‘তুমলোগ মুঝে ঢুন্ড রহে হো অউর ম্যায় ইঁহা তুমহারা ইন্তেজার কর রাহা হুঁ।’ সাতের দশকের এক ব্যারিটোন ভয়েসের ঝংকারে রুপোলি পর্দা ‘বিজয়’ করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন। এদেশের ‘জন-গণ-মন’ তাঁকে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ হিসেবে কার্যতই পুজো করতে শুরু করে দেয়। কিন্তু সেই অমিতাভই নয়ের দশকের একেবারে শুরুতে বুঝতে পারেন তাঁর রাগী ইমেজে বহু ব্যবহারে ও একের পর এক খারাপ চিত্রনাট্যের ধাক্কায় ফিকে হয়ে গিয়েছে। নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেন তিনি। এ এক আশ্চর্য সমাপতন যে, সেই একই সময়ে আরও এক অভিনেতাকে ঘিরে তৈরি হতে থাকে ক্রোধ, দ্রোহ ও প্রতিবাদের অভিজ্ঞান। তিনি নানা পাটেকর। উদয় শেঠি হয়ে যিনি নিজেকে বলেছিলেন, ‘কন্ট্রোল উদয় কন্ট্রোল’, সেই কমিক রিলিফ অনেক পরের ব্যাপার। আটের দশকের মাঝামাঝি সময়ের ‘অঙ্কুশ’ থেকে শুরু হওয়া নানার এই অসম্ভব রাগী ও প্রতিবাদী যুবকের ইমেজ নয়ের দশকে একের পর এক ছবিতে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। উলটো দিকে আমির-সলমনদের চকোলেট হিরো ইমেজের থেকে দূরে নানা তৈরি করেন নিজস্ব ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’। সেখানে ‘বিগ বি’র গ্ল্যামার নেই। সন্তর্পণে সেই গ্ল্যামার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন নানা।
নানা পাটেকর মানেই এক আগ্নেয়গিরির ফেটে পড়া। সেই লাভাস্রোতে সামনের সবকিছু তিনি উড়িয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে প্রস্তুত। বলিউডের হিরোইজম এরকম খরখরে, পলিটিক্যালি ইনকারেক্টনেস এর আগে দেখেনি। পরেও কি দেখেছে? ১৯৭৮ সালে রুপোলি পর্দায় পা রাখলেও ১৯৮৫ সালে ‘অঙ্কুশ’ ছবির রবি চরিত্রেই সর্বভারতীয় ছবির দর্শকের কাছে প্রকৃত আত্মপ্রকাশ নানার। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন একেবারেই ‘অ্যান্টিসোশাল’ এক চরিত্র। অথচ একটা অপরাধের সামনে সেই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত বিদ্রোহী। সংলাপের ঝলকানির পাশাপাশি স্রেফ চোখের পর্দায় ফুটিয়ে তোলা ক্রোধের আগুন- এখনও ছবিটি দেখলে বোঝা যায়, বিস্ফোরক বোঝাই এক নায়ক পা রাখছেন।
আরও পড়ুন:

এরপর ১৯৯০ সালে ‘পারিন্দা’র আন্না শেঠ। ছবিটিতে নানা খলনায়ক। তবু সে ঠিক স্টিরিওটাইপ ভিলেন নয়। বরং একাধারে নৃশংস ও অন্যদিকে মানসিক অসুখে জেরবার এক চরিত্র। আগুন দেখলেই যার মাথা খারাপ হয়ে যেত। নিজের মাথা চাপড়াতে থাকত সে। ডন আন্নার এই চরিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন নানা। পরের বছর ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’। সেই ছবিতে মেজর চৌহানের চরিত্রে নানার অভিনয় কখনও ভোলা যাবে না। ছবির একটি দৃশ্যে প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ে রাতের নির্জন ব্রিজে এক ব্যক্তিকে হত্যা করছেন নানা। স্রেফ শরীরী ভাষায় ঘৃণা, ক্রোধ ও অসহায়তার এমন মিশেল অভাবনীয়। অথচ সেই মুহূর্তে চরিত্রটি একজন খুনি। তবু তার অসহায়তার সঙ্গে একাত্ম বোধ করে দর্শক। তার ক্ষোভের ক্যাথারসিস চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামতে থাকে আমাদের শিরা বেয়েও।
১৯৯৩ সালে ‘তিরঙ্গা’, ১৯৯৪ সালে ‘ক্রান্তিবীর’, ১৯৯৫ সালে ‘অগ্নিসাক্ষী’, ১৯৯৬ সালে ‘গুলাম-এ-মুস্তফা’, ১৯৯৭ সালে ‘যশোবন্ত’- পরপর রাগী নানার বিস্ফোরণের সাক্ষী হয়েছিল আসমুদ্রহিমাচল। এরই মাঝে ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’-এ মূক ও বধির এক মানুষের চরিত্রে একেবারে অন্য এক নানাকে দেখলাম আমরা। আবার ‘রাজু বন গ্যায়া জেন্টলম্যান’ ছবির জয় জীবনরসে রসিক এক অন্য মানুষ। কিন্তু একথা মানতেই হবে নানা মানে সবচেয়ে আগে আমাদের মনে পড়ে যায় তাঁর ওই ক্রোধী অভিব্যক্তি। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও অন্যকে উপহাস করতে ছাড়ে না সে। নিজস্ব প্রতিবাদের ভাষায় বলে ওঠে, ‘আ গ্যায়ে মেরে মউত কা তামাশা দেখনে!’ এই সংলাপও নানার নিজস্ব। নিজের মুখে মুখে অনর্গল কথার ফুলঝুরি ফুটিয়ে তিনি মুহূর্তে তৈরি করেছিলেন সংলাপ। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সেখান থেকে সরাসরি সেটে এসে ওই অভিনয়, তাও নিজস্ব সংলাপে! আসলে নানা পাটেকরের একেবারে অন্তর থেকে উঠে এসেছিল কথাগুলো।

অমিতাভের ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ তাঁর সময়ের ফসল। সেই অস্থির সময়ে বলিউডের কাছে এমনই এক চরিত্র বোধহয় প্রার্থনা করছিল ভারতীয় আমজনতা। সাতের অস্থির সময় পেরিয়ে আটের অপেক্ষাকৃত শান্ত সময়ের ভিতরেও যে আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল সেটাকেই নানা তুলে এনেছিলেন নিজের হৃদয় নিংড়ে। মানুষের মৃত্যু হয়। শিল্পের হয় না। আজ থেকে ব্যক্তি নানা অতীত হয়ে গেলেন। থেকে তাঁর অভিনয়। আর সেই অভিনয়ের সিংহভাগ জুড়ে রয়ে গেল একের পর এক রাগ, ক্ষোভ ও নিয়ন্ত্রণহীন ক্রোধের গনগনে লাভাস্রোত।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
