জুড়ি

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


  • তুষারকান্তি ঘোষ

গতকাল শিবেনবাবুর ছেলে অনুপমের বৌভাতের অনুষ্ঠান ছিল। আমাদের সান্ধ্য আড্ডার পঞ্চপাণ্ডবের এক পাণ্ডব এই শিবেনবাবু। স্বাভাবিক কারণেই আমরা বাকি চার পাণ্ডবও সপরিবারে নিমন্ত্রিত। আমি ছাড়া বাকি তিনজন হলেন অনুপ সোম, সুধাময় দাস আর অতীন রায়। চাঁদা তুলে একটা ভালো উপহার কেনা হল। আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের সম্পর্ক খুব গভীর, যা বর্তমানে বিরল। বিয়েতে আমরা সবাই বরযাত্রী হিসেবে নিমন্ত্রিত ছিলাম। বরযাত্রী হিসেবে আমাদের স্ত্রীরা যেতে পারেননি। এবার চার পরিবারের আট সদস্য একসঙ্গে একই অনুষ্ঠানে সমবেত হবেন, এটাই ছিল বড় আকর্ষণ। কিন্তু বিধির বিধি কে পারে খণ্ডাতে!

বিয়ের দিন বাড়ি ফিরে মাঝরাতে আমার হঠাৎ জ্বর এল। জ্বর লাফিয়ে একেবারে ১০৪-এ উঠে গেল। স্ত্রী বললেন, এখন খুব ভাইরাল ফিভার হচ্ছে, মনে হয় কয়েকদিন ভোগাবে তোমায়। ভাইরাল ফিভারে শুনেছি অ্যান্টিবায়োটিকও কাজ করে না। শুধু জ্বরটা কমিয়ে রাখতে হবে।

এখন আইসব্যাগ পাওয়া দুর্লভ। তার পরিবর্তে এক ধরনের জেল প্যাক পাওয়া যায়। ডিপ ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে কপালে বা মাথায় ধরে রাখতে হয়। মাথায় আর কপালে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই কুল প্যাক রেখে আর প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর নামিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই আবার লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক উপসর্গ তো আছেই। এই বয়সে অসম লড়াইয়ে শরীরটা এত বিকল হয়ে গেল যে অনুষ্ঠানের দিন আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি চলে যেও, আমার যাওয়া হবে না।

গতকাল রাতে অতীনবাবু এসেছিলেন খোঁজ নিতে। তখন বলেছিলেন, ‘দেখবেন, কাল হয়তো ঠিক হয়ে যাবেন।’ কিন্তু ওঁর প্রার্থনা আমার রোগের উপশম করতে পারেনি। আজ সন্ধ্যায় আবার এলেন দেখা করতে। কিন্তু আমি যেতে পারব না শুনে অতীনবাবু কেমন যেন মিইয়ে গেলেন। আরেকবার বললেন, ‘আপনি কি একদমই যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই? কাছেই তো অনুষ্ঠানবাড়ি, তাই বলছিলাম। না হয় ওখানে কিছু খাবেন না।’

আমি হেসে ফেলি ওঁর কথা শুনে। বললাম, আমার খাওয়া এমনিতেই খুব কম, আর বিয়েবাড়িতে তো যেটুকু মুখে না দিলে নয়, তাই দিই। যৌবনের বন্ধুদের সঙ্গে অনুষ্ঠানবাড়িতে খাওয়ার প্রতিযোগিতা হত। সেসব কথা মনে পড়লে এখন হাসি পায়। ভাবি, আমাদের জীবনে সব কিছুই মাপা আছে। কে, কীভাবে, কখন এবং কতটা ব্যয় বা সঞ্চয় করবে, তা নিজেকেই স্থির করতে হয়। শুধু খাওয়া নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সত্য উপলব্ধি করেছি। এখন আমার মন চাইলেও শরীর সহযোগিতা করছে না। এই বয়সে শরীরের ওপর জোর চলে না। আপনি বাকি সবার সঙ্গে যান, দেখবেন কোনও অসুবিধা হবে না।

এই কথাটা বলার কারণ, আজকাল উনি আমার ওপর বড় বেশি নির্ভর হয়ে পড়ছেন। অতীনবাবু এখন আমার এক দুর্বল জায়গা হয়ে উঠেছেন। উনি আগে এমন ছিলেন না। গত চার-পাঁচ বছর ধরে ওঁর মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছি। কথা সব সময় গুছিয়ে বলতে পারেন না। অনেক সময় ওঁর চিন্তা আর মুখের ভাষার সমন্বয় হয় না। পরিস্থিতি বিচার করতে ভুল করেন। আর এই জন্যেই অনেক সময় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। আমি ওঁর কথার উদ্দেশ্য খুব ভালো বুঝতে পারি। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই ওঁকে ভুল বোঝে। তার ফলে কখনও সাময়িকভাবে, আবার কখনও স্থায়ীভাবে কারও সঙ্গে ওঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আমি কাছে থাকলে ব্যাপারটা সহজ করার চেষ্টা করি। ওঁর মনের কথা আমি কীভাবে বুঝতে পারি, তা আমি নিজেও জানি না। হয়তো টেলিপ্যাথির প্রভাব আছে আমাদের দুজনের মধ্যে। এছাড়া অন্য কোনও কারণ আমি খুঁজে পাইনি।

অতীনবাবু আস্তে আস্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন, ‘ঠিক আছে, আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজন এসে আপনার স্ত্রীকেও আমাদের সঙ্গেই নিয়ে যাব।’

আমি বললাম, ‘ব্যস্ত হবেন না। অনুষ্ঠানবাড়ি তো কাছেই। আমার স্ত্রী একাই চলে যেতে পারবেন।’

উনি বললেন, ‘ওটা আমাকেই ভাবতে দিন।’

উনি চলে গেলেন। আর আমিও পাশ ফিরে চোখ বুজে ঘুমোনোর চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। শরীরের ভালো-মন্দ অবস্থা মন বোঝে না। সে নিজের মর্জিতে চলতে থাকে। আর মজা হল, চোখ বুজলেই অবাঞ্ছিত চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। কিন্তু মধুর স্মৃতির দেখা মেলে না। যদিবা কখনও তার দেখা মেলে, সে ছবি এত ধূসর হয়ে থাকে যে মনে আনন্দের তেমন অনুভূতিই আনে না। আসলে মধুর স্মৃতির মাধুরী কর্পূরের মতো তীব্র ও ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু খারাপ অভিজ্ঞতার ছবি একটুও মলিন হয় না। তাকে সমূলে উৎপাটিত করা দুঃসাধ্যও বটে। অনেক চেষ্টা করেও আমি অন্তত পারিনি।

নানা কথা চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, টের পাইনি। আমার স্ত্রী আমায় না জাগিয়ে ঘরের চাবি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। ঘুম এত গভীর ছিল যে আমার স্ত্রীর চলে যাওয়া বা ফিরে আসা, কোনওটাই টের পাইনি। আমায় ঘুম থেকে তুলে যখন দুধ-পাউরুটি খেতে দিলেন, তখন বুঝলাম আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম।

আমি বললাম, ‘কখন গেলে আর কখন এলে, কিছুই টের পেলাম না।’

‘ইচ্ছে করেই তোমায় ডাকিনি। অসুস্থ অবস্থায় ঘুম এলে বুঝতে হবে, রোগের প্রকোপ কমেছে।’

‘দু’দিনেই কি আর কমে যাবে? স্বল্প হলেও এসব জ্বরের একটা মেয়াদ আছে। তবে ঘুমের জন্য কি না জানি না, এখন একটু ভালো লাগছে। তা, অনুষ্ঠান কেমন লাগল?’

‘এখন আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। এসব কথা কাল হবে। এখন খেয়ে নাও। আমি অন্য কাজ সেরে এসে শুয়ে পড়ব।’

সুস্থ অবস্থাতেও কখনও স্ত্রীর অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করিনি, এখন তো অসুস্থ। তাই সুবোধ বালকের মতো খেয়ে আবার বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলাম।

মিনিট পনেরো পরে স্ত্রী এসে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন। এত নীরবতা আমার ভালো লাগছিল না। কিন্তু সাহস করে নীরবতা ভাঙতে পারলাম না। অসহযোগ আন্দোলন মনে হয় গান্ধিজি এঁদের কাছ থেকেই শিখেছিলেন। সেই আন্দোলনে ব্রিটিশ সিংহই পালানোর পথ খুঁজে পেল না, আমি তো কোন ছাড়!

হঠাৎ করে অনুপবাবুর একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ায় হাসি পেল। অনুপবাবু পুলিশে চাকরি করতেন, কিন্তু দারুণ রসিক লোক। সভা মাতিয়ে রাখতে ওস্তাদ। এক সন্ধ্যায় কোনও কারণে আমাদের আড্ডায় অনুপস্থিত ছিলেন। পরদিন যখন এলেন, সুধাময় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাল কী হল? এলেন না যে?’

সপাট উত্তর এল, ‘অনুমতি পাইনি।’

‘আপনারও অনুমতি লাগে? তার মানে আপনার মতো দুঁদে দারোগাও স্ত্রীকে ভয় পান?’

‘স্ত্রীকে যে ভয় পায় না, সে পুরুষই না। শুনুন, আমার নাম অনুপ সোম, লোকে বলে আমি ছিলাম বদমাইশদের যম, কিন্তু বৌয়ের কাছে আমি এক গাছি লোম।’

কথাটা এখন মনে পড়ে যাওয়ায় হাসি পেল। হঠাৎ মনটা ভালো হয়ে গেল। ঈশ্বর ও ওষুধ উভয়ের প্রভাবে ঘুমও এসে গেল।

পরের দিন যখন ঘুম ভাঙল, তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। জ্বর আছে, তবে অনেক কম। পাশ ফিরে দেখি, স্ত্রী নেই। তার মানে দৈনন্দিন কাজে লেগে গেছেন। আমিও উঠেপড়ে প্রাতঃকৃত্য শেষ করে খাওয়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম চায়ের আশায়। একটু পরেই আমার স্ত্রী চা নিয়ে এলেন। সকালে ও বিকেলে একসঙ্গে চা খাওয়া আমাদের নিয়মের মধ্যে এসে গেছে।

শুধু আমার জন্য চা আনায় অবাক হয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার চা কোথায়?’

উনি বললেন, ‘রান্নাঘরে রেখে এসেছি। সুমিত্রা সকালে ফোন করে জানিয়েছে যে ও আজ আসতে পারবে না। এখন তোমার সঙ্গে চা খেতে বসলে দেরি হয়ে যাবে। রান্না করতে করতেই চা খেয়ে নেব।’

সুমিত্রা আমাদের রান্নার ভার সামলায়। ছুটি সে কখনও নেয় না, এমনটা নয়। তবে আজ এত ব্যস্ততা কীসের? সব কিছু যেন ঠিক জায়গায় বসছে না। মনে হল, আমাকে এড়াতে চাইছে। কিন্তু কেন, সেই প্রশ্ন আমার মনে ঘুরপাক খেতে লাগল। চাপাচাপি করে লাভ হবে না, তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করলাম।

দুপুরের খাওয়া শেষে বিছানায় শুয়ে ছিলাম। রোজকার মতো দুটো পান নিয়ে একটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আর একটা নিজের মুখে পুরে শুয়ে পড়ে বললেন, ‘আজ আর যখন জ্বর বাড়েনি, তার মানে দু-একদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু ভুলেও আজ আড্ডা দিতে বেরোবে না।’

আমি বললাম, ‘ফিট সার্টিফিকেট পেলেই না হয় যাব। কিন্তু কাল থেকে তুমি চুপ করে আছ কেন? বিয়েবাড়ি সম্বন্ধে কোনও উচ্চবাচ্যই করছ না।’

স্ত্রী বললেন, ‘সেকথা না বলাই ভালো। কাল সব গোলমাল হয়ে গেছে।’

আমার মনে একটা কু-ডাক দিল। আমি বললাম, ‘অতীনবাবু কিছু ভুল করেছেন নাকি?’

আমার কথা শোনা মাত্র আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণ শুরু হয়ে গেল।

‘উনিই তো একদম ডুবিয়ে দিলেন। সব ঠিকঠাক চলছিল। শিবেনবাবু একে একে সবাইকে নবদম্পতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। সবাই নবদম্পতির সুখী দাম্পত্য জীবনের কামনা করে চলে যাচ্ছিলেন। শেষে ছিলাম আমরা দুই পরিবার। ওঁর মাথায় কী ভূত চাপল কে জানে! এমন কথা বললেন যে শুনে উপস্থিত সকলে হতবাক। আর তার রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হল হাসাহাসি, ঠাট্টা আর টিটকিরি। অনুপমের এক বন্ধুকে বলতে শুনলাম, ‘আর যেখানেই যাও ভাই অনুপম, স্ত্রীকে নিয়ে মন্দিরে কখনও যেও না।’

সুজাতা সঙ্গে সঙ্গে অতীনবাবুর হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে বেরিয়ে এল, আর ওঁদের সঙ্গে আমিও পালিয়ে এসে বাঁচলাম। খাওয়াদাওয়া মাথায়! শিবেনবাবু অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। তোমার অন্য বন্ধুরাও একে একে ওখান থেকে বেরিয়ে এলেন। রাস্তায় আসতে আসতে সুজাতাকে অতীনবাবুর উদ্দেশে বলতে শুনলাম, ‘আর কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে যেও না। তোমার কয়েকজন বন্ধুর মধ্যেই মেলামেশা সীমাবদ্ধ রেখো। এর পরে রাস্তায় বেরোনো মুশকিল হবে।’ কিন্তু অতীনবাবুর মুখে তখনও সেই এক কথা, ‘আমি ভুলটা কী বললাম, সেটা বলবে তো?’

আমি বললাম, ‘কিন্তু উনি কী বলেছেন, সেটাই তো বলছ না।’

‘শুনবে, উনি কী বলেছিলেন? নবদম্পতিকে বলেন, ‘আশীর্বাদ করি, সারা জীবন তোমরা দুজনে পায়ের জুতোর মতো থেকো।’

এবার আর হাসি চাপতে পারলাম না। জোরে হেসে ওঠায় আমার স্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি হাসছ?’

আমি বললাম, ‘অনুষ্ঠানে এভাবে বলাটা ওঁর উচিত হয়নি, এ নিয়ে আমারও দ্বিমত নেই। যা সত্য বলে মানি, সেটাও সব সময় বলা যায় না। পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিচার করে কথা বলতে হয়। কিন্তু ভেবে দেখো, এক জোড়া জুতোর চেয়ে ভালো জুড়ির উদাহরণ কোথাও খুঁজে পাবে? সারা জীবন সেভাবে কাটানো কি কম কথা?’

The submit জুড়ি appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *