রূপায়ণ ভট্টাচার্য
ছোট করে ছাঁটা চুলগুলো একবারে সাদা। ছোটখাটো চেহারা। মধ্যবয়সিনী। তো তিনি যখন ‘ব্রেক ডিসি’ স্লোগান লেখা টি-শার্ট পরে হাজার হাজার মানুষের সামনে কথা বলছেন আমেরিকার রাজধানীতে, উচ্চারণ শুনলে বাঙালি মনেই হবে না।
অবাক হবেন না, তিনি বাঙালিনীই। কেয়া চ্যাটার্জি নাম। ওয়াশিংটনের নিরাপত্তার দায়িত্ব ট্রাম্প প্রশাসন স্থানীয় পুলিশের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ায় ক্ষুব্ধ সেখানকার নানা ভাষী মানুষ। ইংরেজি, স্প্যানিশে নানারকম স্লোগান লিখে আনা হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষকে শপথ নেওয়ালেন কেয়া। এক একটা করে বাক্য তিনি বলছেন। তা শুনে উচ্চারণ করছে জনতা। তিনবার বলা হল, ‘উই হ্যাভ নাথিং টু লুস বাট আওয়ার চেইনস।’ কার্ল মার্কস-এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর বহুচর্চিত শেষ লাইনটা।
বাংলার শিকল ভাঙার গান মনে পড়বে, মনে পড়বে অমর লাইন। শিকল ছাড়া আমাদের হারানোর কিছু নেই।
এই ধরনের কথা বলতে বলতেই আমেরিকার রাজধানীর রাস্তায় দু’দিন আগে নেমেছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। ট্রাম্প যে রেস্তোরাঁয় খাচ্ছেন, সেখানে পর্যন্ত ঢুকে স্লোগান দিয়েছেন জনা কয়েক মহিলা। প্যালেস্তাইন নিয়ে, ভেনিজুয়েলা নিয়ে।
নেপালে ক্ষিপ্ত জনতার তাড়া খেয়ে ক্যানালের জলে ঝাঁপ দিচ্ছেন উপপ্রধানমন্ত্রী, হেলিকপ্টারে বাড়ির ক’জনকে নিয়ে দড়ি ধরে ঝুলতে ঝুলতে পালাচ্ছেন আর এক ক্ষমতাবান নেতা। এসব দৃশ্য দেখে অনেকেরই সাফ দেশগুলোর চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মনে পড়ছে।
বাস্তব কিন্তু তা বলছে না। বাস্তব বলে, ইউরোপ-আমেরিকা সহ সব মহাদেশেই মানুষের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ চলছে। পৃথিবী মোটেই সুখী নেই। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির এক কবিতার লাইন সামান্য পালটে বলা যায়, ‘শান্তি? ওরে শান্তি কোথায় আছে, শান্তি কোথায় পাবি?’ মুক্তিও নেই, শান্তিও নেই।
বিক্ষোভের কারণগুলো এক এক জায়গায় এক এক রকম। আবার ইন্দোনেশিয়া থেকে স্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা থেকে উগান্ডা, ভারত থেকে থাইল্যান্ড– অনেক দেশেই প্রতিবাদের একটা কারণ সরকারের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি। এবং সেই প্রতিবাদের এক এক স্টাইল।
সেদিন জার্মানিতে উগ্র দক্ষিণপন্থী পার্টি এএফডি নেতা এলিস উইডেলের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন এক টিভি সাংবাদিক। এক পার্কে খোলা মঞ্চে। হঠাৎই দেখা গেল সেখানে একটি বাস পার্ক করা। সামান্য দূরে ওই পার্টির বিরোধী সমর্থকরা গান করছিলেন, স্লোগান দিচ্ছিলেন। এবং সেই গান বাসের মাইক্রোফোন মারফত ছড়িয়ে পড়ছিল গোটা পার্কে। উইডেল প্রকাশ্যে বলেন, তিনি লেসবিয়ান। তাঁর সঙ্গিনী শ্রীলঙ্কা জাত সারা বসার্ড। সারাকে দত্তক নিয়েছিলেন এক সুইস দম্পতি।
নেত্রী ভদ্রমহিলা ইন্টারভিউ দেবেন কী, তাঁর কোনও কথাই আর টিভিতে শোনাই যাচ্ছিল না ভালো করে। ইন্টারভিউ শুরু হয়ে গিয়েছে, ফলে আর থামানো যায়নি। ওই অবস্থায় শোনাতে হয়েছে। কিন্তু এলিসের অধিকাংশ কথাই মানুষ শুনতে পারেনি। শুনেছে গান ও স্লোগান।
প্রতিবাদ, বিক্ষোভ সত্যিই কত রকম হয়, আজ তা বিশ্ব টের পাচ্ছে।
লন্ডনে এই সপ্তাহে যে বিক্ষোভগুলো হতে চলেছে, তা বিষয় বৈচিত্র্যে চোখ টানবে। ক্ষুধার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে মিছিল। নার্সদের পক্ষে বিক্ষোভ। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তরুণদের পদযাত্রা। গ্রেট ব্রিটেনে ফ্রি স্পিচের দাবিতে মিছিল। এত বিষয় বৈচিত্র্য ভারতের কোন শহর দেখাবে?
নেপালে যখন লন্ডভন্ড করে দেওয়া হচ্ছে পার্লামেন্ট, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হোটেলে, ঠিক তখনই প্যারিসের রাস্তায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে হাজার হাজার মানুষ।
শুধু প্যারিস বলাটা ভুল, গোটা ফ্রান্স জুড়েই চলল প্রতিবাদ। বিক্ষোভকারীরা হাইওয়ে আটকে দিয়েছিল, পুড়িয়ে দিয়েছিল ব্যারিকেড। জলকামান দিয়ে তাদের থামিয়েছে ৮০ হাজার পুলিশ। এখানে প্রতিবাদ ছিল প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর নানা নীতি নিয়ে। ম্যাক্রোঁ তাঁর প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী করায় আরও রাগ মানুষের। প্রতিবাদের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ব্রেক দ্য ব্যারিয়ার’।
ফ্রান্সে তো বিক্ষোভ লেগেই রয়েছে, কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রের পক্ষে ইদানীং সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ ইউরোপ দেখেছে সার্বিয়ায়। ওখানে আবার সরকার এবং সরকার বিরোধী জনতার মধ্যে সংঘর্ষ লাগছে বারবার। বিভিন্ন শহরে। এ পক্ষ ও পক্ষকে আক্রমণ করছে বাজি, পাথর, কাচ দিয়ে।
লন্ডনের গার্ডিয়ান কাগজে এ নিয়ে সরকার বিরোধী কড়া সম্পাদকীয় বেরোনোর পর সার্বিয়ান প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ নিজে চিঠি লিখেছেন সেই কাগজে। এমনটা সচরাচর হয় না। সচরাচর কেন, কোনও দিনও এরকম শুনিনি যে, বিদেশি প্রেসিডেন্ট অন্য দেশের কাগজে প্রতিবাদে চিঠি পাঠাচ্ছেন। প্রেসিডেন্টের যুক্তি, গত ৯ মাস ধরে তেইশ হাজার বেআইনি মিছিল বেরিয়েছে সার্বিয়ায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশকে আক্রমণ করা হচ্ছে। তবু পুলিশ নাকি কিছু করেনি। বাস্তব বলছে ছবিটা অন্য।
