নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিয়ে বরাবরই সরব তসলিমা নাসরিন। যার জেরে কম বিরাগভাজন হতে হয়নি লেখিকাকে। এমনকী বিতাড়িত হয়েছেন স্বভূম থেকেও। এবার পরীমণির পাশে দাঁড়িয়ে বিঁধলেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে।
বিগত পাঁচ বছর ধরে চলা ঢাকা বোট ক্লাব কাণ্ড মামলায় বৃহস্পতিবারই কোর্টে হাজিরা দিয়ে জামিন পেয়েছেন পরীমণি। অভিযোগ, ২০২১ সালে পরীমণি ও তাঁর সহযোগীরা সুযোগ বুঝে ঢাকা বোট ক্লাবে ঢুকে টাকা না দিয়েই মদ্যপান করতে চেয়েছিলেন। এমনকী বিনামূল্যে মদের বোতলও দাবি করে বসেছিলেন। কিন্তু ব্যবসায়ী নাসিরউদ্দিন মেহমুদ তাতে রাজি না হওয়ায় পরীমণি তাঁকে গালমন্দ করেন। বাকবিতণ্ডা একসময়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, নাসিরকে গ্লাস ও ফোন ছুড়ে মারেন নায়িকা। সেই প্রেক্ষিতেই ২০২২ সালে মামলা দায়ের করেছিলেন ওই ব্যক্তি। যার জেরে গোটা বাংলাদেশজুড়ে পরীমণির বিরুদ্ধে ছিছিক্কার পড়ে যায়। ‘মেয়েমানুষের মুখে গালিগালাজ’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন সভ্যমহলের একাংশ। সেপ্রসঙ্গেই এবার অভিনেত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে সুর চড়ালেন তসলিমা নাসরিন।
আরও পড়ুন:
“মেয়ে হলে কী করতে হবে? অপমান গিলে মুখে মধু মেখে বসে থাকতে হবে? গালি দেওয়ার অধিকারও কি পুরুষের একার? পুরুষ-শাসক বর্বর হতে পারে,…”

লেখিকার মন্তব্য, “পরীমণি গালি দিয়েছে বলে দেশ তোলপাড়। পুরুষের মুখে যে গালি শুনতে শুনতে কারও ভ্রু কুঁচকায় না, নারীর মুখে সেই গালি শুনলেই আঁতকে ওঠে সবাই । ‘মেয়ে হয়েও এমন নোংরা কথা!’ মেয়ে হলে কী করতে হবে? অপমান গিলে মুখে মধু মেখে বসে থাকতে হবে? গালি দেওয়ার অধিকারও কি পুরুষের একার? পুরুষ-শাসক বর্বর হতে পারে, নারী-শাসকও পারে। এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি। পুরুষ নৃশংস হতে পারে, হত্যা করতে পারে, নারীও পারে। পুরুষ ষড়যন্ত্র করতে পারে, নারীও পারে। পুরুষ পরকীয়া করতে পারে, প্রতারণা করতে পারে, নারীও পারে। মানুষের ভালো গুণগুলোর মতো খারাপ গুণগুলোও কোনও একটি লিঙ্গের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।”
“পুরুষ যা-ই করুক, নারীকে দেবী হয়ে থাকতে হবে। নারীকে সমান অধিকার পেতে হলে পুরুষের চেয়ে ভালো মানুষ হওয়ার পরীক্ষা দিতে হবে কেন?…”

এরপরই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রক্তচক্ষুকে নিশানা করে তসলিমা নাসরিনের সংযোজন, “নারী মানেই মমতাময়ী, সহনশীলা, পবিত্র, নিষ্পাপ— এই ছাঁচটিও পুরুষতন্ত্রের তৈরি। নারীর রাগ থাকবে না, ঘৃণা থাকবে না, মুখে কটু কথা থাকবে না। পুরুষ যা-ই করুক, নারীকে দেবী হয়ে থাকতে হবে। নারীকে সমান অধিকার পেতে হলে পুরুষের চেয়ে ভালো মানুষ হওয়ার পরীক্ষা দিতে হবে কেন? কোনও নারী অসভ্য হলে তার অসভ্যতার সমালোচনা করো। ‘মেয়ে হয়েও’ অসভ্য কেন, সেই প্রশ্ন তুলো না। নৃশংসতার বিচার করো নৃশংসতা হিসেবে, প্রতারণার বিচার করো প্রতারণা হিসেবে। নারী করেছে বলে বাড়তি অপরাধ, পুরুষ করেছে বলে সাত খুন মাফ — এই দ্বিচারিতা বন্ধ হোক। প্রজননে নারী ও পুরুষের কিছু জৈবিক পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্য কাউকে প্রভু, কাউকে দাসী বানানোর যুক্তি হতে পারে না। নারী আর পুরুষ সমান মর্যাদার মানুষ। অথচ রাষ্ট্র, সমাজ আর পরিবারের কত আইন, কত প্রথা এখনও পুরুষকে নারীর মাথার উপর বসিয়ে রাখছে! যোগ্যতা নেই, সততা নেই, মানবিকতা নেই — তবু শুধু পুরুষ বলে বাড়তি ক্ষমতা, বাড়তি স্বাধীনতা, বাড়তি ছাড়। পুরুষাঙ্গ থাকার সুবিধে ছাড়া এ আর কী?”
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
