ড্রোনে ডামাডোল! যুদ্ধ থেকে চোরাচালান, বদলাচ্ছে অপরাধের কৌশল

শিক্ষা
Spread the love


ধৃতিমান সরকার

আকাশ এখন আর শুধু পাখি বা মেঘের স্বাধীন রাজত্ব নয়। সেই নীল আকাশে এখন নিঃশব্দে উড়ছে মৃত্যুর পরোয়ানা, যার পোশাকি নাম ড্রোন। একটা সময় ছিল যখন এই উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল সামরিক বাহিনীর গোপন আস্তানা বা আন্তর্জাতিক যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী প্রান্তর থেকে শুরু করে সুদান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—সব জায়গাতেই ড্রোন আজ আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু প্রথাগত রণক্ষেত্রের গণ্ডি টপকে এই প্রযুক্তি এখন খুব সহজেই পৌঁছে গিয়েছে অন্ধকার জগতের কারবারিদের হাতে। বিশেষ করে গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে সাধারণ খেলনার দোকানে বা অনলাইনে দেদার বিকোচ্ছে যে সস্তা ড্রোনগুলো, সেগুলোই এখন মাদক পাচারকারী, গুপ্তচর ও সন্ত্রাসবাদীদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন।

খুব সামান্য টাকায় আধুনিক প্রযুক্তির এই যন্ত্রগুলো এখন খোলাবাজারেই লভ্য। এগুলো চালানোর জন্য কোনও বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। আর রাডারের চোখ এড়িয়ে নিঃশব্দে কাজ হাসিল করতে এদের জুড়ি মেলা ভার। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেআইনি ড্রোনের প্রায় ছিয়াশি শতাংশই সরাসরি অপরাধমূলক কাজকর্মের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হল, কারাগারের উঁচু পাঁচিল টপকে বন্দিদের হাতে মাদক ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া।

মালয়েশিয়ার কথাই ধরা যাক। সেখানে ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে তাপাহ নামের একটি কারাগারে ড্রোনের সাহায্যে মাদক পাচারের প্রথম ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। এরপর সেদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক যে তথ্য সামনে আনে, তা রীতিমতো চাঞ্চল্যকর। তারা জানায়, ওই এক বছরেই দেশের বিভিন্ন কারাগারে আকাশপথে মাদক পাচারের অন্তত ৫৫টি ঘটনা ঘটেছে। গত জুলাই মাসেও একটি জনপ্রিয় চিনা সংস্থার তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে জেলের ভেতর তামাক পাচার করতে গিয়ে দুজন ধরা পড়ে। প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়াতেও ছবিটা হুবহু এক। গতবছর জুন মাসে পশ্চিম জাভার বান্দুংয়ের একটি মাদক-সংশোধনাগারে আকাশপথে এভাবেই নিষিদ্ধ মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, জেলের ভেতরে থাকা বন্দিরা সমাজমাধ্যমের সাহায্যে বাইরে থাকা কারবারিদের কাছে মাদকের বরাত দিচ্ছে, আর সেই মাদক সোজা আকাশ থেকে জেলের নির্দিষ্ট সেলে এসে নামছে। এই নিখুঁত অপরাধের জাল পুলিশি প্রহরার সমস্ত প্রচলিত ধারণাকেই যেন ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

কারাগারের গণ্ডি পেরিয়ে ড্রোন এখন আন্তর্জাতিক সীমান্ত পারাপারের ক্ষেত্রেও রীতিমতো ত্রাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক পাচারের কুখ্যাত ‘সোনালি ত্রিভুজ’ অর্থাৎ মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস সীমান্তে নজরদারির চেয়ে পাচারকারীদের ড্রোনের সংখ্যা এখন ঢের বেশি। রাষ্ট্রসংঘের মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত দপ্তরের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই দেশগুলোর সীমান্তরক্ষীদের ফাঁকি দিয়ে ছোট ছোট ড্রোনের মাধ্যমে অবাধে মাদক পাচার চলছে। থাইল্যান্ডের আধিকারিকরা গত দু’বছরে এমন অসংখ্য বড় পাচারচক্রের পর্দা ফাঁস করেছেন। গত ডিসেম্বরে থাইল্যান্ডের একটি সেনা এলাকার কাছের গুদামে হানা দিয়ে আড়াই হাজার ড্রোন উদ্ধার করা হয়, যেগুলো সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সেদেশে আনা হয়েছিল। মার্চ মাসেও ব্যাংককের উপকণ্ঠে একইরকমভাবে দুই হাজারের বেশি ড্রোন বাজেয়াপ্ত করা হয়। সমাজমাধ্যমের পাতায় চড়া দামে সেগুলো বিক্রি করার ছক কষা হয়েছিল। এমনকি গত বছর অগাস্ট মাসে সিঙ্গাপুরের একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত গুদামে তল্লাশি চালিয়ে ড্রোনের পাশাপাশি এমন কিছু আধুনিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়, যা দিয়ে পুলিশের নজরদারি ব্যবস্থাকেও বিকল করে দেওয়া সম্ভব।

এই চোরাচালানের সঙ্গে মায়ানমারের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের এক গভীর ও অশুভ সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে ক্ষমতাসীন সামরিক শাসক এবং তাদের বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী—উভয়পক্ষই একে অপরের ওপর হামলা চালাতে এই সস্তা ড্রোনগুলোর ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। থাইল্যান্ড ও মায়ানমার সীমান্তে এমন অনেক পাচারকারী ধরা পড়েছে, যারা ড্রোনের যন্ত্রাংশগুলো টুকরো টুকরো করে সাধারণ বিমানে বা দুর্গম পাহাড়ি পথে মায়ানমারে পাচার করছিল। মায়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ইতিমধ্যেই সামরিক বাহিনীর ওপর হাজার হাজার বার হামলা চালিয়েছে, যা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিই পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। পিছিয়ে নেই সামরিক বাহিনীও। ইউরোপের উন্নত উপগ্রহ-নিয়ন্ত্রিত দিগদর্শন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা এমন কিছু ড্রোন তৈরি করেছে, যা সাধারণ তরঙ্গ-নিরোধক যন্ত্র দিয়েও বিকল করা যায় না। চিন থেকে আসা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জামের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা এড়াতে পাচারকারীরা এখন থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার মতো তৃতীয় কোনও দেশকে নিজেদের নিরাপদ করিডর হিসেবে ব্যবহার করছে।

মাদক পাচার বা যুদ্ধের পাশাপাশি গুপ্তচরবৃত্তি এবং সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রেও ড্রোনের ব্যবহার এক নতুন আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ২০২৫ সালের অগাস্ট মাসে মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রকের সদর দপ্তরের ওপর একটি ক্যামেরা-যুক্ত ড্রোন ওড়ানোর অভিযোগে দুই চিনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত একটি সামরিক ভবনের অন্দরমহলের গোপন তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করাই ছিল তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। এর আগে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত সংঘাতের সময়ও সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর ঠিক এভাবেই নজরদারি চালানো হয়েছিল।

অন্যদিকে, সন্ত্রাসবাদীদের হাতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। ২০১৭ সালে ফিলিপিন্সের মারাউই শহর যখন ইসলামিক স্টেট জঙ্গিরা দখল করে নেয়, তখন তারা ড্রোন ব্যবহার করেই সেনাবাহিনীর প্রতিটি গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখত। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়াতেও এই ধরনের বেশ কয়েকটি ছক বানচাল করা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে  ইন্দোনেশিয়ায় খোদ পোপ ফ্রান্সিসের সফরের সময় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল একদল জঙ্গি। তাদের কাছ থেকেও এই আধুনিক ড্রোন উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে জেমাহ ইসলামিয়া নামের এক কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠনের গোপন ডেরাতেও মিলেছিল একই যন্ত্র।

এর চেয়েও ভয়াবহ খবর হল, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ থেকে ড্রোনের যন্ত্রাংশগুলো বাণিজ্যিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সুদূর সিরিয়া বা তুরস্কে থাকা সন্ত্রাসবাদীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক কেনাকাটার ওয়েবসাইট থেকে সাধারণ খেলনা হিসেবে ড্রোন বা অত্যাধুনিক চিপ কিনে, সেগুলোকে সাধারণ খাবারের প্যাকেটের ভেতরে লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে। হায়াত তাহরির আল-শাম-এর মতো সিরিয়ার কট্টরপন্থী জঙ্গিদের হাতে এই আধুনিক মারণাস্ত্র তুলে দেওয়ার নেপথ্যে যে আন্তর্জাতিকচক্র কাজ করছে, তার লেনদেন চলছে সম্পূর্ণ সাংকেতিক বা ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে। ফলে এই টাকার উৎস খুঁজে বের করা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার চেয়েও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই সামগ্রিক চিত্রটা কিন্তু আমাদের দেশ বা রাজ্যের জন্য মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে, বিশেষ করে পঞ্জাব এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে অস্ত্র এবং মাদক পাচারের ঘটনা এখন রোজকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিপদ শুধু পশ্চিম সীমান্তেই থেমে নেই। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডর এমনিতেই ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি এলাকা। বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে আমাদের যে বিস্তীর্ণ এবং বহুলাংশেই উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, সেখানে এই প্রযুক্তির বেআইনি অনুপ্রবেশ ঘটা কেবল সময়ের অপেক্ষা। যে পাচারকারীরা এতদিন রাতের অন্ধকারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁটাতারের বেড়া কাটত, তারা যদি এখন কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে আকাশপথে মাদক, জাল নোট বা মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র পাচার শুরু করে, তবে সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর পক্ষে তা রোখা এক চরম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অপরাধজগতের এই নতুন কৌশলের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সামগ্রিক নিরাপত্তাই এক বিশাল প্রশ্নের মুখে পড়বে।

পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে শুধু প্রথাগত নজরদারি দিয়ে এই আকাশ-সন্ত্রাস রোখা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। সরকারকে এখন এর মোকাবিলার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। শুধু আকাশে উড়ন্ত ড্রোনটিকে গুলি করে নামানোই শেষকথা নয়, যে পথে এগুলো পাচার হচ্ছে, যে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর আড়ালে এদের যন্ত্রাংশ হাতবদল হচ্ছে এবং সর্বোপরি এর পেছনে যে ভাড়াটে কারবারিরা কাজ করছে, তাদের শিকড় উপড়ে ফেলাটা সবচেয়ে জরুরি। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যেই নিজেদের পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে আলাদা ড্রোন-নিরোধী শাখা তৈরি করেছে। আমাদের দেশেও এই ধরনের পরিকাঠামো অতি দ্রুত গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের কাছে ড্রোনের বিক্রি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও কড়া আইনি রূপরেখা এবং যন্ত্রের ডিজিটাল ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা থাকা দরকার।

আধুনিক যুগে অপরাধীরা নিত্যনতুন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আইনের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকার চেষ্টা করবেই। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রকে যদি নিজের অস্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হয়, তবে এই নতুন আকাশ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আরও অনেক বেশি নির্মম, ক্ষিপ্র এবং কৌশলী হতে হবে। তা না হলে, আগামীদিনের যুদ্ধটা আর সীমান্তে বা রণাঙ্গনে হবে না, হবে আমাদেরই বাড়ির ছাদের ওপর।

(লেখক সাংবাদিক, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া বিশারদ)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *