সাম্প্রতিক নিট কেলেঙ্কারি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং কোটি কোটি তরুণ মেধার ভবিষ্যতের চরম বিপর্যয়। প্রতিবাদে পড়ুয়াদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগ নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক। এই বর্বরোচিত হামলা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। শিক্ষায় সংকট ও এই পুলিশি আক্রমণের জন্য কেন্দ্রের জবাবদিহি চেয়ে রাহুল গান্ধি পথে নামায় তাঁর ওপরও নেমে এসেছে রাষ্ট্রশক্তির দমনপীড়ন।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভ দেখানোর সময় রাহুলকে পুলিশ টেনেহিঁচড়ে, পাঁজাকোলা করে প্রিজন ভ্যানে তুলেছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতার সঙ্গে এই আচরণ নজিরবিহীন এবং নিন্দনীয়। বিরোধী দলনেতার পদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মর্যাদা আছে। সেই মর্যাদার তোয়াক্কা না করে সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন দিল্লি পুলিশের আচরণ দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর বড় আঘাত।
নিট কেলেঙ্কারি সামনে আসার পর রাহুল সহ সমগ্র বিরোধী শিবির বারবার সংসদে স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে বিরোধী শিবিরও সরব। দিল্লি পুলিশের আচরণের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’র জবাবদিহিও দাবি করেছেন বিরোধী দলনেতা। কিন্তু কেন্দ্র সমস্ত দাবিকে উপেক্ষা করে গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করছে।
এই উত্তপ্ত পটভূমিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে এনডিএ-র ‘মঙ্গলমিলন’ সভায় স্বীকার করেছেন প্রশ্নপত্র ফাঁস মহাপাপ। কিন্তু পড়ুয়াদের ওপর বর্বরোচিত লাঠিচার্জ ও নির্যাতনকে সন্তর্পণে এড়িয়ে গিয়েছেন। শিক্ষাবিদ ও জলবায়ু আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক এবং ককরোচ জনতা পার্টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে। ‘সংসদ চলো’ অভিযানেও ছিল ওই দাবি।
রাহুল জানিয়েছেন, তাঁর ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগের চেয়ে বড় বিষয় হল পড়ুয়াদের সমস্যা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট। প্রধানমন্ত্রীর উচিত, দেশের ছাত্রসমাজের কাছে ক্ষমা চাওয়া। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনও পড়ুয়াদের ওপর পুলিশের হিংসাত্মক আচরণের নিন্দা করেননি। পুলিশি দমনপীড়নকে একপ্রকার মৌন সম্মতি দিয়ে তিনি পালটা অভিযোগ করেছেন, এই আন্দোলনে উসকানি না দিয়ে শিশুদের সঠিক পথ দেখানো উচিত।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা করলেও পরিস্থিতি পালটায়নি। কেবল প্রতিবাদ বা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলেই শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সম্ভব নয়। সেজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রী যতই বলুন, তরুণ সমাজের ক্ষোভকে কেবল ‘উসকানি’ বলে দেগে দিলে মূল সমস্যার সমাধান হয় না।
বিরোধী দলনেতাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য বা ছাত্রীদের ওপর পুলিশের লাঠিচালনার ছবি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করেছে। নিট কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজপথে তৈরি পরিস্থিতিতে প্রায় সব বিরোধী দল পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ‘মহাপাপ’ যেমন ক্ষমার অযোগ্য, তেমনই মেধার দাবিতে সরব পড়ুয়াদের ওপর এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানো বিরোধী নেতাদের ওপর বলপ্রয়োগ সমানভাবে নিন্দনীয়।
দেশ গঠনে ছাত্রসমাজের স্বার্থে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থার পুনর্নির্মাণই এই মুহূর্তে একমাত্র কাম্য। অতীতে কৃষক আন্দোলনের সময় দেখা গিয়েছিল, কেন্দ্রীয় সরকার কার্যত উপেক্ষা করছে দেশের অন্নদাতাদের। শেষমেশ আন্দোলনের চাপে তিনটি কৃষি আইন কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। প্রায় একই ছবি দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ আন্দোলনের ক্ষেত্রে।
প্রশ্ন ফাঁস যদি মহাপাপ হয়, তাহলে সেই পাপক্ষালন করা কেন্দ্রের নৈতিক কর্তব্য। আন্দোলনকারীদের ডিপ স্টেট এজেন্ট, চিন-পাকিস্তানের দালাল বলে আক্রমণ করা কিংবা তাঁদের সমর্থনে সংসদে মুখ খোলা, রাজপথে সরব বিরোধীদের নিশানা করা গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকারের শোভা পায় না। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে গেলে প্রশ্ন করা, সমালোচনা এমনকি প্রতিবাদ দেখানোর অধিকারকে মান্যতা দেওয়া উচিত। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে বলপ্রয়োগে দমন করে সমস্ত দায় এড়ানো একেবারে অনুচিত।

