বদলির ছক

বদলির ছক

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


রুটিন বদলি বলে পার পাওয়ার উপায় নেই। একবারে ৫০০-র বেশি আমলার কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তনের পিছনে নিশ্চয়ই বড় কোনও কারণ আছে। সেই কারণ প্রশাসনিক হওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক হওয়ার জল্পনাই বেশি। গণতন্ত্রে প্রশাসনের নিরপেক্ষভাবে নিজের মতো করে চলার আইনি বিধান আছে ঠিকই। কিন্তু এদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, ক্ষমতাসীন দলের সবুজ সংকেত বা অঙ্গুলিহেলন ছাড়া প্রশাসন সাধারণত একটি পা-ও ফেলে না।

রাজ্য হোক বা কেন্দ্র- সর্বত্রই এটা বাস্তব। যে কারণে আমলাদের সম্পর্কে দলদাস শব্দটি এত বেশি প্রচলিত। শব্দটির অভিঘাত অত্যন্ত নেতিবাচক। এতে এক ধরনের নিন্দাসূচক ও তাচ্ছিল্যের ভাব প্রকট। সংবাদমাধ্যমে, সমাজমাধ্যমে, বিভিন্ন আলোচনায়, রাজনৈতিক বক্তব্যে শব্দটি বারবার উচ্চারিত হয়। তা সত্ত্বেও প্রশাসন নির্বিকার। শাসক শিবিরের ইচ্ছানুযায়ী চলা বা মন রক্ষা করাই যেন প্রশাসনের মোক্ষ হয়ে উঠেছে।

জনসাধারণের কাছে এতে প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। নিরপেক্ষতা কাঠগড়ায় ওঠে। তা সত্ত্বেও আমলাদের একাংশের এই ধরনের সমালোচনায় ভ্রূক্ষেপ থাকে না। এর দুটি সম্ভাব্য কারণ আছে। প্রথমত, শাসকদলের অঙ্গুলিহেলনে চলতে তাঁরা বাধ্য হন বা তাঁরা অন্য কিছু করতে নিরুপায়। দ্বিতীয়ত, নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে বা বিশেষ সুবিধা ভোগ করার লক্ষ্যে কিংবা পছন্দের পদ বাগানো অথবা পদোন্নতির স্বার্থে শাসকদলের আজ্ঞাবহ হয়ে চলেন তাঁরা। দ্বিতীয় কারণের ক্ষেত্রে লজ্জা, অমর্যাদা, অপমানবোধ ইত্যাদি কিছুই আর থাকে না।

বাংলায় একদিনে এত আমলার বদলি প্রায় নজিরবিহীন। যাঁদের বদলি করা হয়েছে, তাঁরা সবাই প্রায় কোনও না কোনও প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন। মূলত যাঁরা বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক দেখভাল করেন, তাঁদেরই কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। বদলির বিজ্ঞপ্তিতে কোথাও এটা সরকারের রুটিন পদক্ষেপ বলা নেই। সেটা থাকেও না। সরকারের কেউ কেউ রুটিন বদলি বলেছেন মাত্র।

কিন্তু সেই সাফাই নিয়ে প্রশ্ন ওঠার নির্দিষ্ট কারণ আছে। যেমন, রুটিন বদলিও যদি করা হয়ে থাকে, তাহলে এত তাড়াহুড়ো কেন যে, সরকারি ছুটির দিনে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হল? ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) ঘোষণার সঙ্গে কি এই বদলির সম্পর্ক আছে? ২৪ ঘণ্টা আগে জাতীয় নির্বাচন কমিশন সাংবাদিক বৈঠক ডাকায় সকলেরই ধারণা হয়েছিল যে, এসআইআর ঘোষণা করতেই এই পদক্ষেপ।

তারপর সাংবাদিক বৈঠকের দিন সকালে নবান্নের একটার পর একটা বদলির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্দেশ্য তাই সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকে না। সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাত ১২টায় ঘোষণা কার্যকর হবে বলার পরেও কিছু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। ঘোষণা কার্যকর হয়ে গেলে যে কোনও প্রশাসনিক বদলিতে কমিশনের সম্মতি প্রয়োজন। সেই সম্মতি যাতে নিতে না হয়, সেকারণেই এই তড়িঘড়ি বদলির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে বলে ধরে নিতে অসুবিধা নেই।

নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে এসআইআর চলবে, তা জেলা স্তরে বাস্তবায়নের দায়িত্বে যে আধিকারিকরা থাকবেন, তাঁদের অনেককে বদলি করা হয়েছে। স্বভাবতই সেই দায়িত্বে যাতে সরকার বকলমে শাসকদলের পছন্দের অফিসারদের রাখতে পারে, সে কারণেই এই বদলি বলে মনে করা যেতেই পারে। সাধারণ নিয়মে কোনও আধিকারিক একটানা কোনও পদে ৩ বছর থেকে গেলে নির্বাচন কমিশন তাঁকে বদলি করে থাকে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে যাঁরা বদলি হলেন, তাঁদের অনেকে সেই মেয়াদ পার করে ফেলেছেন।

সরকার আগেই তাঁদের বদলি করে দিল যাতে তিন বছরের বিধানের সুযোগ নিয়ে কমিশনের আর কিছু করার না থাকে। যদিও কমিশন মনে করলে যে কোনও পদক্ষেপ, বদলি করতেই পারে। কিন্তু সাধারণ বিধানের পথটা এভাবে মেরে রেখে দিল রাজ্য সরকার। আগ বাড়িয়ে এমন সিদ্ধান্ত যে রুটিন প্রশাসনিক বন্দোবস্ত হতে পারে না, এরপর তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *