অমৃতা দে, দিনহাটা: ঢাকে কাঠি পড়তে আর বাকি মাত্র দশদিন। দিনহাটা শহরে জোরকদমে চলছে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। তবে, শহরের বেশিরভাগ পুজোমণ্ডপে রোশনাই, থিমের চাকচিক্য, আধুনিক ব্যান্ড ও ডিজে পার্টির বাড়বাড়ন্তে নিঃসন্দেহে শারদোৎসবের মেজাজটাই আমূল বদলে গিয়েছে। শহরবাসীর কথায়, আগে আড়ম্বর হয়তো এতটা ছিল না, কিন্তু পুজোয় একটা ‘প্রাণ’ ছিল। পাড়ায় পাড়ায় সন্ধ্যা নামলে শুরু হয়ে যেত মোমবাতি নেভানো, শঙ্খধ্বনি, ধাঁধা বা কুইজ প্রতিযোগিতা। আট থেকে আশি মণ্ডপে ভিড় জমিয়ে ওই খেলাগুলো দেখার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। প্রবীণরা পিঁড়িতে বসে হাসিঠাট্টা করতেন, নবীন প্রজন্ম অংশ নিত খেলায়— আক্ষরিক অর্থেই দুর্গাপুজো ছিল এক মিলনমেলা।
বর্তমানে শহরের বেশিরভাগ বিগ বাজেটের পুজোয় দর্শক টানতে থিমের ওপর নির্ভর করেন উদ্যোক্তারা। ঢাকের বোলকে ছাপিয়ে মাইকে বেশি বাজতে শোনা যায় ডিজে বা হিন্দি গান। আলোকসজ্জায় চোখে ঝিলমিল লেগে যায়। মণ্ডপের পাশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য মঞ্চ বাঁধা হয়। সেখানে বাইরে থেকে শিল্পীরা এসে অনুষ্ঠান করেন। পাড়ার লোক সেখানে উপস্থিত থাকেন বটে, তবে কেবল দর্শকের ভূমিকায়।
দিনহাটার এক পুজো কমিটির সভাপতি অনুপম রায় বলেন, ‘আগে আমাদের পাড়ায় সন্ধে নামলেই খেলা শুরু হত। ফুঁ দিয়ে মোমবাতির আগুন নিভিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ধাঁধা সমাধান- সব খেলায় পাড়ার মানুষ একসঙ্গে অংশ নিত। এখন আর এমন কিছু দেখা যায় না। কেবল থিম আর ডিজের দাপটে পুরোনো দিনের আনন্দ হারিয়ে গিয়েছে।’
নবীন প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের বেশিরভাগেরই দুর্গাপুজোকে নিয়ে মিশ্র অনুভূতি। শহরের এক কলেজ পড়ুয়া হিতশি রায় যেমন বললেন, ‘আমরা থিমপুজো, লাইভ শো, ইনস্টা রিল এসবই পছন্দ করি কিন্তু গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মোমবাতি নেভানোর খেলায় আরও বেশি মজা পেয়েছি। শহরে অন্তত একটা দিন পুজোয় এই সব খেলা আয়োজন করা হোক।’
শহরের উদ্যোক্তারা অবশ্য বলছেন, বিশাল করে পুজোর আয়োজন করতে ও দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে গিয়ে আর নানা ধরনের মজার খেলার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, গ্রামের কিছু পুজো কমিটি এখনও পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। দিনহাটার সাহেবগঞ্জ এলাকার আমরা ক’জন ক্লাবের দুর্গোৎসব কমিটির সভাপতি উজ্জ্বল তালুকদার জানান, তাঁদের ক্লাবে এখনও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দামি পুরস্কার না দেওয়া হলেও প্রতিটি গ্রামবাসী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন।
শহরের ব্যস্ততা, সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব ও পুজোর বাণিজ্যিকীকরণের ফলে একসঙ্গে শারদোৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াটা এখন আর সম্ভব হয় না। তাহলে শহরের পুজোয় কি আর কোনওদিন ফিরবে না পুরোনোদিনের সেই আবহ? উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে রয়েছে শহরবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত চাহিদার ওপর।
