গৌতম সরকার
রবীন্দ্রনাথের কবিতাটা তোর একবারও মনে হল না তৃষা… ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে?’ বাবা-মা, বোন, সহপাঠী, হিতাকাঙ্ক্ষীদের চেয়ে মরণকেই তোর আপন মনে হল রে মা? এই প্রতিবেদন লেখাটা যে কী যন্ত্রণার, কী করে বোঝাই তোকে বল! রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই…।’ তোর সেই ইচ্ছাটা হল না তৃষা! হস্টেল ভর্তি আবাসিক, কিছুটা দূরে শিক্ষাগুরুর দল। আর তোর কি না ভাদ্রের প্রথম দিনে রাতের আঁধারে মরিবার হল সাধ…।
কৈশোরে, যৌবনে মৃত্যু নিয়ে আমাদের প্রজন্মের অন্যরকম সাধ ছিল। ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে/ কত প্রাণ হল বলিদান…।’ গানের কথা ও সুরের সঙ্গে বুকের মধ্যে দ্রিমি দ্রিমি ড্রাম বাজত। মনে হত, মুক্তির লক্ষ্যে মৃত্যু তো তুচ্ছ। সেই মুক্তিই আজকের তরুণ প্রজন্মের ভাষায় ‘আজাদি’। অথচ ‘ছিন কে লেঙ্গে আজাদি’ বলতে কত ভয়। জেল হতে পারে, ফাঁসি হতে পারে! দেশদ্রোহী গালি জুটতে পারে।
মুক্তির মন্দিরের বদলে অনিশ্চয়তার দোলাচলে প্রাণ জুড়ালেন তৃষা। জীবনের অনিশ্চয়তা, জীবিকার অনিশ্চয়তা! চাকরি পাবেন কি না- সেই আশঙ্কা তাঁকে প্রতি মুহূর্তে কুরে-কুরে খেত। মা-বাবা সেই ভয়ংকর বাস্তবের কথা জানিয়েছেন। পড়াশোনা করে শেষপর্যন্ত যদি কাজ না জোটে- এই ভাবনা তাঁকে কতটা পাগল করলে স্বেচ্ছায় কেউ মৃত্যুকে বরণ করতে পারেন, একবার ভাবুন।
তরতাজা তরুণীটি কোচবিহার জেলায় উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। দেহ হস্টেলের ঘরে ঝুলে ছিল। নামিয়ে পাঠানো হয় লাশকাটা ঘরে। তারপর শ্মশানের চুল্লি চিরদিনের মতো টেনে নেয় অ্যাগ্রোনমির ছাত্রীকে। পুরো নাম তৃষা সাহা। বাড়ি শিলিগুড়ির কাছে শিবমন্দিরের ইন্দিরাপল্লিতে। কত আশা নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন কোচবিহারের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে! মর্গের সামনে তৃষার মায়ের বিলাপে স্পষ্ট হয়েছিল, বাবার বয়স হচ্ছে, আর কবে চাকরি মিলবে- এই দুর্ভাবনা গিলে খেত তাঁকে।
মৃত্যুর পথে তৃষা নিজেকে শেষ করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেলেন, এই দুর্ভাবনা আজকের প্রজন্মের জনে জনের। নিট কেলেঙ্কারি, প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে জেন জেড-এর আন্দোলনের পিছনে তো আসলে সেই দুর্ভাবনাই। যন্তরমন্তরে এসে কিশোররাও বলত, ‘আর এক বছর পর আমাদেরও নিট। তারপর…? এমন যদি চলে, আমাদের কী হবে!’
এই ‘আমাদের কী হবে’ উদ্বেগটাই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে। তৃষাকে তাড়াতে তাড়াতে শ্মশানের চুল্লিতে ঢুকিয়ে দিল। ওঁর বাবা স্পষ্টই বলেছেন, ‘সরকারি চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে মেয়েটা মানসিক অবসাদে ছিল।’ সেই অবসাদ এমনই যে, তৃষা বাবার বয়স হচ্ছে বলে তোর দুর্ভাবনায় মৃত্যুকে বরণ করার আগে মন তোকে ভাবতে দিল না, তুই না থাকলে তোর বাবা-মা, বোনের কী হবে! রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা করতি তুই। রবীন্দ্রগানের শক্তিও সেই অবসাদ ঘোচাতে পারল না রে মা!
শুধু কি তৃষা, দেশজুড়ে অবসাদ ঘরে ঘরে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রহসন হয়ে যায় বছরে দু’কোটি চাকরি দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি। ১২ বছর আগে ক্ষমতায় এসে প্রতিশ্রুতিটি দিয়েছিল নরেন্দ্র মোদির সরকার। ঢাকঢোল পিটিয়ে অনেক রোজগারমেলা হয়েছে। মন্ত্রীরা কয়েকজনের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিয়েছেন। তারপরেও কেন তৃষাকে মরতে হচ্ছে, জবাব দেবে না রাষ্ট্র? তৃণমূল জমানায় কর্মসংস্থান পরের কথা, চাকরি চুরি হয়েছে সরকারি আশ্রয়-প্রশ্রয়ে।
ছেলেমেয়েরা স্কুলে শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর চাকরির আশায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরেছে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও। আর প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘরে কোটি কোটি টাকা নগদের পাহাড় জমেছিল। পুরসভায় কর্মী নিয়োগ হয়েছে লবডঙ্কা। অথচ পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতিতে প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুর ভাঁড়ারে টাকা গুনে শেষ করা যায় না। প্রাক্তন দলীয় বিধায়ক সব্যসাচী দত্তের হেপাজতে এত টাকা আসে কোত্থেকে, একবারও জবাব দেননি তৃণমূল নেত্রী।
শুধু কি নিট পরীক্ষার্থী কিংবা স্নাতক, স্নাতকোত্তর প্রজন্মের উদ্বেগ? মোটেই না। তাহলে কি আর প্রতি জেলা থেকে লক্ষ লক্ষ বেকার পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিনরাজ্যে নানা নিরাপত্তাহীনতা সত্ত্বেও রোজগারের মরিয়া চেষ্টায় ব্যস্ত থাকতেন? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের ফিরে আসতে বলতেন। ফিরে এলে ভাতা দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতির ডমরু বাজিয়েছিলেন। কিন্তু নামমাত্র ভাতার ভিত্তিতে বাড়ি ফিরে আসাকে মূর্খামি মনে করেছিলেন অধিকাংশ শ্রমিক।
গ্রামবাংলার লক্ষ লক্ষ পুরুষ-মহিলা তাই শত নির্যাতন সয়ে ভিনরাজ্যে জীবনযাপন করছেন। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও সম্প্রতি পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরার ডাক দিয়েছেন। বলেছেন, তাঁদের কাজ দেবে সরকার। কিন্তু কাজের ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে কে আসবেন বলুন তো? ইদানীং আবার বিনিয়োগের ঢাকঢোল বাজছে। প্রচার হচ্ছে, বহু লোকের চাকরি হবে শিল্পে। যে ঢাক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাজিয়ে গিয়েছেন।
তিনি না দিয়েছেন সরকারি চাকরি, না ব্যবস্থা করেছেন বেসরকারি কর্মসংস্থানের। এখন তো ডাবল ইঞ্জিনের জমানা। ঢাকঢোল পেটানোর খামতি নেই। তাতে তৃষার আক্ষেপ, তরতাজা তরুণীর পরিবারের হাহাকার ঢাকা পড়ে যেতে পারে। কিন্তু দু’মুঠো খেয়েপরে বাঁচার মতো রোজগারের ব্যবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা কতটা নিশ্চিত? নিশ্চিত হলে কি ডাবল ইঞ্জিন জমানায় অনিশ্চয়তার আঁধার তৃষাকে টেনে নিয়ে যেত?
তৃষার স্মৃতিকে কোন কৈফিয়ত দেবে রাষ্ট্র? তৃষার পরিবারকে কোন সান্ত্বনাটা দিতে পারবে? সম্ভাবনাময় তরুণীটির পরিবারের কাছে নতজানু হয়ে ক্ষমা চাওয়ার সাহসও কি রাষ্ট্রের আছে? রাজ্যের বিজেপি সরকারের লগ্নির ঘোষণা ও চাকরির আশ্বাস যেন গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল না হয়!

