মৈনাক কুন্ডা
এ রাজ্যে চোলাই খেয়ে মরলেও ফ্যামিলি অ্যাসিস্ট্যান্স জোটে। কমিউনিটি অ্যাসিস্ট্যান্স বরাদ্দ হয় দুর্গাপুজোয় টুইস্ট করার জন্য। ধর্মনিরপেক্ষ খয়রাতি— ইমাম, পুরোহিত দু’পক্ষকেই ভাতা। ১৯৪৭-২০১১ এই সময়কালে রাজ্যের ঋণ ছিল ১ লক্ষ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১১-’২৪ এই সময়কালে রাজ্যের ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকা। রাজ্যের অর্থ দপ্তরই এই তথ্য জানাচ্ছে। ঋণের রকেটগতির বৃদ্ধি দুটো বিষয় বলছে। এক, রাজ্যের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে আয় বৃদ্ধি তাল রাখতে পারছে না। ঋণ বৃদ্ধির অর্থ সুদ বাবদ বেশি বেশি অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং রাজ্য প্রয়োজনীয় ব্যয় করার ক্ষমতা হারাচ্ছে। মূলধনি ব্যয় করতে পারছে না রাজ্য। এমনকি রেভেনিউ এক্সপেন্ডিচারও পারছে না। সঙ্গে লাগামছাড়া দুর্নীতি। যার বিষফল দেখা যায় সর্বত্র। উন্নয়ন আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এগোতে পারছে না। কর্মসংস্থানের অভাব প্রকট। যে কোনও দিন বিবেক এক্সপ্রেসে স্লিপার ক্লাসের যাত্রী হলেই হল। কাজের খোঁজে গাদাগাদি করে রোজ দক্ষিণে পাড়ি জমাচ্ছে এই রাজ্যের যৌবন। জেনারেলে তিলধারণের জায়গা থাকে না। কাজের সুযোগের নিরিখে অসম আজ বাংলার উপরে অবস্থান করছে। ভারত সরকারের অর্থ দপ্তর ২০১১-’২৪ এই সময়কালে মাথাপিছু বার্ষিক আয় বৃদ্ধির হারের পরিসংখ্যান সামনে এনেছে। ওডিশা, অসমে এই হার ৩১০ শতাংশের বেশি, পশ্চিমবঙ্গে ২২৬ শতাংশ মাত্র। ভাতার অর্থনীতি, ১০০ দিনের কাজ বন্ধ, মাইক্রো ফিন্যান্সের থাবায় আক্রান্ত পরিবারে নিশ্চয়ই কিছু সাহায্য করছে। যাঁদের প্রতি সকালের করুণ আর্তি থাকে ‘নিভন্ত ওই চুল্লিতে মা একটু আগুন দে’ তাঁদের হয়তো কোনও কোনও দিন সাহায্য হয়। কিন্তু দিন-প্রতিদিনের লড়াইয়ে সরকারি নীতি কোনও স্থায়ী সাহায্যে আসে না।
নেগেটিভ ইনকাম ট্যাক্স
রিচার্ড নিক্সন জন্ম দিয়েছিলেন ‘ফ্যামিলি অ্যাসিস্ট্যান্স প্ল্যান (এফএপি)’-এর ধারণার। প্রেসিডেন্ট নিক্সন রাজনীতির ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছেন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জন্য। ২৪৭ বছরের আমেরিকার ইতিহাসে ৪৭ জন রাষ্ট্রপতির মধ্যে একমাত্র নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। সেটা ১৯৭৪ সাল। তাঁর প্রস্তাবিত এফএপি বলেছিল যে কর্মজীবী পরিবারের আয় নির্দিষ্ট সীমার নীচে, শিশুসন্তান থাকবে, সেই পরিবারে প্রাপ্তবয়স্ক মা-বাবা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই সন্তান মিলে চার জনের পরিবার সরাসরি ২৪০০ ডলার ক্যাশ বা চেক পাবে সরকারের তরফে। ভারতীয় টাকায় বর্তমানের হিসাবে তা দুই লক্ষ ষোলো হাজার টাকা। নিক্সন সেই প্রস্তাব শেষপর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেসে পাশ করাতে পারেননি। কিন্তু এই প্রস্তাব মার্কিন জনগণেশের হৃদয় জিতে নিয়েছিল। ৭২-এর নির্বাচনে মানুষের সমর্থন তাঁকে এনে দিয়েছিল ৬১% ভোট। আধুনিক বিশ্বে সর্বপ্রথম ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (ডিবিটি) ধারণার জনক প্রেসিডেন্ট নিক্সনই। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যানের তত্ত্ব ছিল নেগেটিভ ইনকাম ট্যাক্সের। যার আয় বেশি সে কর দেবে সরকারকে। যার আয় কম তাকে সরকার অর্থসাহায্য করবে। নিক্সন তাকে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। সরাসরি উপভোক্তার কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। আজ ৫০ বছর পর ভারতবর্ষের বুকে সুনামির মতো আছড়ে পড়েছে নতুন নতুন চেহারায়, নতুন নতুন নামে। সেই প্রথম নির্বাচনি বিশেষজ্ঞরা দেখেছিলেন সরকারি তহবিলে সরাসরি ভোটারের পকেট ভরলে ভোটবাক্সে ম্যাজিক ঘটে যায়।
বিহার : দশ হাজারে ২০০ পার
