ট্রাম্পের পোস্ট আজ বিশ্ববাজারের নয়া রিমোট

ট্রাম্পের পোস্ট আজ বিশ্ববাজারের নয়া রিমোট

শিক্ষা
Spread the love


অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত

বিশ্বের ইতিহাসে এমন রাষ্ট্রনেতার উদাহরণ বিরল, যাঁর মেজাজ এবং আঙুলের একটিমাত্র ইশারায় বিশ্ব অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে, আবার পরমুহূর্তেই ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে উড়েও উঠতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে নাটকীয়তার চেয়েও বহুগুণ বেশি অস্থিরতা তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক শেয়ার, তেল এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে। আজ তিনি মিসাইল ছোড়ার হুমকি দিচ্ছেন, আর কাল সকালে উঠে ঘোষণা করছেন যুদ্ধ স্থগিত, শান্তির আলোচনা চলবে। আপাতদৃষ্টিতে তাঁকে খামখেয়ালি মনে হলেও, অর্থনীতির চশমা দিয়ে গোটা পরিস্থিতিটা বিশ্লেষণ করলে এক শিউরে ওঠার মতো ছবি ফুটে ওঠে। এই ঘনঘন মত বদলানো এবং যুদ্ধ-শান্তির ইঁদুর-বিড়াল খেলা কোনও কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়। বরং এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি ডলারের এক সুপরিকল্পিত ফাটকাবাজি। খোলসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘ব্যবসায়ী’ ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ পুঁজিপতিরা কি এই অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন?

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই সন্দেহকে আরও পোক্ত করে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কথাই ধরুন। সপ্তাহান্তে ট্রাম্প তাঁর পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা করলেন, ইরানকে তিনি ৪৮ ঘণ্টার চরমসীমা দিচ্ছেন, শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে আমেরিকা সরাসরি হামলা চালাবে। এই একটিমাত্র পোস্টের ধাক্কায় বিশ্বজুড়ে হাহাকার পড়ে যায়। হুহু করে বাড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম, ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে, যুদ্ধের আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারে ধস নামে। ওয়াল স্ট্রিট থেকে এশিয়ার বাজার—সর্বত্র লগ্নিকারীদের মধ্যে আতঙ্কে শেয়ার বিক্রির হিড়িক। ডাও জোনস, নাসডাক বা নিফটি-র সূচক হুড়মুড়িয়ে নীচে নামতে থাকে। ঠিক এই চরম আতঙ্কের মুহূর্তেই শুরু হয় আসল খেলা।

সপ্তাহের শুরুতে বাজার খুলতেই ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট থেকে আসে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া আরেকটি পোস্ট—আপাতত হামলা স্থগিত, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে। চমকের এখানেই শেষ নয়। ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তেলের দাম ১৫ শতাংশ ধপাস করে পড়ে গিয়ে ১০০ ডলারের নীচে নেমে আসে। উলটোদিকে, ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার সূচকগুলো রকেটের গতিতে উঠতে শুরু করে। হিসাব বলছে, ট্রাম্পের ওই একটি ‘শান্তিবার্তা’র জেরে মার্কিন শেয়ার বাজারের মূলধন কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয় হল, যাঁদের সঙ্গে আলোচনার কথা ট্রাম্প বলছেন, সেই বিপক্ষ দেশ হয়তো বিবৃতি দিয়ে জানাচ্ছে আমেরিকার সঙ্গে তাদের কোনও কথাই হয়নি! অর্থাৎ, বাস্তব দুনিয়ায় শান্তি আলোচনার অস্তিত্ব না থাকলেও, খবরের জেরে বাজার লাফিয়ে উঠেছে।

এই চক্র দেখলে প্রশ্ন জাগতে বাধ্য, বিপুল ওঠানামার লাভটা কার পকেটে যাচ্ছে? অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম হল, বাজার যখন চরম অস্থির, তখন যাঁদের কাছে ‘ইনসাইডার ইনফরমেশন’ বা আগাম গোপন খবর থাকে, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি মুনাফা লোটেন। ট্রাম্প কখন যুদ্ধের হুমকি দেবেন আর কখন তা প্রত্যাহার করবেন, তা যদি তাঁর বৃত্তের ভেতরের ওয়াল স্ট্রিট মহারথীরা আগে থেকেই জানেন, তবে এই বাজার তাঁদের কাছে টাকার গাছ। যুদ্ধের হুমকিতে শেয়ার বাজার যখন তলানিতে, এই গোষ্ঠী জলের দরে শেয়ার কিনছে। তেলের দাম যখন আকাশছোঁয়া, ফিউচার মার্কেটে তেল বিক্রি করে মুনাফা লুটছে। ঠিক দু’দিন পর বাজার আবার চাঙ্গা হলে, কম দামে কেনা শেয়ার চড়া দামে বিক্রি করে কয়েক হাজার কোটি ডলার পকেটে পুরছে তারা।

কোনও সাধারণ ব্রোকার মিথ্যে খবর ছড়িয়ে এই ফাটকাবাজি করলে আমেরিকার সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করত। ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারত। কিন্তু স্বয়ং প্রেসিডেন্ট এই কাজ করলে, তাকে ফাটকাবাজি নয়, ‘কূটনীতি’ বলা হয়! ট্রাম্প নিজেই একবার বলেছিলেন, তেলের দাম বাড়লে আমেরিকার লাভ। তিনি রাজনীতিকে ব্যবসা হিসেবে দেখেন এবং গোটা বিশ্বকে তাঁর নিজস্ব ট্রেডিং ফ্লোর বানিয়ে তুলেছেন। তাঁর সিদ্ধান্তে শুধু শেয়ার বা তেলের দাম নয়, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারও চরম অস্থির। ডলারের দাম কখনও হুড়মুড়িয়ে বাড়ছে, পরক্ষণেই তলানিতে ঠেকছে।

ফরেক্স বাজারের এই অস্থিরতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভারত বা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো। জ্বালানি আমদানিনির্ভর এই দেশগুলোর অর্থনীতিতে কৃত্রিম উত্থানপতনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে। তেলের দাম আচমকা বাড়লে আমদানি খরচ বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি মাথাচাড়া দেয় এবং আমজনতার দৈনন্দিন খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। অথচ, যে মুহূর্তে ট্রাম্প যুদ্ধের বোতাম থেকে আঙুল সরান, ততক্ষণে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে যে ধাক্কা লাগার, তা লেগে যায়। স্পষ্টতই, হোয়াইট হাউসের এই ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’ গ্লোবাল সাউথ বা তৃতীয় বিশ্বের ঘাড় ভেঙে নিজেদের কোষাগার ভরার এক অভিনব কৌশল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেক সময় ট্রাম্পের এই আচরণকে রিচার্ড নিক্সনের ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা উন্মাদ তত্ত্বের সঙ্গে তুলনা করেন। নিক্সন চাইতেন শত্রুরা ভাবুক তিনি পাগল, যে কোনও মুহূর্তে পরমাণু বোমার বোতাম টিপে দিতে পারেন। কিন্তু ট্রাম্পের থিওরিতে ভূ-রাজনীতির চেয়ে অর্থনীতির অঙ্ক অনেক বেশি প্রকট। এখানে ভয় দেখিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করা মূল লক্ষ্য নয়, বরং ভয় দেখিয়ে সূচকগুলোকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করাটাই আসল উদ্দেশ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারানো বা বোমার আতঙ্কে দিন কাটানো মানুষগুলোর জীবনের সঙ্গে ওয়াল স্ট্রিট বিলিয়নিয়ারদের শ্যাম্পেনের বোতল খোলার এই উৎসবের এক নির্মম বৈপরীত্য রয়েছে।

গণতন্ত্রের পীঠস্থান আমেরিকায় আজ এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে খোদ দেশের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর বিরুদ্ধে বাজার ম্যানিপুলেট করার মারাত্মক সন্দেহ তৈরি হলেও কেউ টুঁ শব্দ করতে পারছে না। কারণ, প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব যে ট্রাম্প তাঁর কোনও ধনকুবের বন্ধুকে মেসেজ করে আগাম জানিয়েছেন, ‘সোমবার সকালে আমি পিস-টুইট করব, তোমরা কল অপশন কিনে রাখো।’ প্রমাণ করা যাক বা না যাক, সাধারণ মানুষের কাছে এই সমীকরণ জলের মতো পরিষ্কার। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রতিনিয়ত ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, এই খামখেয়ালিপনা কোনও স্ট্র্যাটেজিক কনফিউশন নয়, বরং এটি একটি নিখুঁত ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ স্কিম।

সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। একজন মানুষের মুড সুইং বা ব্যবসায়িক স্বার্থের ওপর বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নির্ভর করতে পারে না। ট্রাম্পের এই সামনে-পেছনে হাঁটার নীতি প্রমাণ করে, রাষ্ট্রনেতার চেয়ারে বসেও তিনি একজন আদ্যোপান্ত সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী। যুদ্ধের ডঙ্কা বাজিয়ে তিনি আসলে শেয়ার বাজারের ঘণ্টা বাজাচ্ছেন, আর শান্তির বাঁশিতে তুলছেন মুনাফার ফসল। ততদিন পর্যন্ত হোয়াইট হাউস থেকে পরিচালিত এই গ্লোবাল ক্যাসিনো তার রমরমা ব্যবসা চালিয়েই যাবে, যতদিন না এই ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের মুখোশ পুরোপুরি খুলে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক মহল এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।

(লেখক অর্থনীতিবিদ)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *