দরদের চিত্রনাট্য

ব্লগ/BLOG
Spread the love


দরদেরও প্রতিযোগিতা হয়ে যেতে পাের। তাতে কেউ কেউ লাভবান হতে পারেন। সেই লাভ আবার হয়ে ওঠে ক্ষমতার দম্ভের উপাদান। দুধ গরম করার ঠাঁই পাচ্ছিলেন না ফুটপাথবাসিনী। দরদ ওথলানোর প্রতিযোগিতায় তিনি মাথার ওপর ছাদ পাওয়ার আশ্বাস পেয়ে গেলেন। সেইসঙ্গে বিরোধীদের কপালে জুটল শানিত কটাক্ষ- দ্যাখ কেমন লাগে! ভাবটা এমন- চেয়েছিলি তো সরকারকে অপদস্থ করতে, সরকার পুরো পরিস্থিতি নিজের কবজায় নিয়ে নিল।

রাজ্যের পুরমন্ত্রী ‘একটু বেশি চেঁচিয়ে’ ফেলেছিলেন বলেই না দরদ ওথলানোর চিত্রনাট্য তৈরি হতে পেরেছিল। তড়িঘড়ি বিরোধীরা ছুটে গিয়ে সীতা ওরফে রাশিদার শিশুকে কোলে তোলার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হতে পেরেছিলেন। অথচ বাম রাজত্বের ৩৪ ও তৃণমূল জমানার ১৫ বছরে রাশিদার মাথায় ছাদ দেওয়ার কথা ভাবা হয়নি। এমন হাজার রািশদা ফুটপাথে দুধ গরম করলেও তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না কখনও।

‘একটু বেশি চেঁচিয়ে’ অগ্নিমিত্রা পাল যা করেছিলেন, তা মোটেই মন্ত্রীসুলভ নয়। রাশিদা এমন কোনও গর্হিত অপরাধ করেননি যে, তাঁর সন্তানের দুধের পাত্রে কার্যত লাথি মারার নিদান দিতে হবে। ফুটপাথে দুধ গরম করা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তবে হাজার হাজার রাশিদার খোলা আকাশের নীচে থাকতে বাধ্য হওয়ার দৃশ্য দেখে নীরব থাকা, তার চেয়েও বড় অন্যায়। সেই অপরাধ বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্র করছে।

আধুনিক শহর গড়ার নামে, পরিচ্ছন্ন নগর তৈরির লক্ষ্যে নিরুপায় মায়ের পথে সন্তানের দুধ গরম করা বন্ধ করার পিছনে আর যাই হোক সুশাসন নেই। সুপরিকল্পনাও নেই। এধরনের ‘আপদ’ শূন্য ফুটপাথ রাখতে যে বিস্তৃত পরিকল্পনা থাকা দরকার, তা রাষ্ট্রের নেই। বিজেপি সরকারের মন্ত্রী ধমক দিয়ে অমানবিক কাজ করেছেন নিশ্চয়ই। কিন্তু ফুটপাথবাসীর মাথার ওপর ছাদ তৈরি না করে বিগতদিনের শাসকরা সমানভাবে অমানবিকতায় অভিযুক্ত।

ফলে অগ্নিমিত্রার ‘একটু বেশি চেঁচিয়ে’ ফেলার পর বিরোধীদের কার্যত ‘হোক কলরব’ আদতে চলতি কথায় ‘সস্তার রাজনীতি’র নামান্তর। যদিও তাতে রাজনীতি শব্দটির অমর্যাদা হয়। কেননা, রাজনীতি তৈরি হয় মতাদর্শের ভিত্তিতে। এসব চিত্রনাট্যে মতাদর্শের ‘ম’ পর্যন্ত নেই। সে যাই হোক, বেশি চেঁচিয়ে ফেলার যুক্তিতে রাজ্যের অতি সক্রিয় পুরমন্ত্রী সুর নরম করতে বাধ্য হলেন বটে, কিন্তু গোটা সরকার নীরবে কার্যত তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে গেল।

ক্ষমতার কারবারে ডিজিটাল মাধ্যম আজকাল বড় উপকরণ। নয়াদিল্লির যন্তরমন্তরে জেন জেড-এর ধর্না সামাল দিতে খোদ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত মাঝরাতে সেলফি ভাষণ দেন, রিল তৈরি করেন। বাংলায় বিরোধী শিবিরের এখনকার নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ফেসবুক লাইভে অন্নপূর্ণা যোজনা ও দুধ জ্বাল দেওয়ায় ধমকের সুযোগে সরকারকে হেনস্তা করতে নেমেছিলেন। তিনি বা তাঁর সহকর্মীরা পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথবাসিনীকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন বলে ঘোষণাও করেছিলেন।

সেকথা শুনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিক বৈঠকে যখন তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, কেউ ওঁকে বিশ্বাস করে না, তখনই চিত্রনাট্যটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। কেননা, মুখ্যমন্ত্রীর সেই বক্তব্যের পর ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতে পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথবাসিনী পথ চিনে সল্টলেকে বিজেপির রাজ্য দপ্তরে ‘জনতার দরবারে’ পৌঁছে গেলেন। মুখ্যমন্ত্রী বা সরকারের অন্য কেউ একবারের জন্যও ধমকের জন্য অগ্নিমিত্রার সমালোচনা করেননি।

বরং রাশিদা বিবির খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করে দিয়ে ফুটপাথে দুধ গরম বিতর্কে মুখ্যমন্ত্রী কয়েক বালতি জল ঢেলে দিলেন। দুধ গরম হোক বা না হোক, দুধ বিতর্ক চিরকালের জন্য আড়ালে ঠেলে দেওয়া গেল সাফল্যের সঙ্গে। অন্যদিকে, রাশিদা কিন্তু প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাননি বলে বিরোধী শিবিরের ‘সস্তার রাজনীতি’র বেলুনটা ফুটো করে দিলেন। শেষ হল দরদের কারবারের চিত্রনাট্য।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *