। মাস্কই নাকি ককরোচ পার্টির পিছনে অর্থ ঢালছেন। অর্থাৎ প্রতিবাদের রাজনৈতিক জবাব দেওয়ার বদলে প্রতিবাদের পিছনে বিদেশি ষড়যন্ত্র খোঁজার পুরোনো কৌশল।

দুটো ঘটনা এখানে বলা দরকার। এক, আমেরিকায় গিয়ে মোদি মাস্কের সঙ্গে ওয়াশিংটনে ব্লেয়ার হাউসে দেখা করেন গত বছর ফেব্রুয়ারিতে। মাস্কের বাচ্চাদের জন্য তিনি তিনটি বইও নিয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, আরকে নারায়ণ আর বিষ্ণু শর্মার পঞ্চতন্ত্র।

দুই, আদানি-আম্বানির এখন ভালোই লেগেছে। আম্বানিরা মনে করছেন, মোদি অ্যান্ড কোম্পানি আদানিকে বাড়তি সুবিধে দিচ্ছে অনেক। নয়াদিল্লির রাজপথে বিক্ষোভ সংক্রান্ত খবরে হঠাৎ আম্বানির চ্যানেল, সাইটগুলো নিরপেক্ষ হয়ে উঠেছে। আদানির সংবাদমাধ্যমের মতো আর নির্লজ্জভাবে সরকারের পাশে দাঁড়ায়নি। এই অবস্থানগত ফারাকও রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটা অন্য জায়গায়। এতদিন বিরোধীরা অভিযোগ করতেন, সরকার উত্তর দিত। এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে অভিযোগের চেয়ে সরকারের নীরবতাই বেশি আলোচিত হচ্ছে। রাষ্ট্রক্ষমতা দিয়ে মিছিল আটকানো যায়, প্রতিবাদীকে আটক করা যায়, এমনকি সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরাকেও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যায়। কিন্তু মানুষের মনে একবার সন্দেহ ঢুকে গেলে তাকে গ্রেপ্তার করার কোনও আইন নেই।

দিল্লির তিনদিনের প্রতিবাদ তাই শুধু তিনদিনের ঘটনা নয়। এটা হয়তো দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের শুরু। বিজেপি অপেক্ষা করছে বিরোধীদের ভাঙনের। অপেক্ষা করছে উৎসবের মরশুমের, যেখানে প্রতিবাদ থামতে বাধ্য। বিরোধীরা অপেক্ষা করছেন মানুষের আর এনডিএ জোট শরিকদের ক্ষোভ আরও বাড়ার।

এবং পশ্চিমবঙ্গ? সে এখনও নিজের ছোট ছোট রাজনৈতিক হিসেবের মধ্যে বন্দি, পিছিয়ে পড়া রাজ্য। গোটা দেশে যখন ভোট চুরি নিয়ে ঢেউ উঠছে, তখন বাংলার বিরোধী নেতারা ব্যস্ত কে কাকে হারাবেন, সেই অঙ্ক কষতে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস হল, কখনো-কখনো ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েও মানুষ বুঝতে পারে না, চারপাশে কত কিছু বদলে যাচ্ছে। বাংলার রাজনীতি কি আবার সেই ভুলটাই করতে চলেছে?



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *