রূপায়ণ ভট্টাচার্য
রাত আটটার পর শপিং মল, দোকানপাট সব বন্ধ, বাংলাদেশজুড়ে এতটাই বিদ্যুৎ সংকট। এটা বাস্তব। আর জল্পনা, কবে ভারতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। হাসিনাকে নিয়ে কি কথা হবে? কী কথা?
এই বাস্তব এবং জল্পনার মাঝে বৃহস্পতিবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে আলোড়িত ঢাকা-চট্টগ্রাম-রংপুর-সিলেট। রাষ্ট্রপতি পদে শাসক বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন পার্টির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি প্রার্থী হওয়া মানে তিনি জিতছেনই। পার্টির মহাসচিব দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়া মানে তাঁকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক যখন লন্ডনে নির্বাসনে, খালেদা জিয়া যখন গুরুতর অসুস্থ ও কারাবন্দি, তখন বিএনপি পার্টি চালাতেন ফখরুলই। আওয়ামী লিগ সরকারের সময় তিনি ছয়বার জেলে যান। ৭৮ বছরে মন্ত্রী থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মানে তাঁর পক্ষে বড় পুরস্কার।
লেখার মতো ব্যাপার হল, তিনি যে সময় প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে রংপুরে বিক্ষোভ মিছিল নামিয়েছে জামায়াতে। ১১ জন জামায়াতে সাংসদ তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে প্রেস মিট করেছেন।
কী সেই বক্তব্য? দিন চারেক আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য ছিল, ‘রংপুরের লোকেরা, আমরা সব সময় পিছিয়ে পড়া। কেন পিছিয়ে পড়া? আমরা তো সঠিক জিনিসটাই বুঝি না। যখন বিএনপি গভর্নমেন্টে আসবে, তখন আপনারা করবেন জাতীয় পার্টি; যখন বিএনপি গভর্নমেন্টে আসবে, তখন আপনারা করবেন জামায়াতে। তাহলে কেমনে হবে? পাবেন কেমনে?’
ফখরুল আদতে রংপুরেরই লোক। রংপুর বিভাগের ঠাকুরগাঁওতে জন্ম। অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী একসময় পড়তেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যাঁকে জীবনের সেরা প্রাপ্তি বলেন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। বাবা প্রয়াত মির্জা রুহুল আমিন মুসলিম লিগের মন্ত্রীও ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এমএ ফখরুল ছাত্রজীবনে ছিলেন বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে উপ প্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হন। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় এলে বারী পদত্যাগ করেন, ফখরুল ফিরে যান অধ্যাপনার জগতে। পুরোদস্তুর বিএনপি রাজনীতিতে আশির দশকে।
সন্দেহ নেই, বিএনপি এর চেয়ে যোগ্য প্রার্থী পাবে না কাউকে। ভারতে মোদি আসার পর জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বহীন, নির্বিরোধী মানুষকে রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি করেছেন। বাংলাদেশের তারেক এখানে ব্যতিক্রম। ফখরুল রীতিমতো রাজনৈতিক লোক। ক’দিন আগে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘আমাদের একটা বিরোধী দল আছে। এই বিরোধী দল দুর্ভাগ্যক্রমে আবার সেই আগের মতোই ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। হাসিনা যে ভাষায় কথা বলত, এরাও ওই করতে দেব না, চলতে দেব না… ভাষাতেই কথা বলতেছে।’
একতরফা হতে চলা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বৃহত্তম মোচড়টা অবশ্য অন্য জায়গায়। বিরোধী জামায়েতে জোট নির্বাচনে হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধের কার্ড ফেলে দিয়েছে। যে জামায়েতে মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকারই করে না, তাদের নেতারা প্রার্থী করেছেন বিএনপির একসময়ের ঘরের লোক, জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও মুক্তিযুদ্ধের কর্নেল অলি আহমদকে। অলি জামায়েতে জোটের লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চেয়ারম্যান। জামায়াতে ইসলামি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য বারবার অভিযুক্ত। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রেখে একাত্তরের সমালোচনার কিছুটা জবাব দিতে চায়। এখনও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অসংখ্য মানুষ। জামায়াতে মানুষের মন বুঝতে পেরে আগের নীতি থেকে সরে আসছে, এটা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আর একটা দিক।
বাংলাদেশে আজও ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের লড়াই নিয়ে আলোচনা, তর্ক চলছেই। তার প্রভাব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও, যেখানে কে জিতবেন, সবাই জানেন। এত বছরের মধ্যে একবারই শুধু রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশে। ৩৫ বছর আগে। মানে এটা এই শতাব্দীর প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
বিএনপি সরকার যখন হাসিনাকে পুরোপুরি মুছে দিতে চাইছে, গণমাধ্যমে হাসিনার বক্তব্য প্রকাশ পর্যন্ত সরকারি ঘোষণায় বন্ধ, সে সময় একটা ভালো দিক অন্য জায়গায়। বিএনপি ক্ষমতায় বলেই মুক্তিযু্দ্ধের অস্তিত্ব মুছে ফেলা যায়নি।
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধের তুলনায় গণ-অভ্যুত্থানকে বড় করে দেখানো হয় এক চিত্রকর্মে। সেখানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী স্পষ্ট বলে দেন, ‘এগুলো হচ্ছে ছোটলোকি। সব সময় জনগণের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছেন বলেই তাঁরা এখন জুলাইকে ক্যাপিটাল করতে চাইছেন। আজকে প্রকারান্তরে একাত্তরকে ছোট করার জন্য, একাত্তরকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার জন্য বর্তমানে কোনও কোনও রাজনৈতিক দল প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। একাত্তর, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ও অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত জিয়াউর রহমানের নাম। তিনিই স্বাধীনতার ঘোষক। তাঁকে মুছে ফেলার গভীর চক্রান্তের প্রচেষ্টা চলছে।’
রাষ্ট্রপতি পদে জামায়াতে প্রার্থী অলির নামটা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আরও। রিজভী আবার ফখরুলের বদলে বিএনপি মহাসচিব হওয়ার দাবিদার। আর এক দাবিদার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
নির্বাচনের আগে চট্টগ্রামে অলি আহমেদকে নিয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দাবি তোলেন, ‘বাংলাদেশে স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রাম থেকেই হয়েছিল। আপনাদেরই এক সন্তান সবার আগে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘উই রিভল্ট’। তিনি এলডিপির সভাপতি কর্নেল অলি আহমেদ বীরবিক্রম।’
জামায়াতের আমিরের ওই বক্তব্যের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখায় বিএনপি। পরদিন কক্সবাজারে বিএনপি নেতা (বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল দেশের, তারা এখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা শুরু করেছে। সেই দলের আমির বলেছেন, এই দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা নাকি তৎকালীন মেজর জিয়া দেয় নাই। কর্নেল অলি সাহেব নাকি দিয়েছেন। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃতি করবে, এটাই স্বাভাবিক।’ ৩৫ বছর পরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ থেকে যাচ্ছে। থেকে যাচ্ছেন ৪৫ বছর আগে প্রয়াত জিয়াউর রহমানও।

