প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যে ভরপুর জর্জিয়া – Uttarbanga Sambad

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যে ভরপুর জর্জিয়া – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


  • অরবিন্দ ভট্টাচার্য

 কম খরচে যদি ইউরোপ ভ্রমণের সাধ মেটাতে চান তাহলে আপনার পরবর্তী গন্তব্য অতি অবশ্যই হতে পারে পূর্ব ইউরোপ আর পশ্চিম এশিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ছোট্ট একটি  সুন্দর দেশ জর্জিয়া।  রাজধানী টিবিলিসি।  দিল্লি থেকে দূরত্ব মাত্র ৩,২০০ কিলোমিটার। বিমান ভাড়াও খুব বেশি নয়; দিল্লি-টিবিলিসি রাউন্ড ট্রিপ ৩০-৪০ হাজার টাকা, কখনও আরও কম। সময় লাগবে মাত্র সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। ইন্ডিগোর বিমান এই রুটে প্রত্যেকদিন চলাচল করে। হোটেল, গাড়িভাড়া আর খাওয়াদাওয়ার খরচ সাধ্যের মধ্যেই। ভারতীয়দের জন্য অনলাইন ভিসা চালু আছে। ব্যাংক ব্যালেন্স ঠিকঠাক থাকলে ৩-৪ হাজার টাকা ফি দিয়ে ভিসা পেতে খুব একটা সমস্যা হয় না। সমস্যা হলে ট্রাভেল এজেন্টের শরণাপন্ন হতে পারেন।

ককেশাস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত সবুজ উপত্যকা ঘেরা এই দেশটির আয়তন ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা মাত্র ৩৮ লক্ষ। ১০০ শতাংশ মানুষই শিক্ষিত। সরকারি ভাষা জর্জিয়ান (কার্টভেলিয়ান)। এই ভাষায় প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ কথা বলেন। তবে জর্জিয়ার মানুষ পর্যটকদের সঙ্গে ইংরেজিতেই মতবিনিময় করেন। জর্জিয়ার উত্তর এবং উত্তর-পূর্বজুড়ে রয়েছে রাশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আজারবাইজান, দক্ষিণে আর্মেনিয়া এবং তুরস্ক আর পশ্চিম দিকে বিস্তৃত কৃষ্ণসাগর। বিস্তীর্ণ উপত্যকাজুড়ে সবুজ আঙুরের খেত। সেই আঙুর থেকে প্রস্তুত হচ্ছে প্রচুর মদ। মদ প্রস্তুতের ইতিহাস প্রায় আট হাজার বছরের পুরোনো। মদ রপ্তানি করে লক্ষ লক্ষ ডলার আয় করে জর্জিয়া। লোহা, রুপা, তামা এবং সোনার অফুরন্ত ভাণ্ডার সঞ্চিত আছে দেশটিতে। আছে অসংখ্য জলবিদ্যুৎ  প্রকল্প। খনিজ জল সার এবং মোটরগাড়ি রপ্তানি করে কোটি কোটি ডলার আয় করছে জর্জিয়া।

দেশটিই শুধু সুন্দর নয়, জর্জিয়ার মানুষজনের রূপলাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে গেছি। দুধে আলতায় গোলা গায়ের রং, একরাশ কালো অথবা সোনালি চুল, নীলাভ গভীর চোখের স্বপ্ন মেদুর চাহনি আর সবুজ উপত্যকার মতো সতেজ নির্মল মনের ককেশিয়ানরা এক লহমায় আপনার হৃদয় কেড়ে নেবে। দিল্লি থেকে দুপুর সাড়ে তিনটায় ইন্ডিগোর বিমানে রওনা দিয়ে পাকিস্তান আফগানিস্তান তুর্কমেনিস্তান কাস্পিয়ান সাগর আর আজারবাইজানের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে রাত সাড়ে নয়টা (জর্জিয়ার সময় রাত ৮টা) নাগাদ পৌঁছে গেলাম জর্জিয়ার রাজধানী টিবিলিসিতে। অচিন দেশের আকাশে থরে থরে সাজানো মেঘমালা আমার কাছে বরাবরই মোহময় হয়ে ওঠে। কখনও বা নীল আকাশের নীচে তুষারশুভ্র ধ্যানগম্ভীর পর্বত শিখরের স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। হিমালয় পেরিয়ে হিন্দুকুশ তারপর ককেশাস। হয়তো ওখানেই দেবতাদের ঘরবাড়ি! একটু একটু করে পশ্চিম দিগন্তে সন্ধে নেমে আসে। জর্জিয়ার পথেপ্রান্তরে আলো জ্বলতে শুরু করেছে। ওপর থেকে দেখে মনে হয় আকাশের তারারা বোধহয় আজ মাটিতে নেমে এসেছে!

