বিশ্বজিৎ প্রামাণিক, পতিরাম: চারদিনের উৎসব, ভক্তি ও আনন্দের সমাপ্তি টেনে সোমবার বিকেলে বিষাদের সুরে শেষ হল বোল্লা রক্ষাকালী পূজা ও মেলা। বিকেল নামার সঙ্গেই যখন ঢাকের আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে এল, তখন হাজারো ভক্তের কণ্ঠে একযোগে ধ্বনিত হল, ‘আসছে কবে, বছর পরে… বোল্লা মা কি জয়!’ এই আবেগঘন আহ্বানের মধ্যেই পুকুরের জলে মিলিয়ে গেল দেবীর মহামূর্তি।
এদিন বিকেল ৩ টার পর থেকেই রক্ষাকালী প্রতিমার বিসর্জন প্রক্রিয়া শুরু হয়। মূল মন্দিরের সামনে প্রচুর ঢাকির ঢাকের আওয়াজের সমাহারে এলাকার আকাশ গর্জে ওঠে। লাল রঙের আবিরে ছেয়ে যায় মন্দির প্রাঙ্গণ। এরপর মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে ধীরে ধীরে বাইরে আনা হয় বিশাল প্রতিমাকে। বিকেল প্রায় সাড়ে ৩ টায় শুরু হয় বিসর্জন প্রক্রিয়া। লোহার চাকাযুক্ত ফ্রেমে দড়ি বেঁধে মন্দির থেকে প্রতিমাকে বের করে আনা হয় মন্দিরের সামনে। প্রথমে পশ্চিমমুখী করে কিছুটা টেনে নেওয়ার পর পূর্ব দিকে ঘোরানো হয়। প্রায় ৪০ মিটার টেনে এনে মূল পাকা রাস্তায় দক্ষিণমুখী করে দাঁড় করানো হয় প্রতিমা। এরপর ঐতিহ্য মেনে তিনবার দক্ষিণ দিকে টেনে নিয়ে আবার উত্তর দিকে আনা হয়। সবশেষে পূর্বমুখী অবস্থায় রক্ষাকালীকে বিসর্জন ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দাঁড় করিয়ে চূড়ান্ত বিসর্জনের আগে প্রতিমার সমস্ত গহনা খুলে নেওয়া হয়। এই যাত্রাপথে দেবী মূর্তির কাছাকাছি যাওয়ার জন্য ভক্তদের মধ্যে প্রবল হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। প্রত্যেকেরই ছিল একটাই আকুতি—বিদায়ের আগে একবার মায়ের চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করা, মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আশীর্বাদ ভিক্ষা করা।
সূর্য ডোবার ঠিক আগে, পূর্ব দিকে মুখ করে প্রতিমাকে বিসর্জন ঘাটে দাঁড় করানো হয়। গোটা বোল্লা প্রাঙ্গণ তখন কেঁপে ওঠে ঢাকের তালে তালে ভক্তদের উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি এবং আবেগমাখা চিৎকারে। অবশেষে, দেবীর প্রতিমা যখন ধীরে ধীরে জলের মধ্যে বিলীন হতে শুরু করে, তখনও মানুষের কণ্ঠে ‘বোল্লা মা কি জয়’-এর ধ্বনি থামেনি। বিসর্জন পর্ব শেষ হওয়ার পর পুকুর থেকে পবিত্র জল এনে মন্দির চত্বর ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে, ভক্তদের মানত নিবেদনের প্রতীক স্বরূপ হাজার হাজার মানতকালী প্রতিমাও বিসর্জন দেওয়া হয়।
মেলা কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা, অর্ঘ্য সরকার জানান যে, এবারের মেলা পরিচালনায় কিছু সামান্য ত্রুটি রয়ে গেলেও, আগামী বছর পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে আরও নিবিড় সমন্বয় করে একটি সুষ্ঠু ও সুচারু আয়োজন করার চেষ্টা করা হবে।
