আশিস ঘোষ
সে অনেক দিন আগের কথা। আমাদের ছোটবেলায় ভোট মানে ছিল ঘরে ঘরে পুরোনো খবরের কাগজ জোগাড় করার তোড়জোড়। তখন ভোটের প্রচার হত খবরের কাগজের ওপর লাল রং বা আলতা দিয়ে পোস্টার লিখে। যে যেমন পারতেন, আঁকাবাঁকা হস্তাক্ষরে ভোট দেওয়ার আবেদন জানাতেন। সেইসঙ্গে চলত দেওয়াল লিখন। তখন কমিউনিস্ট পার্টি ছিল সত্যিকারের সর্বহারা। বাড়ি বাড়ি কৌটো নেড়ে চাঁদা তুলে মেটানো হত খরচখরচা। সরকারি দল কংগ্রেসের প্রচারে অবশ্য এপর্ব ছিল না। দেওয়াল লেখার পাশাপাশি ছাপা পোস্টারে টক্কর হত বামেদের সঙ্গে।
এরপর এল লিথোয় ছাপা পোস্টারের যুগ। হাতে লেখা পোস্টারের দিন ফুরিয়ে গেল। দেওয়াল লিখনে নানারকমের ব্যঙ্গ, শ্লেষ- তাও ফুরিয়ে গেল একসময়। শুধু দেওয়াল লেখায় ওস্তাদ ছিলেন কত জন। কী দক্ষতায় লিখতেন, আঁকতেন তাঁরা। একসময় কাজ ফুরোল তাঁদেরও। তার জায়গায় এল অফসেটে ছাপা ঝকঝকে বাহারি পোস্টার। ততদিনে হাল ফিরেছে সব দলেরই। লজঝড়ে সাইকেলের জায়গায় দু’চাকা, চার চাকার সওয়ার হলেন নেতারা।
রেস্ত বাড়তেই খরচ বাড়ল। জেল্লা এল প্রচারে। চোঙা ফুঁকে হাটে-বাজারে গলা ফাটিয়ে মিটিংয়ের সেই যুগ তখন গল্পকথা। চোখের সামনে বদলে গেল আরও কত কী। প্রচারের কায়দা থেকে প্রচারের ভাষা। নেতাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, বলার ধরন। এবার ভোটের লড়াইটা আর নিছক মেঠো-ময়দানি নয়, এবার লড়াই হবে ডিজিটালে। সমাজমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছোনো।
ভোটের অনেক আগে থেকেই তাল ঠুকছে দুই পক্ষ। এতদিন ডিজিটাল লড়াইয়ের বেশিটা ছিল বিজেপির দখলে। বলতে গেলে সেই চোদ্দো সালের পর থেকেই। বলতে গেলে একতরফা প্রচার চালিয়েছে তারা। তাতে কাজ হয়েছে। অফিস খুলে মাইনে করা কাজ জানা লোকদের দিয়ে সংবৎসর সত্যি-মিথ্যে নানারকম খবর, ভিডিও দিয়ে বাজার গরম করার কাজটা নিষ্ঠাভরে চালিয়ে গিয়েছে পদ্ম শিবির।
এবার ভোটের আগে তৃণমূলের সেকেন্ড ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে শুরু হয়েছে দলের নতুন কর্মসূচি, ‘আমি বাংলার ডিজিটাল যোদ্ধা।’ তৃণমূলের দাবি, বুথ সংগঠনে তারা আগেই অদ্বিতীয় ছিল। এবার সেই শক্তি দেখানো হবে সমাজমাধ্যমেও। বিজেপি-সিপিএমকে এতদিন শুধু ‘ফেসবুকের দল’ বলে ব্যঙ্গ করে এসেছে তৃণমূল। এখন সেই ডিজিটাল দুনিয়া দখলের লড়াইয়ে নামতে হয়েছে শাসকদলকেও।
তৈরি হয়েছে বিশেষ ওয়েবসাইট। সেখানে নাম লিখিয়ে ‘ডিজিটাল যোদ্ধা’ হওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে তরুণ প্রজন্মকে। নাম, ফোন নম্বর, জেলা ও বিধানসভা কেন্দ্রের তথ্য দিয়ে সদস্যপদ মিলবে এই ভার্চুয়াল বাহিনীতে। অভিষেক নিজে সমাজমাধ্যমে ভিডিও বার্তায় বলেছেন, তথ্য, পরিসংখ্যান ও যুক্তি দিয়ে এ লড়াইয়ে নামতে হবে। তৃণমূলের আইটি সেলও রয়েছে। এবার পেশাদার নামিয়ে সেটিকে জোরদার করা হচ্ছে। প্রতি বুথে কমপক্ষে দশজন যোদ্ধাকে কাজে লাগানো হবে। শোনা যাচ্ছে, প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই নাম লিখিয়েছেন দশ হাজার যোদ্ধা।
বিজেপিও বসে নেই। তারা সর্বভারতীয় দল। খুঁটির জোর দিল্লিতে। দিল্লি থেকে এক্সপার্ট আনা হচ্ছে বাংলায়। এর মধ্যে কয়েক দফা মিটিং হয়ে গিয়েছে। আপাতত ঠিক হয়েছে, ত্রিপুরা, দিল্লির মতো কয়েকটি রাজ্য থেকে বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া সেলের পাঁচ অভিজ্ঞ নেতা বাংলায় আসবেন। তাঁরা বিধানসভা ভোট পর্যন্ত এরাজ্যে থাকবেন।
রাজ্যে বিজেপির পাঁচ সাংগঠনিক জোনে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার সামলাবেন মূলত ভিনরাজ্যের এই পাঁচ নেতা। কীভাবে তৃণমূলের ডিজিটাল যোদ্ধাদের মোকাবিলা করা হবে, তা ওই বাইরের এক্সপার্টরা ঠিক করবেন। গাইডলাইন বানিয়ে দেবেন। সঙ্গে আরএসএসের স্পেশাল কোচিং তো আছেই।
একাজে গেরুয়া শিবির অন্যদের তুলনায় বেশ এগিয়ে। তারা বহুদিন ধরে বিস্তর টাকা ঢেলেছে সমাজমাধ্যমে। গতবছর লোকসভা ভোটে প্রিন্ট আর ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে বিজেপি বিজ্ঞাপন বাবদ খরচ করেছে ৬১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এটা নির্বাচন কমিশনকে তারা নিজেরাই জানিয়েছে। বছরভর তাদের আইটি সেলের পিছনে খরচ হয় আরও অনেক টাকা।
ভোটে যে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার বড় ভূমিকা নিতে পারে, এটা সবার আগে বুঝেছিল গেরুয়া ব্রিগেড। তাদের আইটি ব্রিগেড কাজ শুরু করেছিল ২০০৭ সালে। ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটেই বিজেপি তাদের ভোটের খরচের ৫ শতাংশ ঢেলেছিল প্রচারে। তখন ইন্টারনেট, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ছিল না। সেসময় প্রচার হয়েছিল ভোটারদের ফোনে আগে থেকে রেকর্ড করা নানা কথা বাজিয়ে।
২০০৯ সালে নিজের ওয়েবসাইট চালু করেছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানি। একই বছরে নরেন্দ্র মোদির টুইটার অ্যাকাউন্ট চালু হয়। তখন তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধির টুইটার চালু হয়েছিল তারও ছয় বছর পরে। ২০১৪ সালে বিজেপির জয়ের পিছনে দলের আইটি সেলের ছিল বিরাট ভূমিকা। এখন নিত্যদিন অষ্টপ্রহর সত্যি-মিথ্যে নানারকম প্রচারকে বড় অস্ত্র বানিয়ে তুলেছে পদ্ম শিবির। কোনও সন্দেহ নেই, এবার তাদের প্রচারে তৃণমূলের সঙ্গে লড়াইয়ের অনেকটা হবে অন্যরকম, মাটির পাশাপাশি আকাশে।
