পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলের ‘সবুজ সাথী’ প্রকল্প নতুন নাম দিয়ে চালু করল বর্তমান রাজ্য সরকার। তবে নতুন প্রকল্পের আঙ্গিকে কিছু বদল আনা হয়েছে। পূর্বে প্রকল্পটির নাম ছিল ‘সবুজ সাথী।’ নতুন নাম হল ‘সারথী’। আগের বর্ণ ছিল নীল–সাদা। ‘সারথী’ গৈরিক বর্ণ ধারণ করেছে। প্রকল্পের নাম বা সাইকেলের রঙের পরিবর্তনে কিছু বলার থাকতে পারে না। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে নানা ধরনের পরিবর্তন বহু সময়ে হয়ে থাকে।
কিন্তু সম্প্রতি ‘সারথী’ প্রকল্পের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে সরকারি প্রস্তাবটির কথা ঘোষণা করেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, এই প্রকল্পের সাইকেল যদি এই রাজ্যে উৎপাদিত হয়, তাহলে তাঁর সরকার নবীন উদ্যোগপতিদের উৎসাহ দেবে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবের উদ্দেশ্য যে সাধু, তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, এরাজ্যে সাইকেল উৎপাদন শুরু হলে সরকার ‘সারথী’ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সাইকেল এইসব কারখানা থেকে কিনে নেবে, ভিনরাজ্যে উৎপাদিত সাইকেল আর বাজার থেকে কিনবে না।
এর ফলে এরাজ্যে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমন ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পের রেখচিত্র ঊর্ধ্বগামী হবে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণাটি যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক এবং যদি মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এরাজ্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। কিন্তু সরকারকে মাথায় রাখতে হবে, প্রতিশ্রুতি আর তার বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকে। আজকের দিনে যে কোনও শিল্প সম্ভাবনাকে সফলভাবে কার্যকরী করে তুলতে হলে একাধিক বিষয়ে গভীর চিন্তাভাবনা প্রয়োজন।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সুবিধার কারণে বর্তমানে শ্রমনিবিড় কারখানা গড়তে বিনিয়োগকারীরা রাজি হন না। সাইকেল কারখানার ক্ষেত্রে তার অন্যথা হবে বলে মনে হয় না। তবে কর্মসংস্থানের পরিসর বৃদ্ধি না হলেও সাইকেল কারখানাগুলি লাভজনক হলে রাজ্যের অর্থনীতি কিঞ্চিৎ চাঙ্গা হবে- সেটাই আশার কথা। এই রাজ্য একসময় সাইকেল শিল্পে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্থান করে নিয়েছিল সেন র্যালে কোম্পানির সৌজন্যে।
আসানসোল শিল্পাঞ্চলের কন্যাপুরে পাঁচের দশকের গোড়ায় গড়ে উঠেছিল সুসমন্বিত সাইকেল কারখানা বা ইন্টিগ্রেটেড সাইকেল ফ্যাক্টরি। ডাক্তার নীলরতন সরকারের জামাই, বাঙালি উদ্যোগপতি সুধীরকুমার সেন ১৯৫২ সালে নির্মাণ করেছিলেন ওই কারখানা। প্রায় সওয়া লক্ষ বর্গফুটজুড়ে তৈরি কন্যাপুর কারখানায় উৎপাদিত সাইকেলের চাহিদা উত্তরোত্তর বেড়েছিল। সেসময় বছরে দু’লক্ষ সাইকেল উৎপাদনে সক্ষম ছিল এই কারখানা।
প্রায় সাড়ে চার হাজার শ্রমিক, অফিসার এবং আধিকারিক কর্মরত ছিলেন সেখানে। এই কারখানা ঘিরে এলাকার অর্থনীতি পালটে গিয়েছিল সেসময়। এতৎসত্ত্বেও কারখানাটির ঝাঁপ বন্ধ হয়েছিল। ধুঁকতে থাকা কারখানার পুনরুজ্জীবনের জন্য ১৯৭৫ সালে কেন্দ্র এই কারখানার রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করে। তাও কারখানাকে বাঁচানো যায়নি। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা। লুধিয়ানা বা হরিয়ানায় অনেক সস্তায় সাইকেলের যন্ত্রাংশ তৈরির অজস্র ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে ওঠে তখন।
সেইসব যন্ত্রাংশ জুড়ে যেসব সাইকেল তৈরি হতে শুরু করে, সেগুলি অনেক সস্তায় বিক্রি হতে শুরু করে। এই কারখানার ইতিহাসটি বিশেষভাবে শিক্ষণীয় এই কারণে যে, কারখানা নির্মাণের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন এবং তার বিপণনের বাজারটি অব্যাহত রাখা। নতুন উদ্যোগপতিদের উৎসাহ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বিপণনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও তাই করতে হবে রাজ্য সরকারকে।
ভিনরাজ্য থেকে আসা সাইকেল সৌকর্যে এবং বিক্রয়মূল্যে ক্রেতাদের কাছে অধিক পছন্দসই হলে এরাজ্যে উৎপাদিত সাইকেল প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে পারবে না। রাজ্য সরকার এরাজ্যের কারখানায় উৎপাদিত সাইকেল ক্রয়ের নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষপর্যন্ত যেন নীতিগত প্রশ্নে পিছু না হটতে হয়- সেদিকটি ভেবে দেখতে হবে সরকারকে।

