গৌতম সরকার
খগেশ্বর রায় বিদ্রোহে ইতি টেনেছেন। সৌরভ চক্রবর্তী দলের ডাকা সভায় মঞ্চ আলো করে বসেছেন। আবদুল করিম চৌধুরী কার্যত লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছেন নিজেকে। রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে নেই। ইংরেজবাজার পুরসভার বাইরে কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরীর আর কর্মজগৎ নেই। তৃণমূল নেতার পরিচিতি ছাপিয়ে তিনি যে িনছক ইংরেজবাজার পুরসভার চেয়ারম্যান। তজমুল হোসেন বলেই দিয়েছেন, তাঁকে টিকিট না দেওয়ার ফল দলকে ভুগতে হবে।
এঁদের কাউকে এবার প্রার্থী করেনি তৃণমূল। সেজন্য প্রথমে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল। এখন কোথাও তাতে ভাটা পড়েছে! কোথাও ধিকিধিকি জ্বলছে! কোথাও আশ্বাসবাণীতে ক্ষোভের আগুনে জল পড়েছে। আবার বিদ্রোহে স্বার্থ রক্ষা কঠিন জেনে কেউ কেউ নিজেদের গুটিয়ে নিয়েেছন। অনেকের নানা স্বার্থ জড়িত। জমির কারবার, বালি-পাথর-কয়লার ব্যবসা, পঞ্চায়েতের কাটমানি, ঠিকাদারি ইত্যাদি। দলের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে চুকিয়ে দিলে এসব চালানো কঠিন।
রাজগঞ্জের বিধায়ক খগেশ্বরের আমূল ভোল বদলে ফেলা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। তাঁকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তাঁর অনুগামীরা কার্যত সেদিন ‘বাবু যত বলে, পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ’ অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতে তাঁদের মুখে শোনা গেল, শত হলেও তো আমরা তৃণমূল গোছের সুর। মুখ্যমন্ত্রী খগেশ্বরকে রাজগঞ্জের অভিভাবকের দায়িত্ব দেওয়ায় অন্তত মুখরক্ষার ঢাল পাওয়া গেল।
প্রশাসননির্ভর দল পরিচালনার ফল কী হতে পারে, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল জমানায় সরকারি অফিসারদের একাংশকে কার্যত ভোট ম্যানেজার বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কে দায়িত্বে থাকলে তৃণমূলের ‘অস্বস্তি’ হবে না, সেটা বুঝে পোস্টিং দেওয়া হত। ভোট ম্যানেজারের পাশাপাশি কিছু অফিসার বিরোধী দল তো বটেই, তৃণমূলের অন্দরের বিক্ষোভটাও সামলে দিতেন। নির্বাচন ঘোষণার আগে কয়েক দফায় পুলিশ ও প্রশাসনে নবান্নের তরফে ব্যাপক রদবদলে একই অঙ্ক ছিল।
সেই পরিকাঠামোর গোড়ায় কার্যত কুঠার চালিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রশাসন ও পুলিশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাজানো বাগানে মত্ত হাতির তাণ্ডব চালিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ফলে দলের মধ্যে ডিগবাজিটা এখন সামলানোও সমস্যা। একা দলনেত্রী ক’জনকে সামলাবেন! দলের প্রথম দিনের সৈনিক রবীন্দ্রনাথ নীরব থাকলেও কোচবিহারে তাঁর বাহিনী এখন রণংদেহি মেজাজে। সেই বাহিনীকে দিয়ে ঘাসফুল প্রতীকে ভোট দেওয়ানো সম্ভবত শিবেরও অসাধ্য। যদি বা কোথাও তারা বাধ্য হয়, তবে সেটা হবে নিছক নিয়মরক্ষা।
রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘদিনের সঙ্গী খোকন মিয়াঁ যে মেজাজে চলে গিয়েছেন, সেখান থেকে তাঁকে ফেরানো কঠিন। কোচবিহারে এমনিতেই পদ্মফুলের চাষ বেশি। তৃণমূলের এই বিদ্রোহ সেই জমিতে সার জোগালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ইসলামপুরের করিম নিজে আড়ালে থাকলেও তাঁর অনুগামীরা ক্ষুব্ধ বললেও কম বলা হয়। করিমকে টিকিট না দেওয়াকে তাঁরা মুসলিম সমাজের অপমানের সঙ্গে তুলনা করে প্রচার করছেন।
এই মানসিকতা থাকলে করিমের অনুগামী ও সমর্থকদের আঙুল ইভিএমে জোড়াফুলের বোতাম পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না সন্দেহ। হরিশ্চন্দ্রপুরের তজমুল হোসেন তাঁকে প্রার্থী না করার ফল দলকে ভুগতে হবে যে হুমকি দিয়ে রেখেছেন, তা বাস্তবায়িত করলে তৃণমূলের মুসলিম সমর্থকদের ভোট দু’ভাগ হবে। ওই কেন্দ্রে তৃণমূল অন্য একজন মুসলিমকে প্রার্থী করেছে। নেতাদের যদিও বা সামলানো যায়, তাঁদের বাহিনী কথা শোনার পাত্র নয়।
দাদা বা দিদিকে প্রার্থী করেনি তো জোড়াফুলকে নির্বংশ করে দেব- প্ল্যান এখন বিক্ষুব্ধ বাহিনীর মাথায় গেড়ে বসে আছে। এরপর কি মনে হয়, দলের প্রতি কারও ভালোবাসা আছে! কিংবা নিজের হাতে দল গড়েছেন বলে কোনও দরদ আছে! দেখা যাচ্ছে, যত প্রেম সব পদের সঙ্গে। তবে দলের পদ নয়! জনপ্রতিনিধিত্ব চাই। আপাতত বিধায়কের পদই লক্ষ্য। বিধানসভা নির্বাচনের টিকিট না পেলে কীসের দল!
গত ১৫ বছরে অধিকাংশ নেতার ছত্রছায়ায় তৈরি হওয়া এরকম অনেক বাহিনীর আনুগত্য দল নয়, ধান্দার দিকে। প্রোমোটারি-ঠিকাদারি, বালি-পাথর পাচার, চোরাই গোরুর কারবার, লাইসেন্স বা নানা সুযোগসুবিধা দিয়ে কাটমানি ইত্যাদি সুযোগ যদি না-ই থাকে, তবে দলের প্রতি আনুগত্য ধুয়ে জল খেয়ে তো লাভ নেই। আর এসব অবাধে করতে হলে কোনও না কোনও নেতার ছত্রছায়া চাই। যিনি পুলিশ, প্রশাসন ইত্যাদি ‘ঝুটঝামেলা’ প্রয়োজনে সামলে দেবেন।
সেই নেতার তাই ক্ষমতা থাকা চাই। জনপ্রতিনিধি না হলে সেই ক্ষমতার হকদার হওয়া যায় না। সে পঞ্চায়েত বা জেলা পরিষদের কর্মকর্তা হোন বা সাংসদ-বিধায়ক- পদ একটা লাগবেই। বিধানসভা নির্বাচন সামনে বলে সব নজর এখন বিধায়ক পদের দিকে। বিদ্রোহ যাঁরা করছেন, তাঁদের অনেকের তৃণমূলের তকমাটা চাই। তাই ফোঁস করে আবার ফণা নামিয়ে নিচ্ছেন। তবে যাঁদের মনে হচ্ছে, কোনও আশা আর নেই, তাঁরা দলকে ছোবল মারার জন্য তৈরি হচ্ছেন।
এদিকে, মমতার পুলিশ-প্রশাসনে কমিশনের লন্ডভন্ড কাণ্ড সমানতালে চলছে। কাউকে তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ বলে সামান্যতম সন্দেহ হলে তৎক্ষণাৎ বিদায় করে দেওয়া হচ্ছে। সন্দেহবাতিক এমনই যে, কমিশন নিজের নিয়োগ করা আধিকারিককে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে সরিয়ে দিচ্ছে- এমন উদাহরণও আছে।
আনুগত্য সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সংশয় হলে একইভাবে মুখ্যমন্ত্রীর খাঁড়া নামত পুলিশ, প্রশাসনে। হয়তো সেই অফিসার বিরোধী দলের ঘনিষ্ঠ নয়, কিন্তু কিছুটা স্বাধীনচেতা বা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। তাতেও রেহাই ছিল না। কমিশন সেই খোলনলচে বদলে দেওয়ায় তৃণমূল এখন ঘরে-বাইরে চরম বিপদে।
