অনমিত্র বিশ্বাস
মন্দোদরীর বিলাপে বিচলিত হয়ে শ্রীরামচন্দ্র কি লঙ্কার অধিপতি রাবণের চিতা এমন কোনও প্রাকৃতিক গ্যাসের খনিতে প্রজ্বলিত করেছিলেন, যা আবহমান কাল ধরে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে? পুরাণের এই আখ্যান কিংবা প্রাচীন গ্রিসের চিমেরা পর্বতে প্রাকৃতিকভাবে জ্বলতে থাকা অগ্নিশিখা— যা এককালে মানুষের মনে এক অগ্নিপ্রশ্বাসী কাল্পনিক প্রাণীর জন্ম দিয়েছিল— সবই আসলে শক্তির আদিম বিস্ময়। ঋগবেদের প্রথম সূক্তকার তো অগ্নিকেই যজ্ঞের পুরোহিত, দেবতা এবং হোতার মর্যাদা দিয়ে আবাহন করেছিলেন। তুষার যুগে মানুষ যখন গুহার গহ্বরে সূর্যের আলোকে বন্দি করেছিল, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল শক্তির ওপর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। আজ সেই অপরিহার্য অগ্নিরূপ শক্তির উৎস ছাড়া আধুনিক মানবসভ্যতা আক্ষরিক অর্থেই অচল হয়ে পড়ছে। বিংশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সময়কালে যন্ত্রের খাদ্য বোধহয় মানুষের অন্নের চেয়েও বেশি আবশ্যিকতার জায়গা দখল করে নিয়েছে। শক্তির গূঢ় রহস্য ভেদ করে পাতালে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে মানুষের তখনও অনেক দেরি ছিল। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে অযুত নিযুত বৎসর ধরে সূর্য প্রদক্ষিণের পথে মাটির তলায় প্রবল তাপে ও চাপে গলে যাওয়া জৈবিক পদার্থ থেকে তৈরি হয়েছে আজকের জীবাশ্ম জ্বালানি।
শিল্পবিপ্লবের আদিপর্বকে মূলত কয়লাই গতি দিয়েছিল। কিন্তু গত শতাব্দীতে, প্রায় দেড় হাজার বছর পরে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্যবিধাতা যেন আবার নতুন করে মুখ তুলে চাইলেন। সুদূর অতীতে মাটির তলায় চাপা পড়া শৈবাল নিংড়ে বেরোনো জ্বালানি আজ তেলকূপ খুঁড়ে অনায়াসেই ছিনিয়ে আনা হচ্ছে। এটি এক মহার্ঘ ধন, যা ধরিত্রী যুগ যুগ ধরে সযত্নে কবরের গভীরে লুকিয়ে রেখেছিল। এই কালো সোনার টানে আজ গোটা পাশ্চাত্য বিশ্ব আরবের মরুপ্রান্তরে ভিড় জমিয়েছে। আরবের শেখেরা তাঁদের পৈতৃক তাঁবুর পাট চুকিয়ে আজ গগনচুম্বী প্রাসাদে বিলাসিতা করছেন। ভূপৃষ্ঠে আহৃত এই তরলের চাপ কমে গেলে সেই মিশ্রণ থেকে লঘু কার্বন চেনের বিষবাষ্প উৎপন্ন হয়। একসময় তা উড়িয়ে দেওয়া বা পুড়িয়ে ফেলা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে বহুমূল্য পাইপলাইন কিংবা তরলীকরণের মাধ্যমে সেই প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিবহণ ও ব্যবহার আজ সার্বিকভাবে সম্ভব হয়েছে। প্রাচীন ব্যাবিলন নগরীতে পথ নির্মাণের কাজে পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এমনকি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে চিনারা জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার শুরু করেছিল। সমান্তরালে খনিজ লবণের সন্ধানে মাটি খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া প্রাকৃতিক গ্যাসকে ভূগর্ভস্থ বাঁশের নলের মধ্য দিয়ে স্থানান্তরিত করে নুন তৈরির কাজে ব্যবহার করেছিল সিচুয়ান প্রদেশের মানুষ। আজকের আধুনিক সভ্যতার যজ্ঞের সিংহভাগই সম্পন্ন হয় এই পেট্রোলিয়াম কিংবা কয়লা থেকে উৎপন্ন জ্বালানিতে। পরিসংখ্যান বলছে, পৃথিবীর প্রায় আশি শতাংশ সহজলভ্য পেট্রোলিয়াম মধ্যপ্রাচ্যের মাটির তলায় সংরক্ষিত রয়েছে, যার সিংহভাগ রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইরাক, কাতার ও কুয়েতের মতো আরব দেশগুলোতে। এছাড়া হাইড্রলিক ফ্র্যাকচারিং ও অনুভূমিক ড্রিলিং প্রযুক্তির সাহায্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াতেও প্রচুর তেল উৎপাদিত হচ্ছে, যেখান থেকে ভারত তার চাহিদার বড় অংশটি সংগ্রহ করে।
১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধে যখন পাশ্চাত্য ও জাপান ইজরায়েলের পক্ষ নেয়, তখন আরব দেশগুলি তেলের রপ্তানি কমিয়ে দিয়ে বিশ্বকে চরম সংকটে ফেলেছিল। আবার ১৯৭৯ সালে ইরানে খোমেইনি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। এই সংকটের পরম্পরা আজও বহমান। এবারের সমস্যাটি অবশ্য কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও গ্যাস পশ্চিমে পরিবহণের জন্য সুয়েজ খাল এবং পূর্বে যাতায়াতের জন্য হরমুজ প্রণালীই প্রধান ভরসা। ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন যুদ্ধের রেশ ধরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের হত্যার প্রেক্ষাপটে ইরান যখন হরমুজ প্রণালী আটকে দেওয়ার হুমকি দেয় বা বাধা সৃষ্টি করে, তখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানির আকাল তৈরি হয়। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। কূটনৈতিক তৎপরতায় হরমুজের কপাট সামান্য খুললেও সরবরাহের সংকট পুরোপুরি মেটেনি।
এই আকালের চিত্রটি দেখে পরিচালক মৃণাল সেন কিংবা অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সেই আকালের সন্ধানের কথা মনে পড়ে যায়। ১৯৪৩ সালে যে হীন মানসিকতায় ক্ষুধার্ত বাঙালির মুখের গ্রাস গুদামজাত করা হয়েছিল, আজ পেট্রোল আর প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও তার সমান্তরাল চিত্র দৃশ্যমান। হরমুজ প্রণালী আটকে যাওয়ার মাত্র দুইদিনের মধ্যেই গ্যাসের জোগান ফুরিয়ে যাওয়ার কথা নয়। অথচ শোনা যাচ্ছে, উত্তর ভারতের এক প্রভাবশালী নেতার পুত্র নাকি কয়েকটি আস্ত পেট্রোল পাম্প কুক্ষিগত করে রেখেছেন, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের অভাব হলেও তাঁর ব্যক্তিগত বিলাসিতায় টান না পড়ে। এই কৃত্রিম সংকটের আঁচ পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের হেঁশেলেও। ভিলাইয়ের এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গেটের বাইরে এক এগরোল বিক্রেতা আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘যে সিলিন্ডার আটশো টাকায় কিনছিলাম, রাতারাতি কালোবাজারে তা দু’হাজার টাকা হয়ে গিয়েছে। ডিমসেদ্ধর দাম দশ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা না করলে আমার পথে বসার উপক্রম হবে।’
কিন্তু আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে অন্য একটি বিষয়। একদিন এই যক্ষপুরীর তরল সোনা চিরতরে ফুরিয়ে যাবে। দধীচির চিতা থেকে উদ্গীরিত এই চালিকাশক্তি নিঃশেষ হলে সভ্যতার হাতে পড়ে থাকবে কেবল প্রস্তর যুগের উপাদান। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, কারণ আমাদের দেশের পেট্রোলিয়াম চাহিদার মাত্র আঠারো শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, বাকিটা বিদেশ থেকে চড়া দামে আমদানি করতে হয়। পরমাণুর হৃদয় বিদীর্ণ করে বিকল্প ব্যবস্থার চেষ্টা হলেও ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডারও কিন্তু সীমিত। এক্ষেত্রে জাপানের উদাহরণটি প্রাসঙ্গিক। ধানের চাষের চেয়ে চাল আমদানি করা সেখানে সস্তা হলেও সরকারি উদ্যোগে আজও কৃষিকাজকে বিপুল উৎসাহ দেওয়া হয়। কারণ ভাতের মতো আবশ্যিক চাহিদায় তারা ভিনদেশের দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না।
বিকল্প শক্তির সন্ধানে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বেলুড় মঠ। সেখানে ভোগের আয়োজন চলছে মিথেন গ্যাসে, যা তৈরি হচ্ছে রান্নার উচ্ছিষ্ট থেকে। জলাভূমির কর্দমাক্ত বাস্তুতন্ত্রে যে মার্শ গ্যাস বা মিথেন আলেয়া তৈরি করে, তাকেই আজ বায়োরিয়্যাক্টরে বশ করে পরিশীলিত পুতুলনাচ সংগঠিত করা হচ্ছে। কৃষিবর্জ্য, উচ্ছিষ্ট ও গোবরের মতো জৈব পদার্থে ব্যাকটিরিয়ার অবায়বীয় পরিপাকের মাধ্যমে উৎপন্ন এই গ্যাসকে আধুনিক প্রযুক্তিতে শোধন করে যানবাহন ও রান্নার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। ডন কুইক্সোট একদা উইন্ডমিলগুলিকে দৈত্য ভেবে আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু আজ সেই বায়ুতাড়িত শক্তিই উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপের প্রধান ভরসা। ডেনমার্ক তার মোট বিদ্যুতের প্রায় চল্লিশ শতাংশ বাতাস থেকে আহরণ করে। ভারতেও এই বায়ুশক্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তা মূলত পশ্চিম ভারতেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া রয়েছে স্রোতচালিত বিদ্যুৎ ও সৌরশক্তি। সেমিকনডাক্টর পদার্থের ফোটোভোলটাইক এফেক্টের মাধ্যমে সূর্যের উত্তাপকে বিদ্যুতে পরিণত করে আফ্রিকার দেশগুলি প্রভূত উন্নতি করছে। ভারতের মতো দেশে কিছু প্রাথমিক বিনিয়োগের বিনিময়ে অত্যন্ত সস্তায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। যেদিন সূর্যের আলো বা হাওয়ার গতি থেমে যাবে, সেদিন মহাকালের খাতায় সভ্যতা হয়তো শূন্যে পর্যবসিত হবে। কিন্তু ততদিন এই ভাণ্ডার অফুরান। তাপবিদ্যুতের চুল্লিতে পরিবেশের শ্বাসরোধ না করেও সভ্যতার চালিকাশক্তির বিকল্প উৎসমুখগুলি অনায়াসেই আজ মানুষের আশ্রয় হতে পারে।
(লেখক আইআইটি ভিলাইয়ে অঙ্কের গবেষক)
