৯ মাসেরও বেশি সময় একরাশ উৎকণ্ঠা, আশঙ্কার পাহাড় পেরিয়ে অবশেষে ঘরে ফিরলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নভশ্চর সুনীতা উইলিয়ামস। বুধবার ভারতীয় সময় ভোর তিনটে সাতাশ মিনিটে ফ্লোরিডা উপকূলে সুনীতা এবং বুচ উইলমোরকে নিয়ে সফল অবতরণ করে এলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের ক্রু ড্রাগন।
মাত্র ৮ দিনের মিশনে মহাকাশে গিয়েছিলেন সুনীতা এবং উইলমোর। কিন্তু যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে তাঁদের না নিয়েই মহাকাশ থেকে ফিরে এসেছিল স্টারলাইনার মহাকাশযানটি। সেই থেকে আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল সুনীতাদের ঠিকানা। গত ৯ মাসে একাধিকবার তাঁদের ফিরিয়ে আনার কথাবার্তা শোনা গিয়েছে। একবার একটি মহাকাশযান পাঠানোও হয়েছিল। কিন্তু সাফল্য অধরাই থেকে গিয়েছিল।
বরং সময় যত দীর্ঘায়িত হয়েছে, তত ক্ষীণ মনে হচ্ছিল সুনীতাদের সুস্থ এবং নিরাপদে ঘরে ফেরার সম্ভাবনা। যেহেতু সুনীতার সঙ্গে ভারতের যোগসূত্র রয়েছে, তাই ঘরের মেয়ের নিরাপদে ফেরার বিষয়টি যথেষ্ট উদ্বেগে রেখেছিল এদেশের মানুষকেও। ২০০৩ সালে আরেক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহিলা নভশ্চর কল্পনা চাওলা নাসার অভিযানে মহাকাশ থেকে ফেরার সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মারা গিয়েছিলেন।
সেরকম মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে সুনীতাদের ঘরে ফেরার ক্ষেত্রে না হয়, সেজন্য নাসা, স্পেসএক্স, মার্কিন প্রশাসনের পাশাপাশি উদ্বেগের প্রহর গুনছিল ভারত। তাই স্পেসএক্সের ক্রু ড্রাগন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সুনীতাদের নিয়ে ফ্লোরিডার উপকূলে অবতরণ করতেই খুশির জোয়ার নামে তাঁদের প্রতীক্ষায় থাকা মানুষজনের মধ্যে।
গুজরাটের মেহসানায় সুনীতার পৈতৃক গ্রাম খুশিতে ফেটে পড়ে। তবে পৃথিবীতে এলেও সুনীতাদের বিপদ এখনও কাটেনি। একটানা ২৮৬ দিন মহাকাশে থাকার কারণে সুনীতা উইলিয়ামস এবং তাঁর সঙ্গীর এখন সবথেকে বড় পরীক্ষা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া।
মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণহীন যাপন করেছিলেন তাঁরা। যেহেতু নাসার অভিযানগুলিতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকার জন্য মহাকাশচারীদের ৬ মাসের প্রস্তুতি দেওয়া হয়ে থাকে, তাই তাঁরা পৃথিবীতে ফেরা মাত্র দুর্বল হয়ে পড়েন, তা নয়। তবে মাধ্যাকর্ষণহীন স্থানে থাকা এবং না থাকার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য থাকায় আগামী কয়েক মাস সুনীতাদের বিভিন্ন রকমের শারীরিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হতে পারে।
যদিও সুনীতা এবং তাঁর সঙ্গী দীর্ঘ ৯ মাস বিভিন্ন প্রতিকূলতা কাটানোর পর যেভাবে হাসিমুখে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন, তা কুর্নিশযোগ্য। তাঁদের সেই মানসিক সক্ষমতার তারিফ করে বলা যেতেই পারে, তাঁরা আগামীদিনেও এভাবে সমস্ত শারীরিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন। কল্পনা চাওলা, সুনীতা উইলিয়ামসদের জয়যাত্রা শুধু মহাকাশ গবেষণার এক-একটি মাইলফলক নয়। বরং মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে এক-একটি বিজয়কেতন।
সুনীতারা ফেরার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, স্পেসএক্স কর্তা এলন মাস্কের পাশাপাশি উচ্ছ্বসিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা। মোদি ইতিমধ্যে সুনীতাকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও একধাপ এগিয়ে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে ভারতের মেয়ে সুনীতাকে ভারতরত্ন দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
ইদানীংকালে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) একাধিক মহাকাশ গবেষণায় বেশ কিছু সাফল্য পেয়েছে। চন্দ্রযান, মঙ্গলযান, আদিত্য এল-১’এর মতো একাধিক মহাকাশ অভিযান সাফল্যের মুকুট পরেছে। কিছু বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে ইসরোর বিজয়রথ চলছেই। সেই কারণে এবার সাধারণ বাজেটে মহাকাশ গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। সুনীতাদের সাফল্য ইসরোর সেই পথ চলাকে আরও বেশি উত্সাহিত করবে, দিশাও দেখাবে।
স্পেসএক্সের ক্রু ড্রাগনে চেপেই আর কয়েকদিনের মধ্যে অ্যাক্সিওম-৪ মিশনে যাচ্ছেন ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা। রাকেশ শর্মার পর দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে মহাকাশে যাচ্ছেন তিনি। আশা করা যায়, সুনীতাদের বিজয়যাত্রা ভারতের ওই মহাকাশ অভিযানকে নতুন দিশা দেখাবে। বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় সুনীতারা এক নতুন যুগের সূচনা করলেন।
