প্রতিবাদে নেই, বিশ্লেষণে নেই। সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতির সর্বত্র আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন এক উদাসীনতার চিহ্ন।
রূপায়ণ ভট্টাচার্য
বাঙালিরা সব কথাতেই প্রথমে বলে, ধুর।
১৪ বছর আগে দোলের সময় কাঠমান্ডুর এক পাঁচতারা হোটেলের লাউঞ্জ। ভারতীয় ফুটবল দল সেখানে খেলতে গিয়েছে এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপ। অধিনায়ক সুনীল ছেত্রী আড্ডা দিচ্ছেন কলকাতার পাঁচ সাংবাদিকের সঙ্গে। বাংলায় থাকার অভিজ্ঞতা ছয়-সাত বছর হয়ে গিয়েছে সুনীলের। বাঙালিদের জানেন। বাংলা জানেন।
বাঙালিদের বিশেষত্ব কী দেখলেন এতদিনে? তখন আরও সরল সাদাসিধে সুনীল। সাতাশ-আঠাশ। প্রেম করছেন সুব্রত ভট্টাচার্যের মেয়ের সঙ্গে। হাসতে হাসতে ওই কথাটা বলেছিলেন। ‘বাঙালিরা সব কথাতেই প্রথমে শুধু বলে ধুর’।
এ কেমন ফুটবলার? প্রশ্ন করলে শুনবেন প্রথম উত্তর আসে, ধুর!
কেমন হল এই ম্যাচটা? প্রশ্ন করলে শুনবেন উত্তর আসছে, ধুর!
ওই সিনেমাটা কেমন হয়েছে? সেই প্রশ্নেও প্রথমেই উত্তর, ধুর!
বিয়েবাড়িতে কেমন খাওয়া হল? এই প্রশ্নে একই উত্তর, ধুর!
ধুর থেকে ক্রমশ ধু-র-র, তারপর ধু-উ-র-র-র!
আমরা সবাই হাসছিলাম। সুনীলও বলতে বলতে হাসছিলেন।
পরে ভেবে দেখলাম, এই ছোট্ট শব্দটা, কথাটা একেবারে ঠিক। সবকিছুকেই ব্যঙ্গ করে উড়িয়ে দেওয়া বাঙালির একটা অভ্যাসে পরিণত। এবং সেটা বাংলায় যৌবন কাটানো এক অবাঙালির চোখে ধরা পড়ে গিয়েছে দ্রুত। সবকিছুতেই ব্যঙ্গ এবং সবকিছুকেই উপেক্ষা করা।
বাঙালির আসলে কোনওকিছুতেই পছন্দ নয়। মন খুলে প্রশংসা হবে না, সোজা কথা।
খেয়াল করে দেখুন, এখন, এই মুহূর্তে বাঙালির ‘ধুর’ এখন সর্বভারতীয় রূপ নিয়েছে। এবং ধুর-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি বাক্য। ‘ধুর! ছাড়ুন তো! এসবে কিস্যু এসে যায় না!’
মানে, সম্পূর্ণ উপেক্ষা। লোকে যে যা-ই বলুক, কিছু এসে যায় না আমার। আমার কাজটা আমি করে যাব! লোকে কী বলল, জনতা কী বলল, থোড়াই কেয়ার আমার! আসমুদ্রহিমাচল এই অভ্যেস।
এই যে ভারত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আইসিসি প্রেসিডেন্ট জয় শা একেবারে ভারতীয় বোর্ডকর্তাদের মতো অতি দৃষ্টিকটু নাচানাচি করলেন, কোচ-ক্যাপ্টেনকে নিয়ে পুজো দিতে গেলেন, সেটা কি পৃথিবীর কোথাও, আর কোনও খেলায় হবে?
তা নিয়ে প্রশ্ন করলে কী শুনবেন? ধুর! ছাড়ুন তো! এতে কিস্যু এসে যায় না।
এই যে কয়েক লক্ষ বাঙালি উপযুক্ত কাগজ থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে পারছেন না, তা নিয়ে নির্বাচনের কমিশনের কর্তারা কী বলবেন? সেই একই কথা।
ধুর! ছাড়ুন তো! এতে কী এসে গেল?
রাজ্যে কয়েক হাজার শিক্ষকের চাকরি গেল। কয়েক হাজার ছেলে চাকরি পেয়েও চাকরি পেলেন না। শিক্ষা দপ্তরের কর্তারা বলবেন একই কথা।
ধুর! ছাড়ুন তো! এসবে কিচ্ছু এসে যায় না।
এই যে সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা এবং কলকাতার ধর্না মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অক্লেশে উলটোপালটা বলে ফেললেন, তা নিয়ে ওঁদের ভক্তদের জিজ্ঞেস করুন। একইরকম মনোভাব থাকবে সবার।
ধুর! ছাড়ুন তো! এতে কী এসে গেল!
পশ্চিমবঙ্গ থেকে কংগ্রেসকে তুলে দিলেন অধীর চৌধুরী, সিপিএমকে তুলে দিলেন মহম্মদ সেলিম। সিপিএম হয়ে গেল সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক পার্টি। দুই পার্টির বাকি নেতাদের প্রশ্ন করলে উত্তর আসবে একই জাতীয়।
ধুর! ছাড়ুন তো! এতে কী এসে গেল!
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এসে প্রথা ভেঙে মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করলেন রাজ্যে। নেমে পড়লেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রীও প্রথা ভেঙে পালটা দিলেন। রাজ্যপাল আনন্দ বোসকে আচমকা প্রধানমন্ত্রীরা সরিয়ে দিলেন প্রথা ভেঙে। লজ্জা ভুলে আনলেন বিতর্কিত রাজ্যপালকে। রাজ্যপাল বোসও প্রথা ভেঙে ভোটের মুখে রাজভবন, সরি লোকভবনে গেলেন না। থাকলেন হোটেলে। এসব ঘটনায় যাঁরা জড়িত, তাঁদের প্রশ্ন করুন, অবধারিত এক উত্তর আসবে।
ধুর! ছাড়ুন তো! এতে কী এসে গেল!
কেরলে সিপিএম এবং বিজেপি হঠাৎ গলায় গলায়, বাংলার কিছু সিপিএম নেতা হঠাৎ বিজেপির হয়ে বলছেন, এটা নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন করা হোক। তাঁরা ঠিক একইভাবে বলবেন, ধুর ছাড়ুন তো…!
উত্তরবঙ্গের রাজবংশীদের স্বঘোষিত নেতা নগেন রায় একবার বিজেপির দিকে যাচ্ছেন, একবার তৃণমূলের দিকে। জিজ্ঞেস করুন তাঁর অনুরাগীদের। তিনি এবং অনুরাগীরা ওই একই ভঙ্গিতে উড়িয়ে দেবেন।
ধুর! ছাড়ুন তো! কিস্যু এসে যায় না!
তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএমের চোখের সামনে বহু শিক্ষকের চাকরি অদৃশ্য হয়ে গেল বেমালুম। প্রশ্ন করলে সবার কাছে শুনবেন একই কথা।
ধুর! ছাড়ুন তো! কিস্যু এসে যায় না এতে!
শারদ পাওয়ার হঠাৎ ইন্ডিয়া জোটের হাত ছেড়ে বিজেপির দিকে ঢলে গেলেন। প্রশ্ন করলে শুনবেন, ধুর! ছাড়ুন তো! কী এসে গেল!
ওডিশায় মাস দুই আগে মুখ্যমন্ত্রী মাঝি মশাই হিসেব দিয়েছেন, ১৫ মাসে মেয়েদের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার ৯৪৭টি ক্রাইমের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণ ৩২০৫টি, ধর্ষণের চেষ্টা ২০২টি, মিথ্যে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অত্যাচার ৪৪০টি, পণ সংক্রান্ত ব্যাপারে ৪৯টি মৃত্যু। বাঙালিদের ওপর আক্রমণের ঘটনাও আছে অজস্র। মোহনচরণ মাঝির অনুগামীরা তাতে নির্বিকার।
ধুর, কী এসে গেল!…
উত্তরপ্রদেশে ২৭ হাজার প্রাইমারি স্কুল বাতিল করে দেওয়া হল, ৮৫ হাজার স্কুল শিক্ষকের পোস্ট খালি। এটা কি ভয়ংকর ব্যাপার নয়? রে রে করে ছুটে আসবেন যোগীভক্তরা।
ধুর! ছাড়ুন তো!…
বিহারে, বাংলায় এসআইআর হল। ওদিকে বিজেপিশাসিত অসমে একটা অবাক করা যুক্তি দেখিয়ে এসআইআর হল না। এটাই বা কী ব্যাপার?
ওখানেও কমিশনের কর্তারা, কেন্দ্রীয় সরকারের মাথারা প্রশ্ন উড়িয়ে দেবেন— ছাড়ুন তো…।
মহারাষ্ট্রে ‘ধর্ম স্বতন্ত্র অভিনিয়ম’ নামে একটি নিয়ম চালু করছে রাজ্য সরকার। ৩৫টি মহিলা, ছাত্র, সংখ্যালঘুদের সংস্থা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, এটা মেয়েদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। লাভ জিহাদের আর একটা রূপ। বিজেপি বা শিন্ডে অনুগামীরা প্রতিবাদ শুনে বলবেন, ধুর!
মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-মহমেডানের সঙ্গে সিএবি-আইএফএ-বিওএ’র কর্তারা নিজেদের শিরদাঁড়াটি বন্ধক রেখে দিয়েছেন তৃণমূল নেতাদের কাছে। প্রশ্ন করবেন। শুনতে হবে, ধুর! ছাড়ুন তো! কী এসে গেল!
বাংলার ক্রিকেট এবং বাংলার ফুটবল দুটোই মুছে গেল প্রায়। দুটোর স্থানীয় লিগ কার্যত হাস্যকর। বাঙালি প্লেয়ার ওঠে না। প্রশ্ন করলে উত্তর আসবে একরকম। ধুর! ছাড়ুন তো! কী এসে গেল!
বাংলা সিনেমার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এদিকে তার মধ্যেই ছড়ি ঘুরিয়ে যাচ্ছেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেও দেখেন না। সেই একই উত্তর টালিগঞ্জের ক্রমাগত মতবাদ পালটানো পরিচালক-প্রযোজকদের। কী এসে গেল? ধুর! কী এসে গেল!
বন্দে ভারতকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে রেলের অন্য ট্রেনগুলোর অবস্থা খুব শোচনীয়। রেলমন্ত্রকের প্রদীপের তলায় অন্ধকার। কেন এমন দুর্দশা, প্রশ্ন করলে এক উত্তর আসবে। ধুর! কী এসে গেল!
ধর্ম ধর্ম করতে করতে আমরা নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়ুল মেরে গেলাম। উগ্র হিন্দুত্ববাদে বাঙালিও হাবুডুবু। এদের যে কাউকে প্রশ্ন করলে একই উত্তর পাবেন। ধুর! কী এসে গেল!
দেশে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ‘বিচারবিভাগের দুর্নীতি’ সংক্রান্ত একটি অধ্যায় রাখা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এর ফলে এনসিইআরটি বিনা শর্তে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর অনুগামীদের এসব বললে শুনবেন, ধুর, ছাড়ুন তো!
গ্যাসের সংকটে বহু শহরের রেস্তোরাঁ বন্ধের মুখে। অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি।
বিরোধীরা লোকসভার স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁকে সরানোর জন্য একটি প্রস্তাব এনেছে।
বিরোধীরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুটোই ভারতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত বিরল এবং বিতর্কিত পদক্ষেপ।
প্রশ্ন করুন সবকিছু নিয়ে। উত্তর আসবে এক— ধুর! ছাড়ুন তো! কী এসে যায়!
পুনশ্চঃ বাঙালিদের এই অভ্যাসের জাতীয়করণ হয়ে গিয়েছে, বুঝতেই পারছেন। এবার বিশ্বায়নের দিকেও চলেছে এই সংলাপ।
পশ্চিম এশিয়ায় ট্রাম্পের ইচ্ছেয় যুদ্ধ চলছে। ইউক্রেনে পুতিনের ইচ্ছেয়। এর বাইরেও সারা পৃথিবীতে অন্তত ১৫ জায়গায় বড় যুদ্ধ চলছে এখনও।
এ নিয়ে প্রশ্ন করলেও ওই আগ্রাসী নেতারা অবহেলার সঙ্গে উড়িয়ে নিজস্ব ভাষায় যা বলবেন, তা অনুবাদ করলে অনেকটা ওরকমই দাঁড়াবে।
ধুর! ছাড়ুন তো! এসবে কিস্যু এসে যায় না!
