স্মৃতির আঙিনায় হকারের ডাক আজ ফিকে

স্মৃতির আঙিনায় হকারের ডাক আজ ফিকে

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


সাহানুর হক

ভোটের বাজার ও চৈত্র সেলের প্রবল ব্যস্ততা চারদিকে। এমনই এক রোদেলা দুপুরে অবসন্ন জনপদের ভিড়ে রাস্তার কিনারে মাথাভর্তি সাদা চুল ও মুখভর্তি দাড়ির এক মধ্যবয়সি মানুষকে সুতোর দোলনা বিক্রি করতে দেখলাম। দিনহাটা পাঁচমাথা মোড়ের কাছে রংপুর রোডের ধারে তিনি দাঁড়িয়ে। উত্তরের প্রায় সর্বত্রই এমন দোলনা বিক্রেতাদের চোখে পড়ে। তাঁর পাশেই একটি প্রিন্ট করা সাদা কাগজের সাইনবোর্ডে লেখা ঝুলছে— ‘দোলনা নিয়ে যান, দোলনা…রংবেরঙের দোলনা। মাত্র পঞ্চাশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা…’। রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটিকে দেখেই পরিযায়ী পাখির মতোই স্মৃতির ঝাঁক বিষণ্ণ মনের আনাচে-কানাচে উড়তে শুরু করল।

স্মৃতিরা অদ্ভুত, যখন-তখন বিষণ্ণ মনের ভিতরে ডানা মেলে উড়তে জানে। দোলনা বিক্রেতাকে দেখে অচিরেই ছোটবেলার কত ফেলে আসা দিনের কথা মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করে। মনে পড়ে যায় গ্রামে গ্রামে বহু নারী-পুরুষের হেঁটে হকারি করার চিরচেনা দৃশ্য। রোদেলা দুপুরে পাড়ায় পাড়ায় তখন ভেসে আসত নানান ডাক। মেলাতেও শোনা যেত পরিচিত সেই ডাকগুলি। ‘কই গো, কে নেবে চুড়ি, রংবেরঙের চুড়ি, কাচের চুড়ি, লাল-সবুজ-নীলচে চুড়ি?’ অথবা ‘হরেক মাল, তিন টাকায় নিয়ে যান মনের মতো হরেক মাল’। কিংবা ‘আসুন দাদাভাই-দিদিভাইয়েরা, নিয়ে যান দশ টাকার মামলা, বড় বড় গামলা’— কতই না ডাকে ভরা ছিল স্মৃতিমেদুর সেই দিনগুলি।

আজকের দিনে সেইসব হরেক মাল বিক্রেতা ও তাঁদের জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো অনলাইন শপিংয়ের দাপটে হারিয়ে গিয়েছে। ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন, মিশো-র মতো ই-কমার্স সাইটগুলোর সুপারফাস্ট ডেলিভারির আয়োজনে হকাররা নিজেদের জীবিকা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। সেই কারণেই এখন আর আগের মতো হকারদের দেখা যায় না। এঁদের মধ্যে ফুটপাথের পোশাক, ফল বা খাবার বিক্রেতাও রয়েছেন, যাঁরা একই কারণে প্রিয় পেশাকে বদল করেছেন। আজও পথে বা মেলায় হরেক মালের ব্যবসা করতে কতিপয় মানুষকে দেখা গেলেও, রাস্তার মোড়ে বাইক ও টোটোর ভিড়ে হেঁটে হকারি করাটা আজকের দিনে সত্যিই বড় বেমানান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাবারের ক্ষেত্রেও ছবিটা এক। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় আগে দেখা যেত আইসক্রিম, তিলের খাজা, তেঁতুল ও চালতার আচার এবং সন্দেশ বিক্রেতাদের। কিন্তু আজ তাঁরাও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অন্য জীবিকার সন্ধানে হারাচ্ছেন। উত্তরের জেলাগুলিতে মানুষের ব্যবহার বৈচিত্র্য ও আচার-আচরণে ঐতিহ্য থাকলেও, পরিবর্তনের চূড়ান্ত ধাক্কায় সেকেলে অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলছে জনপদের একাংশ। বাঙালিদের জীবন থেকে মুছে যাচ্ছে অতিথি আপ্যায়ন ও সুপারি দেওয়ার রীতি। চা বাগানের সংখ্যা কমছে, বাড়ছে অকৃষক ও অসংগঠিত মানুষের সংখ্যা। তরুণেরা স্থানীয় পেশা ছেড়ে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পশ্চিম বা দক্ষিণ ভারতে ছুটছেন। পরিবর্তন হচ্ছে এখানকার মানুষের চাহিদা, প্রত্যাশা ও খাদ্যাভ্যাসেও।

উত্তর বাংলা ও এখানকার বাঙালির ইতিহাস বদলে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উত্তরের আত্মসংস্কৃতি। কিন্তু আমরা কি ভাবছি? রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি— সব আয়োজনেই গভীরভাবে ভাবতে শেখা দরকার। একটি তথ্য অনুযায়ী, করোনার আগে ভারতের ৭৭ শতাংশ মানুষ ফুটপাথ থেকে দৈনিক বেশ কিছু টাকার জিনিসপত্র কেনাকাটা করতেন, সেই হিসেবে দৈনিক বিক্রির মূল্য ছিল ৮০০ কোটি টাকা। অথচ বর্তমান সময়ে দেশজুড়ে সেই ছবি সম্পূর্ণ আলাদা। কেন? এই প্রশ্নের বাঁকে ফিরে দাঁড়ালেই যেন প্রলয়। তবুও সময় বেঁচে থাকুক, প্রাণ বেঁচে থাকুক। মানুষ ঐতিহ্যের কর্মকে আঁকড়ে ধরে আধুনিকতায় এগোলেও, খাবার থেকে হরেক মাল বিক্রেতা— সব ধরনের মানুষ টিকে থাকুক। দোলনা বিক্রেতাও বেঁচে থাকুন মনে-প্রাণে, জীবনে-যৌবনে।

(লেখক গ্রন্থাগারিক। দিনহাটার বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *