- পার্থসারথি চক্রবর্তী
সুনীতা উইলিয়ামসদের ঘরে ফেরা নিঃসন্দেহে বিজ্ঞানের জয়। কিন্তু এটাই আমাদের প্রথম জয়, এমনটা কিন্তু নয়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) তৈরি করার মধ্যে দিয়ে আগেই বিজ্ঞানের জয়ধ্বজা উড়েছে। বিজ্ঞানের জয়ের পথ মসৃণ বলেই তো স্পেস সেন্টারে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা অহরহ যাতায়াত করতে পারছেন। তাঁরা সেখানে পৌঁছে সেন্টার মেরামতের পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উন্নতমানের গবেষণা।
সুনীতাদের নিয়ে এত আলোচনা, হইচই কেন? মাত্র আটদিনের জন্য আইএসএসে গিয়েছিলেন সুনীতা এবং তাঁর সফরসঙ্গী বুচ উইলমোর। পরিবর্তে ২৮৬ দিন কাটিয়ে ফিরেছেন। আর এটাই অনেকের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে। বারবার তৈরি হয়েছে টেনশন। প্রশ্ন উঠেছে, তাঁরা ফিরতে পারবেন তো? এতকিছুর পরে চন্দ্রবিন্দুর সেই গানের কলি সবার মুখে মুখে- এভাবেও ফিরে আসা যায়। আর এতেই বিজ্ঞানের জয় দেখছেন অনেকে।
তবে গেলাম আর ফিরে এলাম, সুনীতার কাছে বিষয়টা ততটা সহজ কিন্তু ছিল না। প্রাণসংশয়ের ঝুঁকি তো ছিলই। পাশাপাশি পৃথিবীতে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার মধ্যে ছিল আরও ঝক্কি। ছিল ভয়। কেননা, পৃথিবীতে ফিরে এসে পরেরদিন বাজার-অফিস ছুটে বেড়ানোর ‘পারমিশন’ তাঁর থাকবে না। বিষয়টা এত সহজ নয়। এখানকার আবহাওয়া, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সুনীতাদের কয়েকমাস সময় লাগবে। এই সময়টাও যথেষ্ট ঝক্কির, মহাকাশে থাকার মতোই।
বুধবার সকালে ফ্লোরিডার উপকূলে যখন হাসিমুখে সুনীতাকে দেখা গেল, তখন সব দুশ্চিন্তা যেন এক লহমায় উবে যায়। এতকিছু ঘটিয়ে ফেলার পরেও বিষয়টা যেন তাঁর কাছে জলভাত মনে হচ্ছিল। তবে সবকিছুর মধ্যেও সুস্থ শরীরে তাঁকে ফিরিয়ে আনার মধ্যে বড় হয়ে উঠছে সেই বিজ্ঞানের জয়গাথা। নাসার পাশাপাশি নভশ্চরদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অবদান রয়েছে এলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের। এটাও তো বিজ্ঞানের জয়, যার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকে।
বিজ্ঞানচর্চা কখনও থেমে থাকে না, এগিয়ে যায়। আগামীতে আরও এগোবে। যাবতীয় আবিষ্কার ভবিষ্যতে ইতিহাস হয়ে যাবে। কিন্তু সুনীতা বিজ্ঞানীদের কাছে প্রেরণা হয়ে থাকবেন চিরদিন। পৃথিবীর মতো মহাকাশে অবাধ বিচরণ সম্ভব নয়। করা যায় না কাজ। পদে পদে বিপদ। দিন-দিন মাসল লস হয়। শারীরিক নানা পরিবর্তন ঘটে। ধীরে ধীরে যা প্রাণসংশয়ের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। এ সবকিছুই ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুনীতার জানা। তা সত্ত্বেও মন দিয়ে হাসিমুখে নিজের কাজটা করে গিয়েছেন এই মেয়ে। ভাবা যায়!
কতটা মানসিক দৃঢ়তা থাকলে এমন অবস্থায় নিজেকে রাখা যায়, বিশ্ববাসীর কাছে তার একটা উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সুনীতা। কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা শিক্ষণীয়। নিজের সংকল্পে কতটা অবিচল থাকলে এই জায়গায় পৌঁছানো যায়, তা কিন্তু দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধারা। ‘আয়রন লেডি’ না হলে কি এমন দৃঢ়তা কারও থাকতে পারে?
এই নভশ্চরের কাছে আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে। শুধু আমাদের মতো বিজ্ঞানীদের নয়, প্রতিটি সেক্টরের মানুষের কাছে আদর্শ হওয়া উচিত সুনীতা উইলিয়ামস। আমার বিশ্বাস সেটা হবেও। শুধু বিজ্ঞান নয়, কলা, বাণিজ্য সহ প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত মানুষ যদি সুনীতার মতো কাজের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, তবেই তো সফলতার নতুন পথ খুঁজে পাবে বিশ্ববাসী। সেই পথ কিন্তু দেখিয়ে দিলেন সুনীতাই।
(ভাটনগর পুরস্কার প্রাপক বিজ্ঞানী)
