মৈনাক ভট্টাচার্য
রকের আড্ডায় এই মুহূর্তে নীতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’ কিংবা ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ যতটা আলোচনায়, তার চেয়েও বেশি চর্চিত হয়ে উঠেছে ‘ই-২০’ বা ২০ শতাংশ ইথানলমিশ্রিত পেট্রোল। ‘ফোর-টোয়েন্টি’, ‘জি-টোয়েন্টি’ কিংবা ‘টি-টোয়েন্টি’র সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে ‘ই-টোয়েন্টি’। যাঁরা এতদিন ইথানল কী, তা নিয়েও বিশেষ ভাবেননি, তাঁরাও এখন এর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। এর কারণ কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়ামমন্ত্রকের নতুন সিদ্ধান্ত। চলতি অর্থবর্ষ থেকে সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ২০ শতাংশ ইথানল এবং ন্যূনতম ‘রিসার্চ অক্টেন নম্বর’ (আরওএন) ৯৫ সহ পেট্রোল বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকারের দাবি, ২০১৩-’১৪ অর্থবর্ষে পেট্রোলে ইথানলের পরিমাণ ছিল মাত্র ১.৫৩ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে ২০ শতাংশ হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে তেল আমদানির ক্ষেত্রে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে, কৃষকদের আয় বেড়েছে প্রায় ১.৬৬ লক্ষ কোটি টাকা এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন কমেছে ৯৫২ লক্ষ টন। এই সাফল্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে আরও বেশি ইথানল সমৃদ্ধ জ্বালানি, এমনকি E85 চালুর দিকেও সরকার এগোতে চাইছে। তবে এই পরিসংখ্যান সরকারকে যতটা আশ্বস্ত করছে, গাড়ির ব্যবহারকারীদের একাংশকে ততটা নিশ্চিন্ত করতে পারেনি। তাঁদের মূল প্রশ্ন, ইথানলমিশ্রিত জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে গাড়ির ইঞ্জিন কতটা নিরাপদ থাকবে।
সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া আপাতত উপায় নেই। কিন্তু মেনে নিলেই যে সকলের সংশয় দূর হবে, এমনটাও নয়। সেই কারণেই গাড়ির মালিকদের একাংশ ‘ই-২০ জনতা পার্টি’ নামে একটি ডিজিটাল নাগরিক মঞ্চ তৈরি করেছে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে দিল্লির যন্তরমন্তরে ‘হামারি গাড়ি, হামারা অধিকার’ মঞ্চের ব্যানারে তাঁরা একত্রিত হয়ে সরকারের কাছে নীতিটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য স্পষ্ট, ইথানলমিশ্রিত জ্বালানির বিরোধিতা নয়, কিন্তু পর্যাপ্ত বিকল্পের ব্যবস্থা ছাড়াই E20 বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উপভোক্তার নিজের পছন্দমতো জ্বালানি বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।
এই বিতর্কে রাজনৈতিক বিরোধীরা কেন্দ্রীয় পরিবহণমন্ত্রী নীতিন গড়করিকেও কাঠগড়ায় তুলেছেন। কারণ, তাঁর পরিবারের সঙ্গে ইথানল-সংক্রান্ত ব্যবসার যোগ রয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এই যুক্তি সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য নয়। পেট্রোলের সঙ্গে মিশ্রণের বাইরেও ইথানল বা ইথাইল অ্যালকোহল জীবাণুনাশক, জ্বালানি, বিভিন্ন কাশির সিরাপ, টনিক ও তরল ওষুধে দ্রাবক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাসায়নিক শিল্প, সুগন্ধি, প্রসাধনী, রং, বার্নিশ, কালি, সাবান, আঠা এবং গবেষণাগারের নানা কাজেও ইথানলের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। ফলে কেবল পেট্রোলের সঙ্গে এর সংযোগ থেকেই ইথানলের সামগ্রিক ব্যবহারকে বিচার করা যায় না।
একজন মানুষ কোনওভাবেই সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে পারেন না। তাই তাঁকে নির্ভর করতে হয় প্রচার, তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপর। কিন্তু ই-২০ জ্বালানিকে ঘিরে সাধারণ মানুষ একেবারেই বিপরীতধর্মী বার্তার মুখোমুখি। একদিকে সরকারি প্রচারে বলা হচ্ছে, ইথানলমিশ্রিত জ্বালানিতে গাড়ির কোনও ক্ষতি হয় না, মাইলেজেরও উল্লেখযোগ্য হেরফের হয় না। ‘ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন’-ও দাবি করছে, এই জ্বালানি সম্পূর্ণ নিরাপদ। অন্যদিকে, পরিবহণ ও পেট্রোলিয়ামমন্ত্রকের বক্তব্যেই স্বীকার করা হয়েছে, ই-২০ ব্যবহারে গাড়ির ধরন অনুযায়ী মাইলেজ কিছুটা কমতে পারে। এই পরস্পরবিরোধী বার্তাই সাধারণ ভোক্তার বিভ্রান্তির প্রধান কারণ।
এই প্রসঙ্গে একটি টুথপেস্ট প্রস্তুতকারী সংস্থার বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ে। এক সময় তারা চারকোল দিয়ে দাঁত মাজাকে ক্ষতিকর বলে প্রচার করত। পরে বাজারের চাহিদা বদলাতেই সেই সংস্থাই চারকোলযুক্ত টুথপেস্টের উপকারিতা তুলে ধরতে শুরু করে। বাজার অর্থনীতিতে এ ধরনের পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। ব্যক্তিগত মালিকানা, অবাধ প্রতিযোগিতা, মুনাফার আকাঙ্ক্ষা এবং বিপণনের কৌশল মিলিয়ে প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি প্রায়ই নিজেদের সুবিধামতো প্রচার চালায়। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃত তথ্য বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ই-২০ বিতর্কেও সেই বিভ্রান্তির ছাপ স্পষ্ট। অনেকের অবস্থাই যেন অন্ধের হস্তীদর্শনের মতো।
ইথানল আখ, ভুট্টা ও ধানের মতো বায়োমাস থেকে উৎপাদিত হয়। সেই কারণেই আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের উদ্দেশ্যে পেট্রোলের সঙ্গে এটি মেশানো হচ্ছে। কিন্তু ইথানলের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হল, এটি সহজেই জল আকর্ষণ করে এবং ইঞ্জিনে কার্বনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন গাড়ি ব্যবহার না হলে ট্যাংকে আর্দ্রতা জমার সম্ভাবনা বাড়ে। কয়েকটি তেল বিপণন সংস্থাও এই বিষয়ে ব্যবহারকারীদের সতর্ক করেছে।
অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (এআরএআই)-র পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যেসব গাড়ি মূলত E10-উপযোগী, সেগুলিতে দীর্ঘদিন E20 ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে ফুয়েল সিস্টেমের রাবারের কিছু অংশ, যেমন হোস, গ্যাসকেট, সিল এবং ও-রিং প্রভাবিত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এক্সহস্ট ভালভে তাপজনিত ও যান্ত্রিক ত্রুটির সম্ভাবনাও উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, E10-এর তুলনায় E20 ব্যবহারে জ্বালানির খরচ গাড়ি ভেদে প্রায় ২ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সম্প্রতি কেন্দ্রও স্বীকার করেছে, ২০১৬ সালের আগে তৈরি কিছু বিএস-৩ গাড়ির রাবারের অংশ ও গ্যাসকেটে এর প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, ইথানল প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির বক্তব্য, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ইথানল পাতন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। এতে কোনও অবশিষ্ট চিনি থাকে না। প্রয়োজনীয় ডিন্যাচারেন্ট মেশানো থাকে এবং সাধারণ পেট্রোলের তুলনায় এটি কম বাষ্প উৎপন্ন করে। তবে ইথানল সহজেই জল টেনে নেয় বলেই দীর্ঘদিন গাড়ি না চালালে কোল্ড স্টার্ট, ট্যাংকে মরচে বা আর্দ্রতাজনিত সমস্যার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানেই মধ্যবিত্ত গাড়ির মালিকদের বাস্তব সমস্যার কথা সামনে আসে। ভারতের বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত পেট্রোলচালিত গাড়ির মালিক চাকরিজীবী বা পেনশনভোগী। তাঁদের অনেকেই প্রতিদিন গাড়ি ব্যবহার করেন না। সপ্তাহে এক-দু’দিন পরিবারকে নিয়ে বেরোনোই তাঁদের প্রধান ব্যবহার। গাড়ি চালাতে জানলেও যান্ত্রিক সমস্যার ক্ষেত্রে তাঁরা প্রায় সম্পূর্ণভাবে সার্ভিস সেন্টারের উপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘদিন গাড়ি না চালানোর কারণে কোল্ড স্টার্ট, ট্যাংকে আর্দ্রতা, অতিরিক্ত কার্বন নির্গমন বা মরচে পড়ার মতো সমস্যা তাঁদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা দিতে পারে।
ইথানলমিশ্রিত জ্বালানির উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি নাও থাকতে পারে। পরিবেশ রক্ষা, তেল আমদানি কমানো কিংবা কৃষকের আয় বৃদ্ধি, সবই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে যদি বহু মধ্যবিত্ত গাড়ির মালিকের ব্যবহারগত বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়, তবে সমস্যাও তৈরি হবে। তাই ইথানলমিশ্রিত পেট্রোলের পাশাপাশি ইথানলমুক্ত পেট্রোলেরও সীমিত পরিসরে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হলে উপভোক্তার পছন্দের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং অযথা সংশয়ও অনেকটাই দূর হবে। এটাই সম্ভবত এই বিতর্কের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান।
(লেখক শিলিগুড়ির ভাস্কর এবং বাস্তুকার)