টিবিলিসি বিমানবন্দরের বাইরে আমাদের জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল রামোসি। সেখান থেকে মিনিট পঁচিশ চলার পর আমাদের হোটেল “কেনারী গেস্টহাউস”। ছিমছাম সুন্দর নিস্তব্ধ হোটেল। কথা বলার আগেই একগাল হেসে নেন জর্জিয়ান তরুণী রিসেপশনিস্ট। পরদিন সকাল ১০টায় রামোসি আমাদের নিয়ে ঘুরতে বের হবে। আমাদের হোটেল, গাড়ি এবং সম্পূর্ণ ট্যুর দিল্লি থেকে অনলাইনে নিজেদের বুক করা ছিল। ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতোই এখানেও ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। থরে থরে সাজানো প্রচুর আইটেম। ঠিক দশটায় রামোসি হাজির। প্রথমে রাজধানী টিবিলিসির আশপাশের দ্রষ্টব্যগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে। জর্জিয়ার সংসদ ভবন, জাতীয় মিউজিয়াম, ওল্ড টাউন, “ব্রিজ অফ পিস”, দারিয়ালি মনাসটেরি। সেখান থেকে চলে গেলাম ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত নারীকালা দুর্গে। তারপর ট্রিনিটি ক্যাথিড্রাল। সেখান থেকে সোজা ৮৭ কিলোমিটার দূরের শহর গোরিতে রাশিয়ার প্রাক্তন প্রিমিয়ার জোসেফ স্টালিনের জন্মভিটে দেখে এলাম। রাতে টিবিলিসির “ফ্রিডম স্কোয়ারে” স্ট্রিট ডান্সারদের বর্ণাঢ্য বেলে ডান্স দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। উদ্দাম যৌবনের দুরন্ত সেই নাচ!

পরদিন রামোসি আমাদের নিয়ে যাবে রাশিয়ান সীমান্তে অবস্থিত বৃহত্তর ককেশাসের অংশ কাজবেকি পর্বতমালায়। ঠিক সকাল ৯টায় ও এসে হাজির! আমাদের যাত্রা হল শুরু। কর্ণধার রামোসি। ফাঁকা মসৃণ দুই লেনের রাস্তা। ভিড়ভাট্টা নেই। শহর ছাড়াতেই ঘন সবুজ গাছে ঘেরা গ্রাম আর স্রোতস্বিনী নদী। দূরে পাহাড়। তবে আকাশটা যেন বড় বেশি নীল! একটা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছবিটবি তুলে আবার এগিয়ে চললাম। রামোসি আগে জর্জিয়ান আর্মিতে ছিল। ২০০৮-এ  রাশিয়ার সঙ্গে শেষ যুদ্ধটা করেছে। মানুষ এতটা নিঃস্বার্থ ভদ্র পরোপকারী এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ হতে পারে সেটা রামোসির সঙ্গে দেখা না হলে বুঝতেই পারতাম না। ওর সম্পর্কে সবগুলো ফাইভ স্টার রিভিউ দেখে দিল্লি থেকেই ওর গাড়ি বুক করেছিলাম। রামোসি একটা অদ্ভুত মানুষের কাছে নিয়ে গেল। ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যার হবি শুধু গণ্যমান্য মানুষজনের গাড়ির ভগ্নাবশেষ সংগ্রহ করা। ও আমাদের অবাক করে দিয়ে জোসেফ স্টালিনের গাড়ির কাছে নিয়ে গেল। প্রথমটা বিশ্বাস হয়নি, কিন্তু পরে দেখলাম গাড়ির কাচের ভেতরে স্ট্যালিনের নাম লেখা!

অসংখ্য গাড়ি তার সংগ্রহে। দেখতে কোনও পয়সা লাগে না, পাশেই তার ছোট্ট রেস্তোরাঁ সেখানে একটু খাওয়াদাওয়া করলেই সে খুশি। পথে দারিয়ালি মনাসটেরি কমপ্লেক্স দেখিয়ে সোজা ছুটে চলল কাজবেকের দিকে। দূরের পর্বতটা একটু একটু করে কাছে আসতে শুরু করল। গাড়ি মসৃণ পিচ রাস্তা ধরেই পর্বতের উপরে উঠতে শুরু করল। কিছুদূর চলার পরই বরফের দেশে এসে গেলাম। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের পর যেখানে জর্জিয়ার “ফ্রেন্ডশিপ মনুমেন্ট” স্থাপিত হয়েছে সেখানে এসে থামলাম। নীচে নীল জলের হ্রদ। রামোসি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ওই পাহাড়টার পেছনেই রাশিয়া! আধ ঘণ্টা সেখানে থেকে অজস্র ছবি তুলে ফিরে আসার সময় আমাদের রুটের বাইরে আরেকটি জায়গায় নিয়ে গেল। সেখানে সবুজ উপত্যকাজুড়ে পাথর কেটে কেটে অজস্র মূর্তি গড়ে তুলেছেন প্রবীণ এক শিল্পী। রবি ঠাকুরের মতো সাদা দাড়ি। চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের পাওয়ার চশমা। সারা জীবন ধরে এই মূর্তিগুলো তৈরি করেছেন। এই নিপুণ শিল্প দেখে মনটা ভরে গেল। কিছু লারি(জর্জিয়ান মুদ্রা) ওর হাতে তুলে দিলাম। রামোসি আমাদের ট্যুর রুটের বাইরেও অনেক জায়গায় নিয়ে গেল। রাতে হোটেলে নামিয়ে দিল। নির্দিষ্ট ভাড়ার বাইরে কিছুই নেবে না, তবু প্রায় জোর করেই একটা জর্জিয়ান ওয়াইন আর দশ ডলার ওর হাতে গুঁজে দিলাম। বিদায় রামোসি।

পরদিন লাক্সারি এসি বাসে আমাদের তেলাবী ট্যুর। তেলাবীতে বিভিন্ন ধরনের মদ তৈরি হয়। জর্জিয়াকে ইউরোপে মদের আঁতুড় বলা হয়। সকাল ১০টায় রওনা দিয়ে পথে “বডবেস সেন্ট নিনো কনভেন্ট মোনাস্ট্রি”, ‘আনাউরি দূর্গ’ , “সিটি অফ লাভ” আর “ট্রিচুড়ে”(বিশেষ ধরনের ক্যান্ডি) তৈরির কারখানা ঘুরে দেখলাম। যা দেখি তাতেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সবশেষে তেলাবীর ওয়াইন ফ্যাক্টরিতে এসে বাস থামল। বিনা পয়সায় নানা ধরনের মদ চেখে দেখার জন্যে লম্বা লাইন পড়ে গেল! তারপর কেউ কিনলেন, কেউ ফিরলেন খালি হাতে। এবার টিবিলিসি ফেরার পালা। কোথা দিয়ে একটা গোটা দিন কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।

পরের গন্তব্য কৃষ্ণসাগরের তীরে জর্জিয়ার বন্দর নগরী বাটুমি। দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার।  ফোর লেনের দারুণ রাস্তা। কখনও আঙুরখেত, কখনও অরণ্য অথবা সবুজ উপত্যকা চিরে ১১০/২০ কিমি বেগে ছুটে চলেছে গাড়ি। তিন ঘণ্টা চলার পর পৌঁছে গেলাম  ছোট্ট সুন্দর  শহর “কুটাইসি”তে। লোকজন ভীষণ কম। ড্রাইভার নিয়ে গেল বিশাল সবুজ লনের মাঝে এক ঐতিহাসিক স্থাপত্য “বাগারাতিস ক্যাথিড্রালে”। সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্য হাত ধরাধরি করে আছে। এখানকার অধিকাংশ মানুষ অর্থডক্স ক্রিশ্চান। কুটাইসি মোটামুটি ঘুরে আমরা চলে গেলাম বাটুমিতে। তখন বিকেল। আগে থেকেই কৃষ্ণসাগরের তীরে ৫৮ তলা হাইরাইসের ২৬ তলায় আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট বুক করা ছিল। সাগরের দমকা হাওয়ায় দরজা-জানলা কিছুই খোলা যাচ্ছে না। সময় নষ্ট না করে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সাগর দর্শনে। বন্দরের কাছাকাছি যেতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। বারে বারে ছাতা উলটে যাচ্ছিল। শুধু রেস্তোরাঁ আর বড় বড় কোম্পানির আউটলেট শহরজুড়ে। বন্দরে নানা দেশের অসংখ্য ছোট-বড় জাহাজ, ইয়ট নোঙর করা আছে। সাগরের ঝোড়ো হাওয়ায় উত্তাল ঢেউয়ে মোচার খোলের মতো দুলে দুলে উঠছে নৌযানগুলো! বৃষ্টিতে ভিজে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এলাম।  পরদিন বেলা ১০টা নাগাদ বাটুমিকে বিদায় জানিয়ে আবার টিবিলিসির “কেনারী গেস্টহাউসে” ফিরে এলাম। পরদিন রাতে ইন্ডিগোর বিমানে চেপে আবার দিল্লি ফিরে এলাম।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *