গৌতম সরকার
কিশোরকুমারের গাওয়া গানটা মনে আছে? … পুতুল নাচের পুতুল হয়ে/ নেচেই শুধু গেলি/ মনকে শুধা নাচার ফলে/ জীবনে কী পেলি…।
নেপালের দিকে তাকালে গানটার অর্থ নতুন করে কানে বাজে। বাংলাদেশও তারুণ্যের বিদ্রোহ দেখেছে। কিন্তু নেপালে নবযৌবনের জোয়ার নতুন মাত্রা পেল জেন জেড শব্দের ঝনঝনানিতে। কাঠমান্ডুর উদ্বেল চেহারাটা দেখে ভারতে, এই বাংলায় কত আকুতি শোনা গেল, এখানে কবে? এখানে কবে?
শুধু মতবিরোধ নয়, কোন্দল চরমে। বিপ্লবের কান্ডারিরা এখন যেন নৈরাজ্যের সেনাপতি। কাঠমান্ডুর রাস্তায় শুধু বচসা নয়, ভারত বা বাংলা ছাড়ুন, সেই কবের প্রত্যাশা কি পূরণ হল নেপালেও। কার হাতে যাবে স্বপ্ন-শাসনের জাদুকাঠি? হাতাহাতি-মারামারিতে যুক্ত তাঁরা। নতুন দেশ গঠনের ডাক দিয়ে পুরোনো শাসকদের রক্তাক্ত করেছিল যে জেন জেড, প্রধানমন্ত্রী বাছাই নিয়ে তাঁদের মধ্যে যা চলছে, তাতে বাংলায় তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি মনোনয়ন ঘিরে খণ্ডযুদ্ধ মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ক’দিন আগে বিজেপির কর্মকর্তা মনোনয়নের প্রতিবাদে শিলিগুড়িতে দলের কর্মীদের রোষ আছড়ে পড়েছিল জেলা দপ্তরে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেলা সম্পাদক নির্বাচন করতে না পেরে সিপিএমের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্মেলন অসমাপ্ত রাখতে হয়েছিল। নেপালে যেন তারই রেপ্লিকা। নতুন সংবিধান তৈরি করে স্বপ্নের দেশ প্রতিষ্ঠার নামে সদ্য বিদ্রোহের পর পাহাড়ি রাষ্ট্রটা এখন নৈরাজ্য দেখছে। যেমন নৈরাজ্য দেখেছে ভারতের আরেক প্রতিবেশী বাংলাদেশ।
মারদাঙ্গা, খুন, ধর্ষণে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় উন্মত্ত পদ্মা-যমুনার পাড়। বাস্তবে বাংলাদেশ বলুন আর নেপাল বলুন, বিদ্রোহের নামে যা ঘটেছে, তাকে নৈরাজ্য ছাড়া আর কিছু বলা যায় না! হ্যাঁ, নৈরাজ্যই! শেখ হাসিনার বাসভবনে লুটপাটের পর মহিলাদের অন্তর্বাস হাতে ঝুলিয়ে উল্লাসকে কি বিপ্লব বলা যায়! নেপালে লুটপাট, জেল ভাঙা, প্রাক্তন মন্ত্রীদের রাস্তায় ফেলে মার, মহিলা মন্ত্রীকে পর্যন্ত রেহাই না দেওয়া, রাজনৈতিক দল, দেশের প্রশাসনিক ভবনগুলিতে ভাঙচুর, আগুন তো চরম নৈরাজ্যেরই উদাহরণ।
নেপালের জেন জেড নেতৃত্ব সাফাই দিচ্ছে, বিদ্রোহে বহিরাগতরা ঢুকে গিয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। এখানেই আসে কিশোরকুমারের গানের সেই পুতুল নাচের কথা। বিদ্রোহ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বাছাইয়েও সুযোগসন্ধানীদের হাত। দূর থেকে কেউ পুতুল নাচালে স্বপ্নদ্রষ্টা ও ধান্দাবাজদের দ্বন্দ্ব তো নৈরাজ্যের চেহারা নেবেই। বাংলাদেশ, নেপালে পুতুল নাচের সুতো কার বা কাদের হাতে, যত দিন যাবে ক্রমশ স্পষ্ট হবে।
সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশে হাসিনার একনায়কতন্ত্র কিংবা নেপালে কেপি শর্মা ওলির দুর্নীতিরাজকে উচ্ছেদের লক্ষ্য ছিল নবযৌবনের। অনেক স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নকে ব্যবহার করেছে পুতুল নাচিয়ের দল। যত দিন যাবে, তত উপলব্ধি হবে কিশোরকুমারের গানের ভাষায়, ‘যখন ছিঁড়বে সুতো/ বুঝবি রে তুই/ আগুন নেভা ছাই… বন্ধ মনের অন্ধ হয়ে/ করলি কারে বরণ…।’ সুনির্দিষ্ট মতাদর্শের ভিত্তিতে বিদ্রোহ না হলে, বিদ্রোহের পেছনে সুসংহত নেতৃত্ব না থাকলে এবং পুতুল নাচের জাদুকরদের সুতো নাচানো থাকলে এই পরিণতিই হয়।
অন্যায়, কুশাসন, বৈষম্য, পক্ষপাতিত্ব, জীবিকা ও খাদ্যের সংকট, দুর্নীতিতে উজাড় হলে যে কোনও দেশে নবীন প্রজন্মের মধ্যে রাগ, ক্ষোভ, অসন্তোষ জমতে থাকা স্বাভাবিক। যা বিদ্রোহের চেহারায় ফেটে পড়তেই পারে। কিন্তু তাতে ইন্ধনের সুতো সুযোগসন্ধানী, বহিরাগত শক্তির হাতে থাকলে সেই বিদ্রোহ ক্রমে নৈরাজ্যে পরিণত হয়। বাংলাদেশ ও নেপাল সেই শিক্ষাই দিল।
অনেকের স্বপ্ন জাগছে, এবার তাহলে ভারতের, বাংলার পালা! সমাজমাধ্যমের পাতা, বিভিন্ন ব্লগ ভর্তি হয়ে যাচ্ছে সেই প্রত্যাশায়। পোস্টে পোস্টে বিদ্রোহের আগমনী সুর এই শরতেই। বিদ্রোহে অবশ্য সবসময় বসন্ত আসে না। ভারতে বা বাংলায় প্রত্যাশার আগে ভাবতে হবে চরিত্রগতভাবে বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে আমাদের কত ফারাক। এদেশেও জনকল্যাণের নামে ব্যক্তির, দলের কল্যাণের উদাহরণ আছে। আকাশছোঁয়া দুর্নীতি ও পক্ষপাত, রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম মিশিয়ে ভোটব্যাংক তৈরির মরিয়া চেষ্টা ইত্যাদি আছে বৈকি।
জনপরিসরে অসন্তোষ, রাগ, ঘৃণা ইত্যাদিও কম নয়। কিন্তু দেশের সংবিধান পালটে দেওয়ার কথা এখানে কেউ বলে না। সংবিধানকে আঁকড়ে এগোনোর কথাই বরং বলে সবাই। এমনকি, ও একসময় ‘এ আজাদি হ্যায় ঝুটা হ্যায়’ স্লোগান দেনেওয়ালারা বিপ্লবের ঝান্ডা ফেলে সংবিধান মেনে ভোটের পথে ক্ষমতা দখলে মরিয়া। যত ত্রুটি বা স্বৈরশাসনের ঝোঁক থাকুক না কেন, ভারতে গণতন্ত্রের শিকড় মানুষের মনের অনেক গভীরে।
ভারত বলুন কিংবা বাংলা অথবা অন্য কোনও রাজ্য, ভোট দিয়ে বদলে বিশ্বাসী বৃহৎ সংখ্যক মানুষ। কিছু মানুষ নিশ্চয়ই আছেন, যাঁরা মনে করেন ভোট দিয়ে আখেরে কোনও বদল ঘটবে না। তাঁরা হয় বন্দুক হাতে তথাকথিত মাওবাদী কিংবা কেরিয়ার সর্বস্ব মানসিকতায় নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত। মাওবাদীরা জনবিচ্ছিন্ন। আগের মতো সহানুভূতি, সমর্থন তাঁদের প্রতি নেই। কেরিয়ার সর্বস্বরা দেশের কথা ভাবেনই না।
বাকি রইল কিছু মৌলবাদী বা জঙ্গি। যারা সক্রিয় সন্দেহ নেই। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থাটাকে এড়িয়ে বড় অঘটন ঘটিয়ে ফেলা কঠিন। পুতুল নাচানেওয়ালারা ভারতকে ব্যবহার করতে চায় বৈকি। তবে ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক পথে। বিশৃঙ্খলা ঘটিয়ে বিদ্রোহ তৈরি করার মতো পরিস্থিতি এখনও তাদের নাগালে ততটা নেই। তাছাড়া দমনপীড়ন, কোণঠাসা করা ইত্যাদি চেষ্টা এদেশে শাসকের থাকলেও বিরোধী স্বর বাংলাদেশের মতো অত দুর্বল নয়।
ফলে জন অসন্তোষ কিছুটা জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পায় বিরোধী স্বরে। যাতে ক্ষোভের তীব্রতা কমে। বিদ্রোহের সম্ভাবনা ফিকে হয়।