অ্যান্টিট্যুরিজম প্রোটেস্ট— এই শব্দটা কি আগে শুনেছেন? পর্যটকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখাতে গিয়ে গত এপ্রিলে মাদ্রিদ, বার্সেলোনা সহ স্পেনের ৪০টি শহরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে জনতা। তাঁদের বক্তব্য, পর্যটকরা আসায় গণহারে দাম বেড়ে যাচ্ছে। বাড়িঘর ও রোজকার খরচ বৃদ্ধি, পরিবেশের দুর্দশা নিয়েই তাদের বেশি ক্ষোভ। এই ক্ষোভ শেষপর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে ইতালি বা পর্তুগালে। এমনকি মেক্সিকোতেও। ট্যুরিজম প্রোটেস্ট নিয়ে একটা কথা চালু হয়েছে এখন। সেটা এই কারণেই।
ভেনিস শহরের এক তরুণী শিক্ষক মার্তা সত্তরোভার গল্প বলা যাক। তাঁর ইন্টারভিউ পড়েছিলাম ক’দিন আগে। অ্যামাজনের মালিক জেফ বেজোস যখন বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন ভেনিসে। মার্তা ভেনিসকে বাঁচানোর জন্য নানাভাবে প্রতিবাদ করেন। তাঁর প্রতিবাদেই ভেনিসের বিখ্যাত লেগুনে ঢুকতে পারেনি বড় বড় জাহাজ। কোটিপতি বিদেশিরা রাজকীয় টেন্ট ব্যবহার করতে পারেননি। এই মার্তাই প্রশ্ন তোলেন বেজোসের রাজকীয় বিয়েতে কীভাবে ক্ষতি হচ্ছে ভেনিসের পরিবেশের। ১১ বছর আগে ভেনিসেই বিখ্যাত অভিনেতা জর্জ ক্লুনির বিয়ে নিয়ে হইচই হয় খুব। তখন মানুষ ছিল ক্লুনির পক্ষে। এবার বেজোস ছিলেন ভিলেন। মার্তার প্রতিবাদ সংগঠনের ফলে।
অনেকের মনে থাকতে পারে, গত দু’বছরে ইউরোপের কতগুলো জায়গায় কৃষকরা ট্র্যাক্টর নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। ফ্রান্সকে ছেড়ে দিন, এখন সেটা বিক্ষোভেরই দেশ। ফরাসিদের পাশাপাশি জার্মানি, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, স্পেন, ইতালি ও নেদারল্যান্ডস– সব দেশের কৃষকরাই ছিলেন বিক্ষোভে।
ইউক্রেন যে ইউক্রেন, যুদ্ধে বিধ্বস্ত সেখানে পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ সম্প্রতি যোগ দেন মিছিলে। জেলেনস্কি ক্ষমতায় আসার পর এত বড় ধরনের বিক্ষোভ এই প্রথম। যা মনে করিয়ে দিচ্ছিল ইউক্রেনের ‘অরেঞ্জ প্রোটেস্ট’কে। এখানেও কিন্তু দুর্নীতির প্রসঙ্গ জড়িয়ে। ওদেশে দুর্নীতি আটকানোর জন্য দুটো স্বাধীন সংস্থা ছিল। জেলেনস্কি সরকার করছিল কী, তাদের সরকারি আওতায় এনে ফেলেছিল। তাতেই খেপে যায় মানুষ। শেষপর্যন্ত জনগণের চাপে সিদ্ধান্ত পালটাতে হয়েছে জেলেনস্কিকে।
নেপালে ‘নেপো কিড’দের বিরুদ্ধে খেপে উঠেছিল জনতা। ইন্দোনেশিয়ায় খেপে ওঠার কারণ ‘কোরাপ্ট এলিট’রা। দুর্নীতিতে ভিতরে ভিতরে ফুঁসছিল মানুষ। এর মধ্যে সরকার পার্লামেন্ট সদস্যদের মাইনে বিশাল করে দেয়। যা ইন্দোনেশিয়ার ন্যূনতম মাইনের তুলনায় ১০ গুণ। প্রতিবাদে বিক্ষোভে নেমেছিল মানুষ। তার মধ্যে পুলিশের গুলিতে একজন মারা যাওয়ায়
খেপে যায় জনতা।
আফ্রিকা? সেখানে এখন সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের নাম কেনিয়া। গতবার সেখানে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল সরকার কর বাড়ানোয়। এই জুন থেকে প্রতিবাদ এভারেস্টে ব্লগার আলবার্ট ওজওয়াংয়ের নিহত হওয়ার ঘটনায়। অধিকাংশেরই ধারণা, সরকারই মেরে ফেলেছে তাঁকে।
ওদিকে আবার মোজাম্বিকে চলছে নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে প্রতিবাদ। অ্যাঙ্গোলায় বেকারত্ব, পেট্রোলের দাম বাড়ানো। কঙ্গোতে পূর্বদিকে অশান্তির আগুন। ইথিওপিয়ায় সংবিধান পালটানো, উগান্ডায় দুর্নীতি নিয়ে মানুষ সোচ্চার।
লাতিন আমেরিকায় আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, পেরু— কোথায় মানুষ খুশি? বিক্ষোভ তো সর্বত্র। ইস্যু হয়তো আলাদা। কোথাও রাজনৈতিক অস্থিরতা, কোথাও আর্থিক অস্থিরতা। কোথাও নির্বাচনে কারচুপি, কোথাও সামাজিক পরিবর্তন বা ক্রাইম নিয়ে লোকের রাগ তীব্র।
ব্রাজিলে সব বিতর্কের কেন্দ্রে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বলসোনারো। দুর্নীতির দায়ে, অভ্যুত্থান চেষ্টার দায়ে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে জেলে পাঠিয়েছে। ঝামেলা চলছে বলসোনারো বিরোধী ও ভক্তদের। আর একটা ইস্যু মানবাধিকারের। বলা হচ্ছে, গত দু’বছরে মেরে ফেলা হয়েছে ৩০৬০ জন মহিলা ও কিশোরীকে।
পেলের দেশে যখন এসব নিয়ে উত্তেজনা, তখন মারাদোনার দেশে মার্চ থেকে চলছে তুলকালাম। পেনশন কম বলে পথে নেমেছেন প্রবীণরা, ফুটবল ক্লাবগুলোর ম্যাচে লাগাতার ঝামেলা চলছে পুলিশের সঙ্গে। এখন প্রেসিডেন্ট মিলেইয়ের বোন এবং কিছু ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ। একটা বিল নিয়ে রাস্তায় অশান্তিতে পুলিশ গুলি পর্যন্ত চালিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন নিয়েও চলছে তুমুল গণ্ডগোল।
যা বুঝছি, তাতে চিন-উত্তর কোরিয়া-রাশিয়া-আরব রাষ্ট্রগুলোর মতো কিছু দেশ, যেখানে ঘরের আসল খবর কিছুতেই বাইরে যায় না, সে সব দেশ ছাড়া সব জায়গাতেই কিছু না কিছু বিক্ষোভ চলছে এখন। দক্ষিণ কোরিয়াতে মাস পাঁচেক আগে রাস্তায় জনস্রোত নেমেছিল প্রেসিডেন্টকে আদালত ইমপিচ করার পর। এখন চলছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। হুন্ডাইয়ের তিনশো শ্রমিককে আমেরিকায় আটকে দেওয়ায়।
বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম প্রতিবাদ কী? স্পষ্ট ধারণা দেওয়া কঠিন। খ্রিস্টপূর্ব ১১৭০ সালে মিশরে তখন কবর তৈরির কাজ চলছিল। সেই সময় এক শ্রমিক অর্থ না পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। তারও আগে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ইহুদিদের বিপ্লব ঘটেছে। ১৩৮১ সালে আবার ইংল্যান্ড দেখেছিল কৃষকদের বিদ্রোহ।
সেই সময়ের পৃথিবী কিন্তু আজকের মতো এত জটিল ছিল না। এত প্রতিবাদীও ছিল কি? মনে তো হয় না!
