নাজেহাল কমিশন, দিশেহারা পদ্ম শিবির

নাজেহাল কমিশন, দিশেহারা পদ্ম শিবির

শিক্ষা
Spread the love


আশিস ঘোষ 

হিসেব কিছুতেই মিলছে না। যত দিন যাচ্ছে, এসআইআর নিয়ে বেশ হতাশ হয়ে পড়ছে পদ্ম শিবির। গত দেড় মাস ধরে নানাভাবে চেষ্টা করেও বিষয়টা বাগে আনতে পারেনি। উলটে বিরোধী নেতার কথামতো ভোটার তালিকা থেকে পাঁচ শতাংশ বাদ কিংবা জোড়া বেশ কঠিন। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ ইত্যাদি করেও অন্তত সাদা চোখে ধরা পড়ছে না।

ফলে এখন নির্বাচন কমিশনের উপর গোসা হয়েছে বিজেপির বঙ্গ নেতাদের। তাঁরা এখন আবদার জুড়েছেন, দিল্লিতে বসে না থেকে বাংলার রাস্তাঘাট ঘুরে এসআইআর করুক কমিশন। তাঁদের আর্জিমতো নানা কিসিমের পর্যবেক্ষকের পাশাপাশি কমিশন এখন প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্র পিছু একজন করে বিশেষ পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে। অর্থাৎ ২৯৪ জন। আশপাশের রাজ্য থেকে তাঁদের জড়ো করা হচ্ছে।

দিনকয়েক আগেই এক ডজন রোল অবজার্ভার পাঠিয়েছিল কমিশন। তারও আগে রাজ্যের পাঁচ ডিভিশন- প্রেসিডেন্সি, মেদিনীপুর, বর্ধমান, মালদা এবং জলপাইগুড়ির জন্য স্পেশাল অবজার্ভার পাঠানো হয়েছে। ইআরও-দের উপর নজরদারির জন্য প্রথমে স্পেশাল রোল অবজার্ভার, তারপর রোল অবজার্ভার আর মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে। এ যেন হাল্লা চলেছে যুদ্ধে যাতে একজন রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি ঘুসপেটিয়াও লিস্টে ঢুকে না পড়ে।

গেরুয়া শিবিরের যে নেতারা এই সেদিনও গলা ফাটিয়ে এক কোটি, দেড় কোটি রোহিঙ্গা, অনুপ্রবেশকারীকে ভোটার লিস্ট থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার কথা বলছিলেন, সেই তাঁরা কেমন যেন ঠান্ডা মেরে গিয়েছেন। যত দিন গড়াচ্ছে, তত এক-দেড় কোটির হিসেবটা গুলিয়ে যাচ্ছে। বরং দেখা যাচ্ছে, বেশি বাদ পড়তে চলেছেন হিন্দুরাই। টলোমলো মতুয়া ভোটব্যাংক।

এখন সেই বিজেপি নেতারা বলছেন, কমিশন কড়া হচ্ছে না কেন? শুধু চিঠি পাঠালেই কি হবে? দফায় দফায় স্পেশাল, মাইক্রো অবজার্ভার পাঠিয়েও বিশেষ কাজ হয়নি বলে মনে হচ্ছে তাঁদের। একই সুরে কথা বলছেন শমীক, শুভেন্দু- কেন এত সফট লাইনে হাঁটছে কমিশন? সেইসঙ্গে তাঁরা বাজারে ছেড়েছেন ‘কনস্পিরেসি থিওরি।’ তা ষড়যন্ত্রটা কী?

তাঁদের বক্তব্য, এসআইআর নিয়ে সাধারণ মানুষের হয়রানির মূলে আসলে তৃণমূল। তারাই বিএলও-দের দিয়ে নোটিশ পাঠাচ্ছে যাতে ভোটাররা বিরক্ত হন, ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। শমীকের কথায়, পরিকল্পিতভাবে তৃণমূল বিএলও-দের দিয়ে ভুল তথ্য আপলোড করিয়ে প্রবীণ, অসুস্থ ভোটারদের হয়রানি করছে। বহু প্রতিষ্ঠিত মানুষকে শুনানিতে ডাকিয়েছে।

খসড়া লিস্ট, ম্যাপিং, হিয়ারিং পর্যন্ত একরকম ছিল। এখন লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি এসে পুরো ব্যাপারটা আরও একপ্রস্থ গুলিয়ে দিয়েছে। নামের বানান, পদবির বানান, মা-বাপের বিয়ের বয়েস, ক’জন ভাইবোন ইত্যাদি প্রশ্নের পর প্রশ্নে তিতিবিরক্ত সাধারণ মানুষ। দেশে আর কোথাও এমন পরীক্ষার সামনে দাঁড়াতে না হলেও বাংলায় তাঁরা যে আগমার্কা খাঁটি নাগরিক, পদে পদে তার প্রমাণ দিতে হচ্ছে।

ইতিমধ্যে শ-খানেক মৃত্যু বা আত্মহত্যা নিয়ে বাজারে নেমে পড়েছে জোড়াফুল। এই হয়রানিতে মানুষ যত খেপে উঠছেন, তত পোয়াবারো তৃণমূলের। এমন পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা ইস্যু পেয়ে ছক্কা হাঁকাচ্ছে রাজ্যের শাসকদল। কেন্দ্র আর বিজেপির এমন লোপ্পা বল মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছে তারা। খোদ নেত্রী আর দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড সভায় সভায় এসআইআর নিয়ে দিল্লির দিকে তাক করে গোলাগুলি চালিয়ে যাচ্ছেন।

যত মোদি-অমিত শা অনুপ্রবেশ নিয়ে বলছেন, তত তৃণমূল বলে চলেছে, সোজা পথে হারাতে না পেরে এখন কমিশনকে দিয়ে ঘুরপথে বাংলার দখলদারি চাইছে গেরুয়া শিবির। এইসব নিয়ে গোটা দলকে রাস্তায় নামাতে পেরেছে জোড়াফুল। ভোটের আগে এটা বড় অ্যাডভান্টেজ তো বটেই। ওদিকে মনে হচ্ছে, কমিশন কখন কী করবে, থই পাচ্ছে না। কতবার যে কতরকম হুকুম হল যাতে হিমসিম খাচ্ছেন বিএলও-রা।

সুপ্রিম কোর্ট ধমক দেওয়ার পর এখন মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে মান্যতা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নথি জমা নিলে রসিদ দিতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রয়োজনে সশরীরে হাজিরা না দিলেও চলবে। শুনানিতে অন্য কাউকে সঙ্গে রাখার নিয়মও চালু হয়েছে। বিএলএ-দের রাখতেও আর আপত্তি নেই। এছাড়া লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিতে নামের তালিকা টাঙানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এখন সময়মতো পুরো ব্যাপারটা শেষ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সেই অবস্থায় বিধানসভার মেয়াদ ফুরোলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির জল্পনা চলছে। রাজ্যজুড়ে অবরোধ, ভাঙচুরে সে অনুমান আরও জোরালো হচ্ছে। কোথাও মার খাচ্ছেন বিএলও, কোথাও মাইক্রো অবজার্ভার। নির্বাচন কমিশন জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বললে তাতে থোড়াই কেয়ার নবান্নের। পাত্তাই দেওয়া হচ্ছে না কমিশনের নির্দেশকে।

অন্যদিকে মহারাষ্ট্র, বিহারের ক্ষেত্রে অতি অল্প সময়ে চুপিসারে পুরো ব্যাপারটা সেরে ফেলার ছক বিজেপি কষেছিল- এমন ধারণা বহু লোকের মনে গেড়ে বসছে। তৃণমূলের প্রচারে সেই ধারণায় যে হাওয়া লাগছে, তাতে সন্দেহ নেই। সবমিলিয়ে যাকে বলে ল্যাজেগোবরে অবস্থা কমিশনের। বিরোধী নেতা গোড়ায় লাখ পঞ্চাশেক নাম বাদ পড়ায় বেজায় উল্লসিত হয়ে বলেছিলেন, এটা তাঁর ব্রেকফাস্ট। এক কোটি কুড়ি লক্ষকে নোটিশ পাঠানোয় তাঁর উল্লাস এখন ডাবল। এটা হবে তাঁর লাঞ্চ। বোঝো কাণ্ড! এত লোকের ভোগান্তির কানাকড়ি দামও নেই তাঁর কাছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *