সুজনকুমার দাস
খবরের কাগজের অর্থনীতির পাতাটা সাধারণ মানুষের কাছে বরাবরই একটু খটমটে। সেখানে যখন জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের মতো ভারী ভারী শব্দবন্ধ ঘুরে বেড়ায়, তখন অনেকেই পৃষ্ঠা উলটে অন্য খবরে চোখ বুলিয়ে নেন। কিন্তু মুশকিল হল, এই জিডিপি জিনিসটা কোনও বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি আসলে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির স্বাস্থ্য মাপার সবচেয়ে বড় থার্মোমিটার। থার্মোমিটারে জ্বর দেখলে যেমন আমরা উদ্বিগ্ন হই, তেমনি জিডিপির পারদ নামলে দেশের মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। সম্প্রতি ২০২৬-’২৭ অর্থ বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের, অর্থাৎ এপ্রিল–জুনের, জিডিপির হিসাব সামনে আসার পর ঠিক তেমনই এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে বলা হচ্ছে দেশের অর্থনীতি বেশ ভালো গতিতে এগোচ্ছে, অন্যদিকে একদল দাবি করছেন অর্থনীতি নাকি ধুঁকছে। সাধারণ মানুষ হিসেবে এই সাংঘর্ষিক তথ্যের ভিড়ে আসল সত্যটা বুঝে ওঠাটা সত্যিই খুব মুশকিল।
চলুন, বিতর্কের একেবারে গোড়ার কথায় আসা যাক। সরকারি হিসাব এবং অর্থনীতির মূল ধারা বলছে, চলতি অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে দেশের অর্থনীতির আকার, অর্থাৎ চলতি মূল্যে বা নমিনাল জিডিপি বেড়েছে ১০.৩ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির প্রভাবটুকু বাদ দিলে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির, অর্থাৎ রিয়েল জিডিপির হার দাঁড়াচ্ছে ৭.৮ শতাংশ। সরকারি নতুন সিরিজ অনুযায়ী, ২০২৬–’২৭ অর্থ বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে প্রকৃত জিডিপির পরিমাণ হয়েছে ৮১.৩৬ লক্ষ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৫.৪৬ লক্ষ কোটি টাকা। অন্যদিকে, চলতি মূল্যে জিডিপি হয়েছে ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি টাকা, যা আগের বছরের সংশোধিত ৮০ লক্ষ কোটি টাকার তুলনায় ১০.৩ শতাংশ বেশি।
কিন্তু চমকটা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। হঠাৎ করেই কিছু মহলে দাবি উঠতে শুরু করেছে যে, হিসাব নাকি একেবারেই মিলছে না! তাঁদের হিসেবে অনুযায়ী, অর্থনীতির বৃদ্ধির হার নাকি মাত্র ২.৬ শতাংশ। ৭.৮ শতাংশ আর ২.৬ শতাংশ, দুটি সংখ্যার মধ্যে আকাশপাতাল তফাত। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এত বড় গরমিল হচ্ছে কোথায়? কেউ কি ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করছেন, নাকি পুরো বিষয়টাই অঙ্কের কোনও গভীর মারপ্যাঁচ?
বিষয়টা বুঝতে হলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা খুব সহজ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরুন, গত বছর আপনি আপনার সন্তানের উচ্চতা মেপেছিলেন ‘ইঞ্চি’ ফিতে দিয়ে। আর এই বছর তার উচ্চতা মাপলেন ‘সেন্টিমিটার’-এর স্কেলে। এখন আপনি যদি সেন্টিমিটারের সংখ্যা থেকে ইঞ্চির সংখ্যাটা সরাসরি বিয়োগ করে বলেন যে আপনার সন্তানের উচ্চতা মাত্র এতটুকু বেড়েছে, তাহলে সেটা যেমন ভুল হবে, জিডিপির এই ২.৬ শতাংশের হিসাবের গল্পও ঠিক তেমনই।
যে কোনও কিছুর বৃদ্ধি মাপার প্রথম শর্তই হল, গতবারের সঙ্গে এবারের তুলনাটা হতে হবে একই মাপকাঠিতে। গত বছরের অর্থনীতির আকার যে পদ্ধতিতে বা যে ‘ডেটা সিরিজ’ ধরে মাপা হয়েছিল, চলতি বছরের হিসাবটাও ঠিক একই সিরিজে মাপতে হবে। কিন্তু যাঁরা ২.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলছেন, তাঁদের হিসাবের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটাই সামনে এসেছে।
জিডিপি নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিভ্রান্তি দূর করতে হলে সবার আগে ‘ভিত্তিবর্ষ’ বা বেস ইয়ারের বিষয়টা আমাদের পরিষ্কার হওয়া দরকার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, প্রযুক্তির ব্যবহার ও অর্থনীতির কাঠামো বদলে যায় বলে অর্থনীতিকে নিখুঁতভাবে মাপার জন্য কিছুদিন পরপর জিডিপির এই ভিত্তিবর্ষ হালনাগাদ করতে হয়। এতদিন আমাদের জিডিপি মাপা হত ২০১১–’১২ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে, যা ‘পুরোনো সিরিজ’ নামে পরিচিত। এখন বর্তমান অর্থনীতির আরও ভালো চিত্র পেতে সরকার ২০২২–’২৩ সালকে ‘নতুন সিরিজ’ বা নতুন ভিত্তিবর্ষ হিসেবে গ্রহণ করেছে। নতুন সিরিজে তথ্যের উৎস, পদ্ধতি এবং বিভিন্ন সূচকেরও পরিবর্তন হয়েছে।
কিন্তু সমালোচকদের ২.৬ শতাংশের হিসাবটি তৈরি হয়েছে পুরোনো ও নতুন সিরিজের সংখ্যা পাশাপাশি বসিয়ে। তাঁরা চলতি বছরের জন্য নতুন সিরিজের ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি টাকা নিয়েছেন। কিন্তু গত বছরের হিসাবের ক্ষেত্রে নতুন সিরিজের সংশোধিত ৮০ লক্ষ কোটি টাকার বদলে পুরোনো সিরিজের ৮৬.০৫ লক্ষ কোটি টাকা বসিয়েছেন। পুরোনো মাপকাঠির সঙ্গে নতুন মাপকাঠি জুড়ে দিয়ে তুলনা করার ফলেই চলতি মূল্যে প্রবৃদ্ধির হার অস্বাভাবিকভাবে কমে প্রায় ২.৬ শতাংশ দেখিয়েছে। সোজা কথায়, এই ২.৬ শতাংশের হিসাবটি একই সিরিজের তুলনা নয়। সরকারি ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, পুরোনো ২০১১–’১২ সিরিজের ৮৬.০৫ লক্ষ কোটি টাকা এবং নতুন ২০২২-’২৩ সিরিজের ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি টাকার সরাসরি তুলনা করা যায় না।
যখন আমরা পরিসংখ্যানের এই সাধারণ নিয়মটা মেনে চলি, অর্থাৎ দুই বছরের জন্যই একই সিরিজের সংখ্যা ব্যবহার করি, তখন আর কোনও বিভ্রান্তি থাকে না। তখন স্পষ্টভাবেই দেখা যায় যে, প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ। এটি কোনও মনগড়া সংখ্যা নয়, বরং একই নতুন সিরিজের ভিত্তিতে করা সরকারি হিসাব।
এখন তর্কের খাতিরে যদি আমরা এক মুহূর্তের জন্য ধরেও নিই যে সমালোচকদের কথাই ঠিক এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.৬ শতাংশ, তাহলে আমাদের চারপাশের ছবিটা কেমন হত? একটু চোখ কান খোলা রাখলেই বোঝা যায়, এমন কম প্রবৃদ্ধির হার অর্থনীতির গতি মন্থর হওয়ার একটি ছবি তুলে ধরত। শিল্পে উৎপাদন, ব্যবসায় বিনিয়োগ, বাজারে কেনাকাটা এবং কর্মসংস্থানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তে পারত। কিন্তু শুধু এই একটি সংখ্যার ভিত্তিতে অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থার চূড়ান্ত বিচার করাও সম্ভব নয়।
বাস্তব চিত্র বুঝতে হলে আমরা যদি জিডিপির এই জটিল সংখ্যার বাইরে বেরিয়ে প্রতিদিনের অর্থনীতির অন্যান্য মাপকাঠিগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে ছবিটা আরও পরিষ্কার হয়। দেশে কর আদায়ের পরিমাণ, পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি সংগ্রহ, শিল্পখাতের উৎপাদন, ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার পরিমাণ বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের মতো বিষয়গুলি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি সম্পর্কে বিভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। অতি সম্প্রতি আমেরিকার বিখ্যাত অর্থনৈতিক সমীক্ষা সংস্থা মুডিজ জানিয়েছে, জি২০ দেশগুলোর মধ্যে সবথেকে বেশি আর্থিক বৃদ্ধি হতে চলেছে ভারতের। আর আয়কর দপ্তর সূত্রে জানা যাচ্ছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আয়কর সংগ্রহ পূর্বের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। সরকারি হিসাবে, চলতি অর্থ বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে বাস্তব জিভিএ (গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড) বৃদ্ধির হারও ৮.২ শতাংশ হয়েছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের যে কোনও তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ বা গঠনমূলক সমালোচনা হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন করবেন, বিকল্প পথ দেখাবেন, এটাই কাম্য। কিন্তু ভুল পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে একটা সংখ্যাকে সত্যি বলে চালিয়ে দেওয়াটাও সুস্থ সমালোচনার পর্যায়ে পড়ে না। আবার সরকারি হিসাবকেও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। পরিসংখ্যান কোনও জাদুর কাঠি নয় যে চাইলেই তাকে নিজের মতো করে ঘুরিয়ে দেওয়া যাবে। এর নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। সেই নিয়ম মেনে চললে দেখা যায়, ২০২৬–’২৭ অর্থ বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে দেশের অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশের প্রকৃত বৃদ্ধির হার নথিভুক্ত করেছে।
(লেখক অর্থনীতির অধ্যাপক)