নিক্সন ফেল করেছিলেন! এই ধারণাটির উপর মেক-ইন-ইন্ডিয়া ছাপ যখন পড়ল রূপকাররা পেতে শুরু করলেন লেটার মার্কস! কে বলে কিছুদিন রাজপাট চালালেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার চাপে শাসনক্ষমতা হাতছাড়া হয়? এখনকার শাসকরা ডিবিটি-র ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগে বারবার কুর্সি হাসিল করছেন ইদানীংকালে! সর্বশেষ উদাহরণ বিহার! বিরোধীদের জনসভায় ভিড় ক্রমবর্ধমান। ভোটের মাত্র তিন মাস আগে নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা চালু করলেন। ‘আত্মনির্ভর নারী, সশক্ত বিহার’! এক সুচিন্তিত রাজনৈতিক বাজি। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ — নবরাত্রির দিনে — দেবীর আশীর্বাদের মতোই ১.৫ কোটি মহিলার ব্যাংকে পৌঁছে গেল ১০,০০০। ভোটের আগে পেনশন বাড়ল, বিদ্যুৎ বিনামূল্য হল, মোট ডিবিটি খরচ দাঁড়াল ৪০,০০০ কোটি টাকা। এত কম সময়ে এত বড় অঙ্কের ডিবিটি স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষ দেখেনি। ফলাফল? বিহারে ভোটের হার ছিল বিহারের ইতিহাসে রেকর্ড! মহিলারা ঢেলে ভোট দেন। ভোটদানে পাটনা বাদে ৩৮ জেলার ৩৭টিতে মহিলারা এগিয়ে, এনডিএ পায় ২০০-এরও বেশি আসন। নিক্সন এফএপি দিয়ে দারিদ্র্য দূর করতে চেয়েছিলেন — নীতীশ সেই একই হাতিয়ার দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখলেন।
রাজীবের জমি, মোদির মাঠ, খেলছেন মমতা
সরাসরি উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকিয়ে দেওয়ার ট্রিগার টিপে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, অসম, কর্ণাটক ইত্যাদি নানা রাজ্যে ক্ষমতাসীনরা বিরোধীদের কুপোকাত করেছেন। নিঃসন্দেহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার মধ্যে চ্যাম্পিয়ন। ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন রাজীব গান্ধি। খরাপীড়িত কালাহান্ডি পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষুধার মহামারি দেখে প্রধানমন্ত্রী খেদোক্তি করেন, সরকার যে টাকাগুলো খরচ করে জনকল্যাণে তার মাত্র ১৫ পয়সা পৌঁছায় প্রকৃত উপভোক্তার কাছে। পরবর্তীতে ভিজিলেন্স কমিশনার বলেন, বাকি ৮৫ পয়সার ৪০ পয়সা যায় প্রশাসনিক ব্যয়ে এবং ৪৫ পয়সা যায় দুর্নীতিগ্রস্তদের পকেটে। কেন্দ্রীয় স্তরে চিন্তাভাবনা শুরু হয় কীভাবে এর সংশোধন করা সম্ভব। ডঃ মনমোহন সিং–এর সময়ে শুরু হয় পাইলট প্রোজেক্ট অন্ধ্রের কয়েকটি জায়গায়। নরেন্দ্র মোদি এর ব্যাপ্তির জন্য প্রথমে দেশজুড়ে জন-ধন যোজনার পাসবই খোলান। এবার শুরু হয় ভোজবাজি। আধার সংযুক্ত পাসবই, আধারভিত্তিক উপভোক্তা লিস্ট। লিস্ট মেলাও। এক ক্লিকে সরাসরি সরকারি টাকা উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে। এই প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে সর্বপ্রথম মমতা ফসল তোলেন ২০১৬-র নির্বাচনে। সৌজন্যে শিক্ষাশ্রী, কন্যাশ্রী প্রকল্প। সারদা, নারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে বাজার গরম হয়েছে। মন্ত্রী-সান্ত্রিরা জেলে-বেলে থেকেছেন, টিভির পর্দাজুড়ে মন্ত্রী, এমপি-রা ঘুষ নিয়েছেন। ভোটবাক্সে এগুলো কোনও আঁচড়ই কাটতে পারেনি। তারপর এর ব্যাপ্তি ঘটেছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী ভরপুর ফায়দা কুড়িয়েছেন ২০২১-এ।
প্রয়োজন আত্মসমীক্ষা
কেন্দ্রের আর্থিক সমীক্ষা ও রিজার্ভ ব্যাংকের পরিসংখ্যান কিন্তু এক রূঢ় বাস্তবকে সামনে আনছে— উন্নয়নের দৌড়ে পশ্চিমবঙ্গকে ক্রমশ পিছনে ফেলে দিচ্ছে প্রতিবেশী ওডিশা ও অসম। আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে শুরু করে দারিদ্র্য দূরীকরণে ওডিশা, অসমের ঝোড়ো ব্যাটিং বাংলার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। লগ্নির খরা আর শিল্পায়নের অভাব যেখানে বাংলার শিরদাঁড়াকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে, সেখানে ওডিশা ও অসম দেশের মানচিত্রে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। উদ্বেগের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের ঋণের ভার উত্তরোত্তর বেড়ে চলায় ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। সময় এসেছে আত্মতুষ্টি ছেড়ে এই সত্যটা স্বীকার করে নেওয়ার, নচেৎ ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্রে বাংলা কেবল এক অতীত গৌরব হয়েই থেকে যাবে।
(লেখক শিক্ষক)
The publish খয়রাতির রাজনীতিতে ভয়ের ছবিটা স্পষ্ট appeared first on Uttarbanga Sambad.
