বদলেছে শাসক, বদলায়নি রাজনীতি

শিক্ষা
Spread the love


(বীজপুরের ঘটনাকে সামনে রেখে বাংলার রাজনীতিতে হিংসা, ক্ষমতা ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির পাঠ)

জয়ন্ত চৌধুরী

ইতিহাসের প্রথম পুনরাবৃত্তি হল ট্র্যাজেডি। দ্বিতীয়বার ঘটলে তা প্রহসন। সেই অষ্টাদশ শতকের ফরাসি বিপ্লব ও পরবর্তী ঘটনাক্রমের তুলনামূলক মূল্যায়নের প্রেক্ষিতে তাঁর ‘দ্য এইটটিনথ ব্রুমেয়র অফ লুই বোনাপার্ট’ নিবন্ধে একথা উল্লেখ করেছিলেন। ২০১১ সাল বা ২০২৬ সালের মে মাস, কোনওটার সঙ্গেই ফরাসি বিপ্লবের ১৮ ফেব্রুয়ারি বা অষ্টাদশ ব্রুমেয়র বলে তুলনা বাতুলতার নামান্তর।

কিন্তু ইতিহাসের এমন প্যাঁচানো রসিকতা বঙ্গবাসীর অভিজ্ঞতায়  মার্কসের সেই অমোঘ উক্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে ভরা শ্রাবণ মধ্যাহ্নে, যখন বীজপুরে আক্রান্ত হন রাজ্যের সদ্য প্রাক্তন তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের দলের প্রাক্তন কর্মীর পুলিশ হেপাজতে রহস্যময় মৃত্যুর প্রেক্ষিতে তাঁর হালিশহর যাত্রা। মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে তৃণমূল নেত্রীর গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখানো হয়। পুরোপুরি তৃণমূলি স্টাইলেই। বিরোধী দলনেতা থাকাকালে শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপি রাজ্য সভাপতি থাকাকালীন দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার, সাংসদ খগেন মুর্মু, সর্বোপরি তৎকালীন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা, যেভাবে হেনস্তা হতেন ঠিক সেভাবেই রবিবারের বীজপুরে আক্রান্ত হন মমতা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দক্ষিণ কলকাতার এক পুজো উদ্বোধনে সায় দিলেও বস্তুত তাঁকে আসতে বাধা দেওয়া হয়।

গত দেড় দশকে এমন দৃষ্টান্ত অজস্র। পুলিশ প্রশাসন ও তৃণমূলের ভৈরব বাহিনীর যুগলবন্দির দৌরাত্ম্যে বিরোধী বাম-কংগ্রেস-বিজেপি এমনকি মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর পর্যন্ত রেহাই পায়নি। নেতারা লাঞ্ছিত, প্রাক্তন বিধায়ককে শারীরিক নিগ্রহ কিংবা মিছিল থেকে টেনে নিয়ে খুন এমন ঘটনা ঘটেছে। এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে। ‘গাঁজা কেস’, মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন বা এনডিপিএস চার্জ দিয়ে লক আপে পুরে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিকে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিতে থানার আইসি-কে দিয়ে হুমকি ফোন। পরের দিন কেঠো হাসি নিয়ে তৃণমূল ভবনে কিংবা কালীঘাট বা নবান্নে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেই ঘাসফুল পতাকা তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা বঙ্গবাসীর অভিজ্ঞতায় জলভাত। ২০১১ সাল থেকে গত বিধানসভা ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার আগে পর্যন্ত এটাই ছিল মা-মাটি-মানুষের সরকারের দস্তুর।

তাই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর উপর হওয়া হামলার ঘটনা যতটা তাঁর পক্ষে সহানুভূতির উদ্রেক করতে পারত তার চেয়ে ঢের বেশি পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে বিতর্কের ঝাঁঝ উসকে দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেত্রীর কাছে এটা ট্র্যাজেডি বটেই। মমতা আক্রান্ত হচ্ছেন, ২০১১ সালের পর তা অলীক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু মসনদ খোয়ানো মমতা প্রতিপক্ষের হামলার মুখে এমন চুপসে যাওয়া (যে ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল) বেশ বিসদৃশ ঠেকে। কিন্তু  ঢিলের বদলে পাটকেল কিংবা হিংসার বদলায় হিংসার আমদানি কোনও সংসদীয় গণতন্ত্র তো বটে সাধারণ সভ্যতার উপাদান হতে পারে না। ইতিহাসের শিক্ষা এটাই।

তাই সবে তিন মাস অতিক্রান্ত শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষে বীজপুরের ঘটনাবলি মোটেই ভালো বিজ্ঞাপন নয়। পালাবদলোত্তর পর্বে পশ্চিমবঙ্গের লগ্নিমুখী যে অভিযাত্রার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বলে বিজেপি দাবি করে, তার পক্ষেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ওপর হামলা সুস্থ রাজনৈতিক সমাজের লক্ষণ নয়। তিন দশকের প্রায় (যুক্তফ্রন্ট আমল বাদে) নিরবচ্ছিন্ন কংগ্রেস শাসন, চৌত্রিশ বছরের বাম তথা সিপিএম শাসন বাংলার মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। কাশীপুর-বরাহনগর থেকে জরুরি অবস্থা। নকশাল দমনে ভুয়ো এনকাউন্টার। বহুল চর্চিত ৭২ থেকে ৭৭-এর সন্ত্রাসময় সিদ্ধার্থশংকর রায় জমানার ‘ট্রেডমার্ক’।

সেই যুগের অবসানের পর থেকে সুদীর্ঘ নিরঙ্কুশ বাম জমানায় মরিচঝাঁপি, ধর্মতলার একুশে জুলাই থেকে নানুর, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই রাজনৈতিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সব মাইলফলক। রক্তারক্তি, প্রাণহানি ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পার্টি অফিস ভাঙা বা জবরদখল ও বিরোধী নেতার স্বাধীন  নড়াচড়া করার অধিকার খর্ব করার চল বাংলায় কোনওকালেই ছিল না। এক কথায় আইনের নয়, শাসকের আইন মেনে চলতে হত বাংলায়। বিরোধীদের ওপর গাজোয়ারি কায়েম করার এই সংস্কৃতির এক্সক্লুসিভ কপিরাইট কিন্তু মমতার। নিজের তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তায় ভর করে ক্ষমতায় বসেই নিরঙ্কুশবাদ হয়ে ওঠে তার দলতন্ত্রকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। যার একমাত্র বীজমন্ত্র ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’। তাঁর অস্ত্রই আজ বুমেরাং হয়ে ফিরছে। ইতিহাসের কী করুণ পুনরাবর্তন। ক্ষমতা বদলের পর মমতা প্রণীত ট্র্যাডিশন আয়ত্ত করেছে বিজেপি ‘মব’।

গত মে মাস থেকে ডিম ছোড়া  ‘মব’ এবার কাদার তাল ছুড়েছে মমতার গাড়িতে। গত জমানায় এমন ঘটনার পরে মমতা বা তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভাষায় জনরোষের তত্ত্ব দিয়ে ‘মব’ সন্ত্রাসের পক্ষ নিতেন, তাতেই স্পষ্ট ছিল সেই অপকর্ম আদতে নেত্রী কর্তৃক অনুমোদিত। রবিবারের ঘটনার সামাজিক প্রতিক্রিয়া শাসকের পক্ষে নেতিবাচক হতে পারে। সেই আশঙ্কায় বিজেপি সভাপতি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ‘রাজনৈতিক উচ্চতা’ স্মরণ করিয়ে দলের ‘মব’ কালচারে রাশ টেনেছেন, তাও গত দেড় দশকের প্রেক্ষিতে ব্যতিক্রমী। কিন্তু যাবতীয় ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে পুলিশি হেপাজতে মৃত্যু। যার সামাজিক অভিঘাত ব্যাপক আকার নেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। সাতের দশক থেকে রাজ্যে এপিডিআর–এর সৌজন্যে হেপাজতে মৃত্যু সম্পর্কে আমআদমির মধ্যে শাসক সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।  এহেন স্পর্শকাতর বিষয়ে তথাকথিত জেন জেড ইন্ধন পেতে পারে। ইতিমধ্যে দেশে তার ক্ষেত্র সিজেপি আন্দোলন থেকেই প্রস্তুত। শুভেন্দু-শমীকরা সে বিষয়ে সজাগ ছিলেন।

মমতার জমানায় ২০১৩ সালে হুগলির ধনেখালি থানায় এক তরুণের হেপাজতে মৃত্যুর ঘটনা সিবিআই তদন্ত পর্যন্ত গড়ায় আদালতের নির্দেশে। সিবিআই রুখতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মামলা লড়তে। ঘটনায় অন্যতম অভিযোগ ওঠে স্থানীয় তৃণমূল বিধায়কের বিরুদ্ধে। বিরোধী নেত্রী মমতা হুগলির তেলেনিপাড়া জুট মিলের ভিখারি পাসওয়ান গুম হলে যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, আজ বীজপুরে মৃত্যু নিয়ে কথা বলার নৈতিক অধিকার নিজেই হারিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। সেই কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিলেন তাঁর উত্তরসূরি। সোমবার মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে, মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু বস্তুত হেপাজতে মৃত্যুর ঘটনার দায় স্বীকার করে নিলেন। মৃতের পরিজনদের সুপারিশে শাস্তি দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ অধিকারিককে। অতীতের কংগ্রেস, বাম, হালের তৃণমূল জমানায় কখনও কোনও পুলিশমন্ত্রী এভাবে দায় কবুল করেননি। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে  মমতার ‘স্ট্রিট ফাইটার’ ইমেজ মলিনতর হল। মমতার মডেলেই শুভেন্দুও ক্ষতিপূরণের অছিলায় নগদ গুঁজে দিয়ে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়েছেন। যার ফলে মমতার ভবিষ্যৎ লড়াই সংগঠন কঠিন হল বলাই চলে। সংসদীয় গণতন্ত্রে নিরঙ্কুশবাদের সাধক মমতার এই করুণ পরিণতি কিন্তু বর্তমান শাসকের কাছেও শিক্ষণীয়।

এক কথায় বীজপুরে, ইতিহাসের পুনরাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়ে গেল গত চার দশক ধরে বাংলার বুকে গড়ে ওঠা ‘মমতা ম্যাজিক’।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *