‘অছি’ প্রস্তাব ও মহাত্মা গান্ধীর অর্থনীতি ভাবনা

রাজ্য/STATE
Spread the love


গান্ধীজি ‘রাজনীতি’ থেকে ‘অর্থনীতি’-কে আলাদা করতে চাননি। তঁার অহিংস অর্থনীতিতে জোর জবরদস্তির স্থান ছিল না। তঁার নীতিতে প্রত্যেকেকে তার ন্যায্য প্রয়োজনের উদ্বৃত্ত অংশ দরিদ্রতর অংশের জন্য স্বেচ্ছায় অর্পণ করতে বলে। বাপুর ন্যায্য প্রয়োজন সূচিত করছে সেই সমবণ্টনের আদর্শ– যেখানে কারও দুর্বল পাকস্থলীর জন্য হয়তো ১০০ গ্রাম চালের প্রয়োজন, অন্য আর-একজনের শারীরিক প্রয়োজনে হয়তো ৪০০ গ্রাম তালের দরকার হয়– সেক্ষেত্রে উভয়েই আপন প্রয়োজন অনুসারে চাল পাবে। অর্থাৎ, বাপুর এই সমবণ্টনের অর্থ: প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টন, যা গাণিতিক অর্থে সমপরিমাণ বণ্টন নয়।

স্বেচ্ছায় সম্পদের সহভোগ না-হলে সহিংস রক্তবিপ্লব অনিবার্য, এ-কথা গান্ধীজি স্বীকার করতেন। তবে প্রাকৃতিক নিয়মে দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা, সঞ্চয় বৃত্তি প্রভৃতি গুণগুলি প্রত্যেকের মধ্যে এক নয়। সেজন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায্যবণ্টন ব্যবস্থাই সমবণ্টনের বাস্তব রূপ। হিংসার পথে ধনসম্পদ কেড়ে নিয়ে সমবণ্টনের যে-পথ দেখানো হয়, তাতে স্থায়ী কল্যাণ হয় না। কেননা, এর ফলে অর্থ বা সম্পদ সৃষ্টির সামর্থ যাদের আছে– তাদের অবদান সমাজ হারাবে। গান্ধীজির কাছে এমনটাই ছিল আর্থিক সাম্যের চিত্র।

আরও পড়ুন:

কিন্তু তা’বলে উচ্চশ্রেণি ও জনগণ এবং রাজা-প্রজাদের মধ্যে যে বিপুল বৈষম্য রয়েছে তাকে এই যুক্তি দিয়ে যেন কেউ সমর্থন করার চেষ্টা না করেন যে, উচ্চশ্রেণি এবং রাজাদের প্রয়োজন অন্যান্যর চেয়ে অনেক বেশি। এমন যুক্তিবিলাসের দ্বারা নিজের যুক্তিকে পরিহাস করা হবে বলে মনে করতেন। প্রাথমিক প্রয়োজনগুলি ছাড়া অন্যান্য প্রযোজনকে তিনি অস্বীকার করেননি, কিন্তু দরিদ্র জনসাধারণের প্রাথমিক প্রয়োজন পুরণের পরেই সেগুলি আসবে বলেছেন।

আরও পড়ুন:

গান্ধীজি অহিংস উপায়ে ধনবানকে তঁার ধনের ‘অছি’ বা তত্ত্বাবধায়ক রূপে আচরণ করতে বলেছেন। কিন্তু যথাসাধ্য চেষ্টা সত্ত্বেও ধনীরা যদি তাদের ধনের প্রকৃত ‘অছি’ না হয়, তবে কী করা হবে? সেক্ষেত্রে গান্ধীজি দরিদ্রদের সংগঠিতভাবে অহিংস অসহযোগ ও আইন অমান্যরূপ সত্যাগ্রহের আশ্রয় নিতে বলেন। কেননা, কোনও অবস্থাতেই গরিবের সহযোগিতা ছাড়া ধনীর ধন উপার্জন সম্ভব নয়, বলেই তিনি মনে করতেন।

ধনতান্ত্রিক শিল্পায়নের সমাধান হিসাবে গান্ধী রাষ্ট্রায়ত্তকরণকে মেনে নেননি, কারণ তাতে শিল্পায়নের মজ্জাগত দোষ কাটবে না ব্যক্তি পুঁজিবাদ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদে পরিণত হবে।

গান্ধীজির অর্থনৈতিক ভাবনার মূল বিষয় ছিল গ্রাম স্বয়ংসম্পূর্ণতা বা ‘গ্রাম স্বরাজ’। এর অর্থ: প্রতিটি গ্রামকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে যার দু’টি মৌলিক চাহিদা– খাদ্য এবং বস্ত্র। পরিবারের প্রতিটি সদস্য চরকা চালাবে সুতো কাটবে। সেই সুতো থেকে গ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় উৎপাদন করা হবে। একইরকমভাবে গ্রামকে নিজের চাল, শাক-সবজি ইত্যাদি উৎপাদন করতে হবে। যাতে খাদ্য ও বস্ত্র বাইরে থেকে গ্রামে আমদানি করতে না হয়। যেহেতু তঁার ধারণার মূল বিষয়বস্তু ছিল গ্রাম স্বনির্ভরতা, তাই তিনি সর্বদা খাদি ও গ্রামীণ শিল্পের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতেন। গান্ধীজির কাছে খাদির একটা মানবিক মূল্য ছিল– যেখানে মিলের কাপড়ে শুধুই উপাদান মূল্য খুঁজে পেতেন তিনি। আর চরকা এবং তার সঙ্গে সম্পৃক্ত গ্রামীণ শিল্পগুলি যদি পূর্ণরূপে সফল হয়, তবে তার দ্বারা সামাজিক এবং আর্থিক সমস্ত অসাম্যই প্রায় দূর হতে পারে বলে আশা করেছিলেন।

তঁার নজর ছিল চরকা, খাদি, কুটিরশিল্পের প্রতি। ভারী যন্ত্রশিল্পকে ততটা এ দেশের অর্থনীতির জন্য তিনি গুরুত্ব দিতে চাননি। আধুনিক শিল্পায়ন সম্পর্কে তঁার কিছুটা বিরূপ ধারণাই ছিল। সে-যুগে ইউরোপের একটি সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ভয় হয়, আধুনিক শিল্পবাদ আমাদের সমাজের কাছে অভিশাপস্বরূপ হতে চলেছে। শিল্পবাদ সম্পূর্ণ রূপে অপরকে শোষণ করার ক্ষমতার উপর বেঁচে থাকে। আর, অপরকে শোষণ করার জন্য ভারতকে শিল্পায়িত করার কথা কেনই-বা আমি চিন্তা করব।’ এমনকী ধনতান্ত্রিক শিল্পায়নের সমাধান হিসাবে তিনি রাষ্ট্রায়ত্তকরণকে মেনে নেননি, কারণ তাতে শিল্পায়নের মজ্জাগত দোষ কাটবে না ব্যক্তি পুঁজিবাদ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদে পরিণত হবে।

ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বাপু এক নতুন পথের সন্ধান দিতে চেয়েছিলেন। তঁার দেখানো পথের মূল ভিত্তি দ্বন্দ্ব নয়, পারস্পরিক সহযোগিতা। তঁার চোখে– শিল্প সংস্থায় মালিক ও শ্রমিক দুই অঙ্গ। একের অন্যকে ছাড়া চলতে পারে না। পারস্পরিক এই সহযোগিতার ক্ষেত্রে কেউ-ই উচু না নীচু নয়। দু’জনই সমান অংশীদার এবং উভয়কেই অংশীদার হিসাবে পরস্পরের সহযোগিতায় শিল্পের উন্নতির দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
সেইমতো গান্ধীজির সূত্রে, মালিকরা মনে করবে তঁারা শ্রমিকের ‘অছি’, আর শ্রমিকরা মনে করবে তঁারা মালিকদের ‘অছি’। শ্রমিকের ভাল-মন্দর দায়দায়িত্ব মালিকদেরই নিতে হবে।

১৯১৮ সালে জানুয়ারিতে প্লেগের প্রকোপ কমায় আহমেদাবাদের কাপড়ের মিল মালিকরা প্লেগ বোনাস প্রত্যাহার করে নেয়।

অন্যদিকে মালিক শ্রমিকদের হাতে তঁার কারখানা সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দেবে– অর্থাৎ শ্রমিকদের উপরই কারখানার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে। গান্ধীজির শ্রমিক আন্দোলনের বুনিয়াদ দ্বন্দ্বের উপর প্রতিষ্ঠিত না হলেও প্রয়োজন হলে দ্বন্দ্বকে এড়িয়ে যেতে বলেননি। মালিক যখন ন্যায়বিচার করতে চায়নি, অথবা শ্রমিকের দাবির যৌক্তিকতা বিচারের ভার কোনও সালিশির কাছে ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি, অথবা উভয় পক্ষের ঠিক করা সালিশির দেওয়া রায়কে মানতে অস্বীকার করেছে– তখন মালিককে ন্যায়ের পথে আনতে গান্ধীজি দৃঢ়ভাবেই দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়েছেন, এবং সংগ্রামের পন্থা গ্রহণের পক্ষে উপদেশ দিয়েছেন। এমন মালিকের বিরুদ্ধে গান্ধীজি ধর্মঘটের পথে যেতেও বলেছেন।

যেমন, ১৯১৮ সালে জানুয়ারিতে প্লেগের প্রকোপ কমায় আহমেদাবাদের কাপড়ের মিল মালিকরা প্লেগ বোনাস প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু শ্রমিকরা ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে বেতন বৃদ্ধির দাবি তোলে। মিল মালিকরা শ্রমিকদের তা দিতে রাজি তো হলেনই না, এমনকী কোনও সালিশির কাছে যেতেও চাইলেন না। তখন গান্ধীজির পরামর্শে ১৯১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় মিল শ্রমিকদের ধর্মঘট। ধর্মঘট দীর্ঘ দিন চলায় শ্রমিকদের মনোবল ভাঙতে শুরু করে। আর্থিক চাপে কিছু শ্রমিককে মালিকের শর্তেই কাজে ফিরতে দেখা যায়। তখন শ্রমিকদের ন‌্যায্য অধিকারের সমর্থনে বাপু অনশনে বসেন।

গান্ধীজি এর আগেও অনশন করেছিলেন, কিন্তু তা করেছিলেন পরিবার এবং তঁার আশ্রমের অভ্যন্তরীণ কারণে। এটাই প্রথমবার তিনি কোনও বৃহত্তর সামাজিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনশনে বসলেন। বাপুর অনশন মিল মালিকদের উপরও চাপ সৃষ্টি করল। তঁার অনশনের ৪ দিনের মধ্যে মালিকরাও একটা মীমাংসার পথে যেতে বাধ্য হন। কিছু দিনের মধ্যেই শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করা হয়। শ্রমিক মালিক একে-অপরের ‌‘অছি’-তেই গান্ধীর নীতি শেষ হয়নি। তিনি আশঙ্কা করেন, শ্রমিক-মালিক জোট চাইলে সমাজকে শোষণ করতে পারে। তা আটকাতে বাপু চান মালিক ও শ্রমিক উভয়ে মিলে যেন সমাজের ‘অছি’ হিসাবে কাজ করে। যা সূচিত করে উৎপাদন-ব্যবস্থার তিনটি স্বার্থকে।

উৎপাদন ব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত করার বদলে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেছিলেন গান্ধী।

মালিকের স্বার্থ অধিক লাভ, আর শ্রমিকের স্বার্থ যতটা সম্ভব শ্রমের মূল্যবৃদ্ধি। সেক্ষেত্রে শ্রমিকদের চাহিদা মতো মজুরি-বৃদ্ধির পাশাপাশি মালিকের চাহিদা অনুযায়ী মুনাফা-বৃদ্ধির ফলে পণ্যের এমন মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে– যেটা ব্যবহারকারী বা ক্রেতার উপর বড় বোঝা হয়ে দঁাড়াতে পারে। যা কাম্য নয়। ক্রেতাদের কথা ভেবে শ্রমিক-মালিককে সমগ্র সমাজের ‘অছি’ রূপে কাজ করতে হবে। সমাজ তো মালিক-শ্রমিক-ক্রেতা তিনজনকে নিয়ে গঠিত। এই তিন গোষ্ঠীর স্বার্থ পৃথক এবং পরস্পরবিরোধী।

বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থায় যেসব দ্বন্দ্ব রয়েছে তার অন্যতম মূল কারণ এটাই। উৎপাদন ব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত করার বদলে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেছিলেন গান্ধী। আর সেখানে মহাত্মার চরকা-ভিত্তিক শিল্পোৎপাদন মালিক-শ্রমিক-ক্রেতা– এই তিনটি গোষ্ঠীকে মিলিয়ে দিয়ে– কমিয়ে দিয়েছিল স্বার্থের সংঘাত। এই অছিবাদের উদ্ভাবন করে মহাত্মা মানুষের ভাবাবেগ জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। রাজনীতি ক্ষেত্রেও তিনি সর্বদাই ‘হৃদয় পরিবর্তন’-এর কথা বলেছেন। ভাবাবেগ মানবসমাজের এক প্রধান কর্মপ্রেরণা। রাজনীতির আঙিনার বাইরেও অর্থনীতি থেকে শ্রমনীতিতে গান্ধী সেটারই প্রয়োগ বারবার করতে চেয়েছিলেন।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *