অভিরূপ দে, ময়নাগুড়ি: এ যেন এক স্বপ্নের উড়ানের কাহিনী! কয়েকদিন আগে পর্যন্ত একজনের পরিচয় ছিল, হোটেলে রাঁধুনির ছেলে। অন্যজনকে মানুষ চিনতেন ট্রাকচালকের ছেলে হিসেবে। কিন্তু এখন থেকে তাঁরা ডব্লিউবিসিএস অফিসার। ময়নাগুড়ি ব্লকের (Mainaguri) দৈব্যনাথ রায় ও সুরজিৎ সরকারের উত্তরণের কাহিনী রূপকথার গল্পের মতোই। কঠোর পরিশ্রম আর মেধার জোরে সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে দৈব্যনাথ আর সুরজিৎ ডব্লিউবিসিএস-এর ‘এ’ গ্রেড অফিসার হয়েছেন (WBCS Success Story)। কয়েকদিনের মধ্যে দৈব্যনাথ রাজ্য সরকারের এগজিকিউটিভ অফিসার এবং সুরজিৎ রাজ্যের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরে যোগ দেবেন। দৈব্যনাথ ও সুরজিতের এমন সাফল্যে গর্বিত ময়নাগুড়ি।
ময়নাগুড়ি দক্ষিণ খাগড়াবাড়ি এলাকার দৈব্যনাথের বাবা সুভাষ রায় ময়নাগুড়ি ট্রাফিক মোড়ে একটি খাবারের দোকানে রাঁধুনির কাজ করেন। এতেই স্পষ্ট, নুন আনতে পান্তা ফুরোনো পরিবারে বড় হয়ে ওঠা দৈব্যনাথের। এরই মধ্যে দুর্ঘটনায় চোট পাওয়ায় হাতে সমস্যা রয়েছে দৈব্যনাথের। বাবার সামান্য রোজগারে পরিবারে অভাব অনটন থাকলেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন দৈব্যনাথ। ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় সফল হয়ে লক্ষ্যপূরণ করেছেন তিনি। ময়নাগুড়ি শহিদগড় উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ময়নাগুড়ি কলেজ থেকে ভূগোল নিয়ে স্নাতক হয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন দৈব্যনাথ। পড়াশোনার প্রতি সবসময় যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন দৈব্যনাথ, জানাচ্ছেন তাঁর এক সময়ের শিক্ষকরা। এই সাফল্যে বুধবার ময়নাগুড়ি শহিদগড় উচ্চবিদ্যালয়ের তরফে দৈব্যনাথকে সংবর্ধনা জানানো হয়। উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের পরিচালন কমিটির সভাপতি তথা ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান মনোজ রায় ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুব্রত ভাদুড়ি। বিরাট কোহলির ভক্ত দৈব্যনাথ বললেন, ‘খাদের কিনারা থেকে যেভাবে টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন কোহলি, তা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। ওই ম্যাচটিও কোহলির মতো আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।’
অন্যদিকে, ময়নাগুড়ি শহরের আনন্দনগরের বাসিন্দা সুরজিতের ছোট থেকেই ডান হাতের পাঁচ আঙুলে সমস্যা রয়েছে। যে কারণে ডান হাতে কোনও কাজ করাই তাঁর পক্ষে যথেষ্ট কষ্টকর। সুরজিতের বাবা পেশায় ট্রাকের চালক ছিলেন। অভাবকে সঙ্গী করেই ময়নাগুড়ি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে জলপাইগুড়ি আনন্দ চন্দ্র কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক। এরপর উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পড়ার সময় পড়াশোনার টাকা জোগাড় করতে নিয়মিত টিউশনি করতেন সুরজিৎ। লক্ষ্যে অবিচল থেকে হার না মানা জেদে এবং মাটি কামড়ে পড়ে থেকে ডব্লিউবিসিএস-কে পাখির চোখ করে প্রস্তুতি শুরু করেন সুরজিৎ। বর্তমানে তিনি ক্রান্তি রাজাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সুরজিতের সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিজন থেকে প্রতিবেশীরা ফুলের তোড়া, মিষ্টি নিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। সুরজিৎ বলছেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে এখন পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে ভালো লাগছে।’
এদিকে, বুধবার সন্ধ্যায় দুই কৃতী দৈব্যনাথ ও সুরজিতকে ময়নাগুড়ি ব্লক প্রশাসনের তরফ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়। উপস্থিত ছিলেন বিডিও প্রসেনজিৎ কুণ্ডু ও ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কুমুদরঞ্জন রায়। বিডিও বললেন, ‘যেভাবে দুজন জীবনসংগ্রামের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছেন, তাঁদের কুর্নিশ জানাই। ওঁদের দেখে এই এলাকার ছেলেমেয়েরা যাতে চাকরির পরীক্ষায় সফল হয়, সেই শুভেচ্ছা রইল।’
