প্রযুক্তির আগ্রাসন ও বাণিজ্যিকীকরণের জোয়ারে ঐতিহ্যবাহী ফুটবল আবেগ আজ যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।
চিরঞ্জীব রায়
বিশ্বকাপের ভরা বাজারে একটা জিজ্ঞাসা খুব ভাবাচ্ছে। সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠে বাইশ খেলোয়াড়ের দাপাদাপির চেনা ছবিটা আজও একই রকম রয়ে গিয়েছে। বরং স্কিল উন্নত হয়েছে এবং জাঁকজমক বেড়েছে। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে আধুনিক ও উন্নত হয়েছে প্রশাসন থেকে শুরু করে বিপণন ব্যবস্থা। কিন্তু ফুটবল নিয়ে বিশ্ববাসীর বিশেষ করে ভারতীয়দের আবেগ ও উন্মাদনা একই আছে তো? যেমনটা ছিল সত্তর আশির দশকে টেলিভিশনের সামনে উপচে পড়া ভিড়ের দিনে বা ঘটির সামনে দিয়ে বিজয়ী বাঙালের হাতে ইলিশ ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুগারকোটেড প্রতিহিংসার যুগে? দিন প্রতিদিন আর্থসামাজিক পরিস্থিতি থেকে সংস্কৃতির ভোল বদলাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তি এবং মনোরঞ্জনের উপকরণ ও ধরন। সেই স্রোতের তোড়ে বদলে যাচ্ছে মানসিকতা এবং মানুষের সঙ্গে ফুটবলের আত্মীয়তার স্বরূপ। মাঠ থেকে মিডিয়াতে ফুটবলের অস্তিত্ব কমে আসছে। পাড়ার রকে ফুটবল নিয়ে চিৎকৃত আড্ডা স্তিমিত।
সমীক্ষা বলছে, পঞ্চান্ন ঊর্ধ্ব এবং আট থেকে পনেরো বছর বয়স্কদের উন্মাদনা প্রায় অটুট থাকলেও যাদের সম্পর্ক সবথেকে গাঢ় হওয়ার কথা ছিল সেই ষোলো থেকে চব্বিশের তরুণদের মধ্যে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় চিড় ধরেছে। এই ক্ষয়িষ্ণু প্রেমের মূল কারণ সামাজিক সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক এবং বিশেষ করে প্রযুক্তির জগতে আমূল বদল। এর মূল ইন্ধন হল জীবনে বিনোদনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির মাত্রাছাড়া দখলদারি। বর্তমান যুগের অতি ব্যস্ত জীবনযাপনে মানুষের ধৈর্যের এক চূড়ান্ত ঘাটতি চোখে পড়ছে। রোমাঞ্চিত হওয়ার অনুভূতিও ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। ফলে আগাগোড়া লাইভ ম্যাচ দেখার উৎসাহ থিতিয়ে যাচ্ছে। তরুণ সমাজ ডকুমেন্টারি ছোট ভিডিও এবং হাইলাইটস নির্ভর হয়ে পড়ছে। একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে জেন জেড প্রজন্মের ৬২ শতাংশই নিজেকে সময়োপযোগী রাখার তাগিদে সমাজমাধ্যমে খেলার খোঁজখবর রেখেই সন্তুষ্ট। ব্যস্ততার পাশাপাশি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং নিজস্ব পছন্দ অপছন্দের গুরুত্ব বেড়েছে। দলবেঁধে খেলা দেখার অবকাশে আবেগ উন্মাদনার শিখর ছুঁয়ে যাওয়া আজকের তরুণের রীতি নয়। ফলে ফুটবলপ্রেমে গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে।
মারাদোনা থেকে মালদিনি কিংবা জিদানের মতো কিংবদন্তিদের দ্যুতি না থাকলেও এখন রোনাল্ডো, মেসি, এমবাপের মতো নায়করা আছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের স্টাইল বদলে গেলেও দক্ষতার ঝংকার বেশ শোনা যায় কিন্তু দর্শকের মন বদলে গেছে। মন বদলে দিয়েছে গেমিং আর ই–স্পোর্টসের সম্মোহনী হাতছানি। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রথাগত খেলাধুলোর দর্শককুলে থাবা বসিয়ে ই–স্পোর্টসের পর্দায় এখন ৬২ কোটি দৃষ্টি আটকে থাকে। নব্য প্রজন্ম বাঁধাধরা সময়ে লাইভ ম্যাচ দেখার থেকে নিজের সময় ও পছন্দমতো ভিডিও গেমে ম্যাচ খেলতে বেশি পছন্দ করে। কারণ বদলে যাওয়া আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতা এবং জীবনযাপনের ধরন এদের খেলা দেখার পরোক্ষ এবং অলস বিনোদন নেওয়ার থেকে খেলায় জড়িয়ে গিয়ে তাৎক্ষণিক এবং প্রত্যক্ষ বিনোদনের ইন্ধন জুগিয়েছে। পরিণাম হল ফুটবলপ্রেমী ৪৬ শতাংশ তরুণ মাঠ বা টেলিভিশন নয় নিজের অবকাশ ও পছন্দ অনুযায়ী খেলা দেখার জন্য স্মার্টফোন বা ট্যাব ব্যবহার করে। অর্থাৎ খেলা যতটা না তার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে তার থেকে বেশি সে নিজের নিয়ন্ত্রণে খেলা উপভোগ করে। মাঝখান থেকে ফিকে হয়ে যায় ফুটবলের প্রতি বিশ শতাব্দীর সমর্পিত আবেগ।
একদিকে যুবসমাজের অর্থনৈতিক অবস্থান আরও অনিশ্চিত হয়েছে অন্যদিকে গ্যালারির টিকিট থেকে টেলিভিশনে খেলা দেখা রোজ রোজ আরও খরচসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই বিষয়টাও খানিক হলেও নিরন্তর ফুটবলপ্রেমের অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। তবে তার থেকেও প্রত্যক্ষ কারণ সাংস্কৃতিক রদবদল। ধীরে অথচ অনিবার্যভাবে এই প্রজন্মের মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্বের বা সত্তার পরিবর্তন ঘটছে। বদলে যাচ্ছে রুচি এবং পছন্দ অপছন্দের গতিপ্রকৃতি। আদি ফুটবলপ্রেমী বা চলতি ভাষায় বেবি বুমার্স জেন এক্স বা মিলেনিয়ালস প্রজন্মের সদস্যরা একটি ক্লাব বা একটি দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের বাইরে ভাবতে পারত না। আর্জেন্টিনা হোক বা ব্রাজিল অথবা বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদের জন্য গলা ফাটিয়েই গর্বিত হত। জেন জেড বা জেনারেশন আলফার ভক্তি অত প্রগাঢ় নয়। ক্লাবের সাফল্যের নিরিখে তাদের পছন্দ বদলে যায়। নস্টালজিয়া গড়ে ওঠেনি। অটল আনুগত্যের থেকে তাদের কাছে খেলোয়াড়ের স্টাইল ও স্কিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই নব্য দর্শক পরিস্থিতি ভেদে সমান আন্তরিকতায় মেসি থেকে ইয়ামাল অথবা রোনাল্ডো থেকে হাল্যান্ডের ভক্ত হতে পারে।
তবে ফুটবল ভক্তির প্রকৃতি পরিবর্তনে সবথেকে বড় কারণ সম্ভবত প্রযুক্তির দখলদারিতে সামাজিক অভ্যাসের বদল। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও সাধারণ দর্শকের কাছে খেলার মাঠের বাইরে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখা ছাড়া হাতের নাগালে তেমন কোনও সহজলভ্য বিনোদন প্রক্রিয়া মজুত ছিল না। না ছিল ঝুড়ি ঝুড়ি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সেখানে দুনিয়ার ভিজুয়াল বিনোদনের উপকরণ। ছিল না গেমিংয়ের মোহগ্রস্ততা অথবা ফেসবুক থেকে হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টা থেকে টুইটারে ঘড়ি ভুলে জুড়ে থাকা। অর্থাৎ এক তরুণের সামনে এখন ফুটবলের প্রতি একনিষ্ঠ মনোযোগ টুকরো টুকরো করে দেওয়ার হাজারো উপকরণ। তারই ফলশ্রুতি হল ভক্তির একমুখী স্রোতটা গায়েব হয়ে যাওয়া। তাই ফুটবল ভক্তির এই ভোল বদলকে ভক্তের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা অনুরাগ কমে যাওয়া নয় মানসিকতার রূপান্তর অথবা সামাজিক সাংস্কৃতিক বিবর্তন হিসেবে দেখা উচিত।
এই প্রজন্ম তাৎক্ষণিক এবং প্রত্যক্ষ বিনোদনে বিশ্বাসী। তাই সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোফায় এলিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখার থেকে কিবোর্ড ছুঁয়ে খেলার মধ্যে ঢুকে যেতে বেশি পছন্দ করে। সে প্রথা রীতি আনুগত্যের দাসত্ব পছন্দ করে না। তাই কোনও বিশেষ ক্লাবের প্রতি অন্ধত্ব তাঁকে ফুটবলের সঙ্গে জুড়ে রাখতে পারে না। ক্রিকেট থেকে শুরু করে ফুটবল সমেত আর সমস্ত জনপ্রিয় খেলার বাণিজ্যিকীকরণ সম্পূর্ণ হয়েছে। মুড়ে দেওয়া হয়েছে বিপণনের মোড়কে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সমর্থকও আর অটল ভক্ত নয়। সে-ও হয়ে গেছে ফুটবল নামক বিনোদনের গ্রাহক। গ্রাহকের মানসিকতায় নিঃশর্ত ভালোবাসা বা ভক্তি থাকে না। থাকে কতটা সময় অর্থ এবং মনোযোগ খরচ করলাম এবং বদলে কতটা বিনোদন পেলাম সেই সূক্ষ্ম হিসেবনিকেশ।
সত্তরের দশকে ফুটবলের জনপ্রিয়তা সম্বল করে মান্না দে-র সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল গানের মতো সৃষ্টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছিল। ময়দানের দুই মহারথীর লড়াই নিয়ে মোহনবাগানের মেয়ের মতো সিনেমা তৈরির পরিবেশ ও অবকাশ ছিল। বিকেল গড়ালেই বলে হাওয়া দিতে দলবেঁধে সাইকেলের দোকানে সিরিঞ্চি খুঁজতে যাওয়ার উৎসাহ ছিল। শহর থেকে গ্রামের একচিলতে সবুজে বলের অভাবে বাতাবি নিয়ে ছোটাছুটির উত্তেজনা ছিল। খেলাশেষে কাদা মেখে দলবেঁধে পুকুরে ঝাঁপানোর সম্মিলিত সুখ ছিল। সেই সুখগুলো ব্যস্ত নাগরিক জীবনের জাঁতাকলে পিষে গেছে। একলা সুখ খুঁজে ফিরতে অভ্যস্ত এই প্রজন্মকে ফুটবল আর সম্মিলিত করতে পারে না। কারণ ফুটবল আছে ফুটবলেই কিন্তু জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকা জীবনের আবর্তে তার ভূমিকা বদলে গেছে।
(লেখক প্রাবন্ধিক)

